প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তাদের স্ত্রীরাও!

নিজস্ব প্রতিবেদক : নুর মোহাম্মদরা ছিল ছয় ভাই। টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিল তারা। কিন্তু ইয়াবার সঙ্গে সখ্য গড়ায় ২০১৪ সালে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় নুর মোহাম্মদ। এভাবে স্বজন হারানোর পরও অন্ধকার এ জগৎ বেছে নিয়েছে তার অপর পাঁচ ভাই- নুরুল হুদা, নুরুল কবির, শামসুল হুদা, সরোয়ার কামাল ও নুরুল আবসার। বেপরোয়াভাবে ইয়াবা পাচার করে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছে এরা প্রত্যেকেই। তাই মাদক পাচার করা গডফাদারের তালিকায় উঠেছে এই পাঁচ ভাইয়েরও নাম। বন্দুকযুদ্ধে স্বজন হারানোর পর একই পথে হেঁটেছে জাহেদ হোসেন জাকু এবং আকতার কামালের পরিবারও। তাই তো জাকুর জামাই মোহাম্মদ ফয়সাল ও আকতার কামালের ভাই সাহেদ কামালও এখন তালিকাভুক্ত শীর্ষ ইয়াবা পাচারকারী।

সম্পদই জীবনের সব- এটা ভেবে পরিবারের প্রায় সবাইকে নিয়ে মাদক ব্যবসায় আছে কেউ কেউ। টেকনাফ সদরের নাজিরপাড়ায় বাবা মোহাম্মদ ইসলাম তিন ছেলেসহ, সদর ইউপির সৈয়দ হোসেন তিন ভাইসহ, এমপি বদির পাঁচ সৎভাইয়ের সবাই ও উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদ তিন ছেলেসহ আছেন মাদক পাচারের তালিকায়! সব মিলিয়ে এই সাত পরিবারের ২৫ সদস্যের নাম জড়িয়ে আছে মাদক পাচারের সঙ্গে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘মাদক পাচার করে অল্প সময়ে প্রচুর বিত্তবৈভব হচ্ছে অনেকের। লোভে পড়েই পরিবারের স্বজনরা মিলেমিশে জড়িয়ে পড়ছে এ ব্যবসায়। বন্দুকযুদ্ধে স্বজন হারানোর পরও কেউ সম্পত্তির মায়া ত্যাগ করতে পারছে না। আবার বাবা-ছেলের পবিত্র সম্পর্ককেও কলুষিত করে মাদক ব্যবসায় জড়াচ্ছে কেউ কেউ।’

স্বজন হারানোর পরও মনোযোগ ওদের সম্পদে

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা গ্রামের বাসিন্দা মৃত আবুল কাশেমের ছয় সন্তানের সবাই ইয়াবার তালিকাভুক্ত আসামি। নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া অভাব-অনটনের সংসার কাছে থেকে দেখেছে তার বড় ছেলে নূর মোহাম্মদ। তাই চোরাচালানের অপরাধে সবার আগে যুক্ত হয় সে। এর পর তাকে দেখে অন্ধকার এ পথে পর্যায়ক্রমে পা বাড়ায় নুরুল হুদা, নুরুল কবির, শামসুল হুদা, সরোয়ার কামাল ও নুরুল আবসার। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তাদের স্ত্রীরাও! ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি নুর মোহাম্মদের বাড়ি থেকে ৫০ হাজার ইয়াবা ও ইয়াবা বিক্রি করে আয় করা তিন লাখ ৮৯ হাজার টাকাসহ তার স্ত্রী মিনারা বেগমকে আটক করে র‌্যাব-৭। আবার ৩ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের মরিচ্যা চেকপোস্ট এলাকায় ফের অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও সাত হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয় নুর মোহাম্মদের দুই ভাই নুরুল হুদা, শামসুল হুদা ও তাদের কর্মচারী মো. ইসমাইলকে। এ ঘটনার পর র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয় নুর মোহাম্মদ। কিন্তু স্বজন হারানোর পরও সম্পদের লোভে এ অন্ধকার জগৎ ছাড়েনি তার অপর ভাইয়েরা। মিলেমিশে মাদক ব্যবসা করে এখন অঢেল সম্পদের মালিক তারা। টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া বিজিবি চেকপোস্টের সামনে আছে এ পরিবারের পাঁচতলার একটি আবাসিক কটেজ।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ভূমিসহ এ আবাসিক কটেজের দাম হবে কয়েক কোটি টাকা। একই ইউনিয়নের আলীখালী রাস্তার মাথায় নুর মোহাম্মদের ভাই নুরুল কবির নির্মাণ করেছে দৃষ্টিনন্দন আরেকটি বাড়ি। গোলাপি ও টিয়া রঙে নির্মিত কোটি টাকার এ বাড়িটির সৌন্দর্য দৃষ্টি আকর্ষণ করে দূর থেকেও। টেকনাফ পৌরসভার নাইট্যংপাড়ার ভিতরের গলিতে ভগ্নিপতি ইউনুচের নামে নির্মাণ করা হচ্ছে চারতলার আরেকটি বাড়ি। স্থানীয়রা বলছেন, ভগ্নিপতির নামে নির্মাণ করা হলেও এ বাড়ির অর্থ জোগান দিয়েছে নুর মোহাম্মদের ভাইয়েরা। হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা স্টেশনের পাশে সুরম্য আরেক অট্টালিকা আছে তাদের। লেদা এলাকার জালাল সওদাগরের বাড়ির পাশে আরেকটি বাড়ি আছে তাদের। আবার টেকনাফ পৌরসভার উত্তর নাইট্যংপাড়ার প্রধান সড়কের পাশে নুর মোহাম্মদ ও তার ভাইয়েরা কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ১০ শতক জায়গা কিনেছে। টেকনাফ পৌরসভার হেচ্ছার খাল ব্রিজের পশ্চিম-দক্ষিণ সংলগ্ন মৃত কবির উকিলের ভাড়া বাসাসহ জমিটিও প্রায় ৪০ লাখ টাকায় কিনে নিয়েছে তারা। হ্নীলা ইউনিয়নের আলীখালী কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিকের পাশেও আরেকটি বাড়ি রয়েছে তাদের।

গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, নুর মোহাম্মদ ও তার ভাইদের নামে-বেনামে প্রায় দুই ডজন বাস, হাইস, মাইক্রো, চাঁদের গাড়ি (জিপ) ও ট্রাক রয়েছে। তাদের পরিবারের মালিকানায় বেশ কয়েকটি ফিশিং বোটও রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। এক সময় অর্থকষ্টে থাকা এ পরিবারের বেশ ক’টি গাড়ি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রোডে চলাচল করে বলেও জানায় আরাকান পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন। শুধু নুর মোহাম্মদের পরিবার নয়; স্বজন হারানোর পর একইভাবে সম্পদের পাহাড় গড়েছে ক্রসফায়ারে নিহত হওয়া জাহেদ হোসেন জাকু এবং আকতার কামালের পরিবারও। জাকু নিহত হওয়ার পর তার সাম্রাজ্য চালাচ্ছে তারই জামাই মোহাম্মদ ফয়সাল। আর সম্প্রতি ক্রসফায়ারে নিহত হওয়া এমপি বদির বেয়াই আকতার কামালের সাম্রাজ্য রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে তার ভাই সাহেদ কামাল।

মিলেমিশে মাদক ব্যবসা করছে বাবা-ছেলেও

পারিবারিক সম্পর্ক ভুলে গিয়ে টেকনাফে অনেকে জড়িয়ে পড়েছে মাদক ব্যবসায়। এমপি বদির পাঁচ সৎভাই- মো. আবদুল শুক্কুর, মজিবুর রহমান, শফিকুল ইসলাম, আবদুল আমিন, ফয়সাল রহমান সবাই মাদকের তালিকাভুক্ত আসামি। এ ব্যবসা করে বদির ভাই মুজিবুর রহমান ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হয়েছে। টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করছে সে। উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ ও তার তিন ছেলে মোস্তাক, শাহাজাহান মিয়া এবং দিদারও আছে মাদক পাচারকারীর তালিকায়। এর মধ্যে শাহজাহান মিয়া আবার সদর ইউপির চেয়ারম্যান। টেকনাফ সদরের নাজিরপাড়া ইউনিয়নের মোহাম্মদ ইসলাম মাদকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তিন ছেলে জিয়াউর রহমান, আবদুর রহমান ও কামাল হোসেনকে নিয়ে। সদর ইউনিয়নের সৈয়দ হোসেন একইভাবে তালিকায় আছে অপর তিন ভাই জামাল হোসেন, নুরুল আলম ও জাহিদ হোসেনসহ। এর মধ্যে নুরুল আলম আবার এমপি বদির ভগ্নিপতি।

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সাবেক সাংসদ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেই এমপি বদি ঠিক রেখেছেন তার গদি। তার ভাইয়েরা ইয়াবা ব্যবসার তালিকায় থাকলেও কখনও তাদের বাধা দেননি তিনি। বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে আমার ছেলের মতো আরও অনেকের নাম তালিকাভুক্ত করতে প্রভাব খাটিয়েছেন। শীর্ষ জনপ্রতিনিধির এমন অবস্থানের কারণে এখানে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে মাদকের বিস্তার।’

অন্যদিকে উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ বলেন, ‘তালিকায় ছেলেরাসহ আমার নাম থাকলেও সেটি ভুল কোনো তথ্যের ভিত্তিতে হয়েছে। আমি মাসখানেক আগে এ বিষয়টি লিখিত চিঠি দিয়ে মন্ত্রণালয়ে অবহিত করেছি। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে নির্ভুল তালিকার মাধ্যমে। তা না হলে একজন মারা যাওয়ার পর তার পরিবারের আরেকজন হাল ধরবে মাদক সাম্রাজ্যের।’ সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত