প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শত বছরের ঐতিহ্য পুরান ঢাকার বিউটি লাচ্ছি

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রায় শত বছর ধরে তৃষ্ণা মেটাতে অদ্বিতীয় পুরান ঢাকার বিউটি লাচ্ছি শরবতের জুড়ি নেই। পুরান ঢাকায় খাবারের ইতিহাস ঐতিহ্যে বিউটি লাচ্ছি ও শরবতের দোকান স্বতন্ত্র স্থান দখল করে আছে। ব্যস্ত মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে ৪০০ বছরের পুরনো এ নগরীর অলিগলিতে বর্তমানে শরবত লাচ্ছির দোকান ভরপুর। ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোতে শরবত ও লাচ্ছির চাহিদা ব্যাপক। এই চাহিদা পূরণ করতে পুরান ঢাকাতে রয়েছে বেশকিছু নামকরা দোকান।
বিউটি লাচ্ছি ও শরবতের দোকান এগুলোর অন্যতম। যারা আজও সুনামের সঙ্গে ধরে রেখেছে তাদের ব্যবসায়ীক ঐতিহ্য।
১৯২২ সালে রায়সাহেব বাজারের মোড়ে ফুটপাতে লেবুর শরবত বিক্রির মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেছিলেন আব্দুল আজিজ। শরবতের সঙ্গে পরে যুক্ত করেন লাচ্ছি। এরপর ফালুদা। ফুটপাত থেকে শরবত লাচ্ছি বিক্রি করে বর্তমানে ৩টি দোকান গড়ে তুলেছেন তারা। তাদের অন্য দুটি শাখা দোকান হলো পুরান ঢাকার নাজিরা বাজার এবং লালবাগে বিউটি লাচ্ছি ও শরবতের দোকান। প্রায় একশ’ বছর ধরে শরবত ও লাচ্ছি সুনামের সঙ্গে বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি। পুরান ঢাকার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে আসা পর্যটক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, বিদেশি এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছেও বেশ প্রিয় এখানকার লাচ্ছি আর ফালুদা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে আসছে দোকানে শরবত ও লাচ্ছি পান করার জন্য। পুরান ঢাকায় বড় বড় অভিজাত রেস্টুরেন্টে শরবত, লাচ্ছি ও ফালুদা পাওয়া গেলেও ছোট্ট এ দোকানটিতে এসব খাবারের জুড়ি নেই। প্রায় সব শ্রেণির মানুষ শরবত, লাচ্ছি ও ফালুদা খেতে এ দোকানেই বার বার ফিরে আসেন। শুধু তাই নয় নিজেরা খেয়ে যান আবার বাড়ির মানুষদের জন্য প্যাকেট করে নিয়ে যান।
ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া দোকানটি প্রথমদিকে ছিল শুধু সামিয়ানা টাঙিয়ে দেয়া একটি ছোট টং দোকান। সময়ের পরিবর্তনের আর জনপ্রিয়তার সঙ্গে বদলেছে এর কাঠামোগত দিক। আর শুরু থেকেই গুণগত মান আর নির্ভেজাল লাচ্ছি তৈরি হওয়াতে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরান ঢাকাবাসীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘বিউটি লাচ্ছি’।
আব্দুল আজিজের মৃত্যুর পর ব্যবসার দায়িত্ব পড়ে পুত্র আব্দুল গাফ্ফার মিয়ার কাঁধে। আর ২০০১ সালে গাফ্ফার মিয়ার মৃত্যুর পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির দেখাশোনা করছেন তার দুই ছেলে মো. জাবেদ হোসেন ও মো. মানিক মিয়া। বর্তমানে তাদের হাত ধরেই পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে পুরান ঢাকার বিউটি লাচ্ছি। সমাদৃত হচ্ছে সারা দেশের মানুষের কাছে।
বিউটি লাচ্ছির প্রধান দোকানসহ শাখা দুটি দোকানেও খাবারের গুণগত মান ও দাম একই রকম। এখানে স্পেশাল লাচ্ছি ৪০ টাকা, স্পেশাল বিট লবণ লাচ্ছি ৪০ টাকা, নরমাল লাচ্ছি ৩০ টাকা, নরমাল বিট লবণ লাচ্ছি ৩০ টাকা, ফালুদা স্পেশাল ৮০ টাকা, ফালুদা নরমাল ৬০ টাকা ও লেবুর শরবত ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া নানা ধরনের ফলের মজাদার ও পুষ্টিকর ফলের জুস পাওয়া যাচ্ছে এ দোকানগুলোতে। সপ্তাহে সাত দিনই খোলা থাকে দোকানগুলো। শুধু শুক্রবার সকাল থেকে জুমার নামাজের আগ পর্যন্ত বন্ধ থাকে প্রতিটি দোকান। গরম বেশি পড়লে বিক্রির পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। প্রতিদিন ১০০০ থেকে ১২০০ গ্লাস লাচ্ছি বিক্রি হয় প্রতিটি দোকানে। আর স্বাভাবিক সময়ে ৬০০ থেকে ৭০০ গ্লাসের মতো।
আশুলিয়া থেকে কোর্টের কাজে ঢাকায় এসেছেন দীপ্তি রানী সরকার। তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার কাজের জন্য প্রায় প্রতি মাসেই ঢাকায় আসা হয়। এই নিয়ে ছয়বার এখানকার লাচ্ছি আর ফালুদা খাওয়া হলো। ঢাকায় এলেই এখানে আসতে ভুল করি না। এখানকার লেবুর শরবতটাও অনেক ভালো হয়।’ পুরান ঢাকার স্থানীয় মাজেদ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে বিউটি লাচ্ছি নিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক দিন খেয়েছি এখানকার লাচ্ছি, ফালুদা, শরবত থেকে শুরু করে প্রায় সব আইটেমই। কোনো ধরনের ক্ষতিকর মেডিসিন বা অন্য কিছু ব্যবহার না করেও যে ভালো কিছু তৈরি সম্ভব, সেটির একটি উদাহরণ বিউটি লাচ্ছি। হোটেলে আমার বেশি আসা হয় না। এখানে যারা কাজ করে তাদের ফোন দিয়ে বললে আমার বাসায় দিয়ে আসে।’
এমনভাবে অনেকেই এখানে আসে শুধু খাওয়া বা পান করার জন্য নয় বরং একটা সময়, একটা ঐতিহ্য মনে করার জন্য এবং ভবিষ্যতের সাক্ষী হওয়ার জন্য।
দোকানের কারিগর জাকির হোসেন ৩৪ বছর ধরে লাচ্ছি ও ফালুদা তৈরি করছেন। তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, ফালুদার প্রধান উপকরণ দুধের মালাই। লাচ্ছি কিংবা ফালুদা তৈরির উপকরণে কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার করেন না। এ কারণে বিউটির লাচ্ছি ফালুদার এত নামডাক। ফালুদা তৈরি করা হয় নুডলস, সাগুদানা, কলা, দুধের মালাই, খোরমা খেজুর, কিসমিস, আনার, আপেল, চেরি ফল, চিনির শিরা ও মধু দিয়ে। বাজারের নুডলস নয়, নিজেদের তৈরি করা নুডলস ব্যবহার করেন ফালুদা তৈরিতে। জাকির আরো বলেন, পুরান ঢাকার জš§দিন, বিয়ে, গায়ে হলুদসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডাক পান তারা। শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানেও যান তারা চুক্তির মাধ্যমে।
ঘরে বসেই বানাতে পারেন বিউটি লাচ্চি এবং ফালুদা:
লাচ্ছি বানানোর উপকরণ: পানি পরিমাণমতো, লেবু ৪টা, চিনির সিরা ৪০০ গ্রাম এবং বরফকুচি পরিমাণমতো।
লাচ্ছি বানানোর প্রণালি: পানির সঙ্গে চিনির সিরা আর লেবুর রস মেশালেই হয়ে যাবে শরবত। আট গ্লাস শরবতের জন্য ৪০০ গ্রাম চিনির সিরা তৈরি করে নিতে হবে। এবার আটটি গ্লাসে পানির সঙ্গে সিরা মিশিয়ে নিন। প্রতি গ্লাসে অর্ধেকটা করে লেবুর রস চিপে দিন। তবে যে কোনো লেবু হলে হবে না, বিউটির শরবতের মতো স্বাদ পেতে চাইলে কিনতে হবে কলম্বো লেবু। প্রতি গ্লাসে পরিমাণমতো বরফের কুচি দিয়ে পরিবেশন করুন।
ফালুদা বানানোর উপকরণ: সাগুদানা, নুডুলস সেদ্ধ, দুধের মালাই, চিনির সিরা, পাকা কলা, পেস্তাবাদাম, খুরমা খেজুর, আপেল কুচি, আনার, কলা, আঙ্গুর ও কিসমিস।
ফালুদা বানানোর প্রণালি: প্রথমেই নুডলস আর সাগুদানা সেদ্ধ করে নিতে হবে এবং দুধ চুলায় জ্বাল দিয়ে মালাই তৈরি করতে হবে। এবার একটি পাত্রে নুডলস, সাগু আর মালাই নিন। এতে পরিমাণ মতো চিনির সিরা দিন। ভালোভাবে মিশিয়ে নিয়ে পাকা কলা, পেস্তাবাদাম, খুরমা খেজুর, আপেল কুচি, আনার, আঙ্গুর ও কিসমিস কুচি করে দিয়ে পরিবেশন করুন।
দোকানের বর্তমান মালিক মো. মানিক মিয়া বলেন, ‘বাপ-দাদার রেখে যাওয়া নাম করা বিউটি লাচ্ছি, এটি কখনো যাতে নিজেদের নাম ও মান থেকে সরে না যায় সেই চেষ্টাই থাকবে সব সময়। আর এখন পর্যন্ত মানের দিকটি ঠিক রাখতে পারছি বলেই বিভিন্ন স্থান থেকে কাস্টমার আসছে এবং পরেরবার আসার সময় নিজের পরিচিতদেরও নিয়ে আসছে।’ দোকানের অন্য মালিক জাবেদ হোসেন বলেন, আমরা সবসময় দোকান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখি। কর্মচারীরাও পরিষ্কার থাকে। পিকনিক ও বিয়ে বাড়িতে চুক্তিতে যাওয়া হয়। নিজেদের লোক দিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শরবত লাচ্ছি তৈরি করা হয়। এখানে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ ক্রেতাসহ ছাত্রছাত্রীরা বেশি আসে।’ ‘আমরা তিন পুরুষ ধরে লাচ্ছি ফালুদা বিক্রি করছি। দাদা আজিজ গোড়াপত্তন করে গেছেন। আমি চাই আমার ছেলেও এই ব্যবসা ধরে রাখুক।’ সূত্র : মানবকন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত