প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আগে আটক, পরে যাচাই!

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীতে গত তিন দিনে বেশ কয়েকটি বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব ও পুলিশ। এসব অভিযানে প্রতিবার একসঙ্গে শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা দাবি করেছে, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরই কেবল গ্রেফতার বা ভ্রাম্যমাণ আদালতে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। বাকিদের ছেড়ে দেওয়াও হয়েছে। তবে আটক অনেকের পরিবার অভিযোগ করেছে, কোনও অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও তাদের পরিবার সদস্যদের আটকের নামে হয়রানি করা হচ্ছে। আটকের পর এমন অনেক পরিবারের সদস্যদের কান্নাকাটি করে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে অভিযোগ করতেও দেখা গেছে। গণহারে এভাবে আটক করে পরে আসামি যাচাই করা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এসব পরিবার।

সোমবার (২৮ মে) রাজধানীর ধলপুর, শাহ আলী এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ । এ সময় গণহারে গ্রেফতার করা হয়। আটক ব্যক্তিদের অনেক স্বজনকেই তখন দেখা গেছে কান্নাকাটি করতে।

ধলপুর সিটি পল্লী বস্তি থেকে হারুন মিয়া নামে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক গাড়িচালককে আটক করে পুলিশ। সোমবার বেলা ২টার দিকে রাজধানীর ধলপুরে র‌্যাবের ব্যাটালিয়ন ১০ সদর দফতরের সামনের সড়কে থাকা একটি পুলিশের প্রিজন ভ্যানের পেছনে এক তরুণীকে চিৎকার করে কান্নাকাটি ও আহাজারি করতে দেখা যায়। তিনি কান্না করে বলছিলেন, ‘তার ভাই রাতে ডিউটি করে ভোরে বাসায় এসে ঘুমিয়ে ছিল। তাকে কেন ধরলো? সে একটা সিগারেটও খায় না। তার দোষ কি? আমার ভাইকে ছেড়ে দিন।’

প্রিজন ভ্যানের পেছনে দৌড়াচ্ছিলেন আর কান্না করে যখন এই কথাগুলো বলছিলেন তিনি তখন ভ্যানটি কড়া পুলিশ পাহারায় ওই এলাকা থেকে চলে যায়।

পরবর্তীতে ওই তরুণী ও এক নারী অভিযোগ করেন। তরুণীর নাম হাসি আক্তার এবং নারী তার মা ফুলমতি বেগম। ধলপুর সিটি বস্তি এলাকা থেকে সকালে হাসির বড় ভাই হারুন মিয়া (৩৫)-কে আটক করেছে পুলিশ। হারুন মিয়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) গাড়িচালক। তিনি রাতভর ময়লার গাড়ি নিয়ে রাজধানীতে ডিউটি করেছেন। ভোরে বাসায় গিয়ে ঘুমে ছিলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করতে বাইরে যান। তখন পুলিশ তাকে আটক করে।

ধলপুর সিটি বস্তি ও ১৪ নম্বর আউটফল এলাকা থেকে ৫৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় ছয় হাজার ইয়াবা, ৬ কেজি গাঁজা ও শতাধিক পুরিয়া হেরোইন উদ্ধার করা হয়।

অভিযানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও থানা পুলিশ অংশ নেয়। সারাদেশে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে গোপন তথ্যের ভিত্তিতেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে জানান যুগ্ম কমিশনার মনির হোসেন।

তবে আটক ব্যক্তিদের স্বজনরা জানিয়েছেন তারা অনেকেই নিরপরাধী। পুলিশ কোন মাদক ছাড়াই তাদের আটক করেছে।

গাড়িচালক হারুন মিয়াকে আটক করার পর থেকে তার বোন হাসি ও মা ফুলমতি কখনও রাস্তায় বসে, কখনও প্রিজন ভ্যানের পেছনে ছুটেছেন কান্না করে। তারা ছাড়াও অনেকে আহাজারি করেছেন। এদের মধ্যে পরিবারের একমাত্র উপার্জন করা ব্যক্তিও রয়েছেন। তাই পরিবারের অসহায় নারী সদস্যদের কান্না করতে দেখা গেছে বেশি।

হাসি আক্তার বলেন, ‘আমার ভাই সিটি করপোরেশনের গাড়ি চালায়। সে একটা সিগারেটও খায় না। সারা রাত সে সিটি করপোরেশনের গাড়িতে ডিউটি করেছে। তাকে কেন ধরলো? যারা মাদক ব্যবসা করে তাদের কেন ধরে না?’

মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে হাসির মা ফুলমতি মেয়েকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন। তারা কখনও থানায় যাননি। এখন কী করবেন, তাও তারা বুঝতেছেন না। হারুন মিয়ার ‍বৃদ্ধ বাবা প্রিজন ভ্যানের পেছনে পেছনে চলে গেছেন।

হারুন মিয়া বিবাহিত। তিনি স্ত্রী খাদিজা বেগম ও দুই সন্তান নিয়ে সিটি বস্তিতে থাকেন। একই বস্তিতে বাবা-মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে আগে একসাথেই ছিলেন। বিয়ে করে সংসার হওয়ায় তিনি পাশের একটি বাড়িতে এখন আলাদা থাকেন। তার বড় ছেলে জুম্মনের বয়স ৮ বছর এবং মেয়ে ছোট হাফিজার বয়স ১৪ মাস। তাদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর শ্যামবাগ এলাকায়।

হারুন মিয়ার জন্য যখন তার অসহায় মা, বোন ও স্ত্রী রাস্তায় দাঁড়িয়ে কান্না করছেন, তখন তাদের পাশে আরো কয়েকজন নারীকে কান্না করতে দেখা গেছে। তাদেরও কারো ছেলে, কারো ভাই অথবা কারো স্বামী এবং স্বজন আটক হয়েছে অভিযানে। অনেককে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। কেউ কেউ আবার বিচার চেয়েছেন।

সিটি বস্তিতে মূলত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নকর্মী, ভ্যান চালক, গাড়ি চালক, রিকশা চালকরা থাকেন। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বেশিরভাগ পরিচ্ছন্নকর্মী রয়েছেন।

সুমি বেগম নামে এক নারী কান্না করে বলেন, ‘আমরা বড় ছেলের নাম খোরশেদ আলম। সে সিটি করপোরেশনের ‘ময়লার কাজ’ করে। সকালে কাজে যাচ্ছিল, তখন তাকে আটক করেছে পুলিশ। আমার জানামতে সে কোনও মাদক নেয় না।’

রিকশাচালক সবুর হোসেনের স্ত্রী সুফিয়া বেগম বলেন, ‘আমার স্বামীকেও আটক করেছে। কেন আটক করেছে, বুঝতে পারছি না। কেন ধরলো কেউ কিছু বলল না। আমাদের ঘরে পুলিশ কোনও কিছু পায়নি। সে ঘরে না থাকলে আমাকে বাচ্চা নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে। আমি নিজে হোটেলে কাজ করি। আজ কাজও করতে পারবো না। এখন কোথায় যাবো?’

হেনা বেগম নামে এক নারী রাস্তায় দাঁড়িয়ে কান্না করছিলেন। তার ছেলে সোহেলকে আটকের বিচার চেয়ে চিৎকার করছিলেন। বারবার আটকের কারণ জানতে চেয়েছিলেন। তবে ততক্ষণে তার ছেলেকে বহনকারী প্রিজন ভ্যানটি সেখানে নেই। তার কোলে দুই বছরের এক শিশুকে দেখা গেছে। এরপর তার ছোট ছেলে তাকে টেনে বাসায় নিয়ে যান। এর আগে হেনা বেগম বলেন, ‘আমাদের গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুরে। আমার ছেলে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী। তাকে বাসা দিয়ে ধরে নিয়ে গেছে। বাসায় সার্চ করে কোনও কিছু পায়নি।’

অভিযান শেষে বেলা আনুমানিক দেড়টার দিকে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মনির হোসেন সেখানে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এখানে অভিযান চালিয়েছি। যাদের আটক করা হয়েছে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। আমরা মানবাধিকারের বিষয়ে শতভাগ সচেতন। কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না।’

রবিবার রাজধানীর হাজারীবাগ, গণকটুলী ও কাওরান বাজার এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে শতাধিক নারী ও পুরুষকে আটক করে পুলিশ। হাজারীবাগ, গণকটুলী এলাকায় অভিযান সম্পর্কে ডিএমপির ধানমন্ডি জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) আব্দুল্লাহিল কাফি জানান, ‘আমরা ১০৫ জনকে আটক করেছিলাম। তাদের মধ্যে যাচাই বাছাই করে ৫৫ জনকে ছেড়ে দিয়েছি। বাকি ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এদের মধ্যে চারজন্ নারীও রয়েছে।’

তবে আটকের সময় যাচাই বাছাই করার সুযোগ থাকছে কম। প্রথমেই কোনও এলাকায় ঢুকেই গণহারে আটক করে পুলিশ। পরবর্তীতে থানায় নিয়ে গিয়ে তাদের যাচাই-বাছাই করা হয়। একই দিন কাওরান বাজার এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে ৪৭ জনকে আটক করা হয়ে।

এর আগে শনিবার রাজধানীর জেনেভা ক্যাম্প থেকে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করে র‌্যাব। এতে নারী, পুরুষ, তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ ছিল। সন্ধ্যা নাগাদ যাচাই বাছাই করে তাদের মধ্যে সাড়ে ৩শ’ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এদের মধ্যে ১৫৩ জনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ৭৭ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। বাকিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করেন।

র‌্যাব ব্যাটালিয়ন ২-এর অধিনায়ক আনোয়ার উজ জামান বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নেই তাদের আটক করা হয় না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই আটক ও গ্রেফতার করা হয়। সকলের বিষয়ে আলাদা আলাদা তথ্য যাচাই করে দেখা হয়।’

এদিক অভিযানে আটক ও গ্রেফতারের বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশনস) মীর রেজাউল আলম।

তিনি বলেন, ‘এই অভিযানের কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ দেখছে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান। মাদকের বিরুদ্ধে গণসচেতনতাও সৃষ্টি হচ্ছে।’ সূত্র :  বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত