প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ক্ষুব্ধতা, বিস্ময় এবং লজ্জা

কাকন রেজা: শুরুর আগে ভূমিকা বলছি। লেখাটি মূলত তিনটি প্রতিক্রিয়া নিয়ে। ক্ষুব্ধতা, বিস্ময় এবং লজ্জা। পুরোটা পড়লে হয়তো বিষয়গুলো পরিষ্কার হবে।
ভারতের আসামে বাংলাভাষীদের নিয়ে কথা হচ্ছে। লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি বাংলাভাষীদের বাংলাদেশি হিসাবে আখ্যা দিয়ে তাদের বিতারণের কথা বলেছিল জোরেসোরে। জয়ের পর তাদের সুর কিছুটা নরম। তবে নম্রতার পেছনে রয়েছে অন্য কাহিনী। বিজেপি ’৭১ এর কথিত শরণার্থীদের মধ্যে শুধুমাত্র হিন্দুদেরই নাগরিকত্ব দিতে চাচ্ছে। বিজেপির আসাম সভাপতি সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।
আসামের সর্বদলীয় ছাত্র ইউনিয়ন (এএএসইউ) বলছে, ‘১৯৭১ এ যেসব অবৈধ অভিবাসী আসামে এসেছে তাদের অবশ্যই বিতারিত করতে হবে’। তবে তারা ধর্মের ভিত্তিতে শরণার্থী বিষয়ক বিভাজনের প্রতিবাদ জানিয়েছে। অপর দিকে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল গণমুক্তি’র দাবীও অনেকটা অনুরূপ। তারা সকলেরই বিতারণ চান। দেখা যাচ্ছে, বিজেপিসহ অন্যান্যদের টার্গেট মূলত আসামের ৩০ থেকে ৪০ লাখ বাংলাভাষী মুসলিম। আসামের একজন সাংবাদিক অমল গুপ্তের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, ‘ধারণা করা হচ্ছে, নাগরিকদের জাতীয় রেজিস্ট্রার এনআরসির খসড়ায় শুরুতেই তালিকা থেকে ৩০-৪০ লাখ মুসলমান বাদ পড়বেন।’ প্রথম খসড়া প্রকাশের পর দেখা গেছে, ৩ কোটি ২৯ লাখ আবেদনের মধ্যে, এক কোটি ৯০ লাখকে ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস’ (এনআরসি) বৈধ নাগরিকের স্বীকৃতি দিয়েছে।
এ ব্যাপারে আসামের অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার উক্তিটি ভয়াবহ। তিনি বলেছে৮ন, ‘আসামে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের শনাক্ত করতে তারা এ উদ্যোগ নিয়েছেন। এনআরসি’তে যাদের নাম না থাকবে আসাম থেকে তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে।’ মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ‘এ প্রক্রিয়ায় আসামের কয়েক লাখ মুসলিম রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বেন।’
ভারতীয় সাংবাদিক অমল গুপ্তের ধারণা, এমন ঘটনা ঘটলে সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি ধকল সইতে হবে বাংলাদেশকে। এমনিতে রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশে বিপাকে, আবার যদি আসামের মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন করা হয়, তাহলে অবস্থা দাঁড়াবে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতন। আর ক্ষুব্ধতার প্রশ্নটা সেখানেই।
দুই.
বিস্ময়ের ব্যাপারটি বলি। গণমাধ্যম জানিয়েছে, পাকিস্তানে অমুসলিম সম্প্রদায়ের ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ৩০ ভাগেরও বেশি। এর মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বৃদ্ধির আনুপাতিক হার সবচেয়ে বেশি। ২০১৩ এর নির্বাচনে যেখানে হিন্দু ভোটার ছিলেন ১৪ লাখ এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখে। বৃদ্ধির গণিতটা চমকে দেয়ার মতন। আসাম বাংলাদেশি আখ্যায়িত করে বাংলাভাষীদের বের করে দিতে চাইছে। সীমান্তে কাঁটাতার তো রয়েছেই, অনুপ্রবেশের দায়ে পাখির মতন গুলি করে মারা হচ্ছে মানুষ। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ থেকে কিছু মানুষ ভারতে শরণার্থী হচ্ছেন এমন কথা যারা প্রায়শ বলেন, তারা কী বলতে পারবেন পাকিস্তানে অমুসলিম ভোটার বৃদ্ধির মাজেযাটা?
তিন.
ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের ২৫টি মিডিয়া গ্রুপ টাকা নিয়ে বিজেপির হিন্দুত্ব এজেন্ডা প্রচারে রাজী, প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে একটি খবরে এমনটাই বলেছে বিবিসি। ইনভেস্টিগেটিভ একটি নিউজ পোর্টালের গোপন ‘স্টিং’ অপাশেনের ভিডিও থেকে এমন প্রমানই পাওয়া গেছে। বাদ পড়েনি ‘টাইমসে’র মতন ভারতের প্রভাবশালী মিডিয়া গ্রুপও। ভারতের মিডিয়াকে যে টাকা দিয়ে কেনা যায় তা প্রমাণ হয়েছে ওই ‘স্টিং’ অপারেশনে- এমনটাই বলছেন, ভারতীয় বিশ্লেষকরা। আমাদের ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমটা তেমন দাঁড়ায়নি। দাঁড়ালে হয়তো এমন ‘স্টিং’ অপারেশন আমাদের এখানেও হতো। ‘টাইমস’ গ্রুপ না-কী ৫’শ কোটি রূপির বিনিময়ে প্রস্তাবে রাজী হয়েছিল। আমাদের দেশের মানুষের মন নরম। অনেকটা শিবের মতন, অল্পতেই তুষ্ট। ভারতের মিডিয়ার অবস্থা এবং আমাদের এখানে হলে কী হতো, এমন চিন্তাতেই মূলত লজ্জাটা।
লজ্জাটা আরো বাড়িয়েছে গণমাধ্যমের একটি খবরে। বলা হয়েছে, দেশে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের তালিকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফের বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর নামও রয়েছে। লোভ, আপোস আর চামচামোর পরিণতি যা হয় আর কী।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট/সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত