প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঈদ যাত্রায় দুর্ভোগের শঙ্কা

ডেস্ক রিপোর্ট : সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশায় এবার ঈদে দুর্ভোগে পড়বে ঘরমুখো মানুষ- ঈদের আগেই হঠাৎ করে যানজট বেড়ে যাওয়া, সড়ক-মহাসড়কের খানাখন্দ মেরামত না হওয়া ও সড়ক প্রশস্ত করার কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ায় এমন আশঙ্কা করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যত্রতত্র যানবাহন পার্কিং ও যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় দুর্ভোগ আরো বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে দুর্ভোগ এড়াতে আগামী ৮ জুনের মধ্যে সড়ক-মহাসড়কের মেরামত ও সংস্কার কার্যক্রম শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কিন্তু বাস্তবে তা কতটা সম্ভব, তাই নিয়েও রয়েছে সংশয়।

ওবায়দুল কাদের জানান, ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি ও যানজট নিরসনে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে। আগামী ৮ জুনের মধ্যে মেঘনা টোল প্লাজাসহ রাস্তার সমস্যা সমাধানের জন সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সড়ক সংস্কারে কারো উদাসীনতা সহ্য করা হবে না।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম জানান, ঈদে ঘরমুখো মানুষের যেন ভোগান্তি না হয় সে জন্য দিন-রাত কাজ চলছে। তিনি বলেন, আসছে বর্ষা মৌসুম ও ঈদের আগেই সব সড়কের সংস্কার ও মেরামত কাজ শেষ হবে। মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণ খাতের কর্মসূচিতে গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত অগ্রগতি ছিল ৪০ শতাংশ। এখন আরো অগ্রগতি হয়েছে। আশা করি ভোগান্তি হবে না।

সচিব আরো জানান, গত অর্থবছরে বন্যা ও অতি বৃষ্টিতে মহাসড়কের বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্ষার কারণে প্রায় ৩ মাস দেরিতে সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কাজ শুরু করতে হয়েছে। এর মধ্যে গত বন্যায় ও অতি বৃষ্টিতে ২২টি জেলার ৬২টি স্থানে ৪ দশমিক ৯২ কিলোমিটার মহাসড়ক বিলীন হয়ে গেছে। ৭৫টি স্থানে ৬৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার মহাসড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় ২৫১টি স্থানে পাহাড় ধসে মহাসড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া বন্যায় মোট ৫ হাজার ১১৫ কিলোমিটার মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সচল করতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সার্বিক কার্যক্রম তদারকির জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ২৩টি টিম গঠন করা হয়েছে। তারা উন্নয়ন কার্যক্রম গভীরভাবে তদারকি করছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ৪২ শতাংশ এরই মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। উন্নয়ন কর্মসূচির অধিকাংশ কাজই দ্রুততার সঙ্গে চলছে।

দেশে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন ৮৭৬টি মহাসড়ক আছে। এর মধ্যে ৯৬টি জাতীয়, ১২৬টি আঞ্চলিক এবং ৬৫৪টি জেলা মহাসড়ক রয়েছে। বছরজুড়েই এসব সড়ক-মহাসড়কে রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান থাকে। যানজট এড়াতেও পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু তারপরও প্রতি বছর ঈদের আগে সড়ক-মহাসড়কগুলোতে বেহাল অবস্থার কারণে লাখ লাখ মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এবার ঈদ আসতে এখনো অনেক সময় বাকি থাকলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ অন্যান্য সড়কে যানজট সৃষ্টি হওয়ায় সবার মধ্যে আগেভাগেই ভোগান্তির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ‘ভোগান্তি হবে না’- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এমন নিশ্চয়তা এখন পর্যন্ত দিতে পারছেন না। সব ঈদেই ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ব্যবহারকারী যাত্রী ও যানবাহন সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়। এবারো এই আশঙ্কা প্রবলভাবে দেখা দিয়েছে। সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সব সড়ক-মহাসড়কেই সংস্কার ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যথাসময়ে শুরু করা হয়েছে। কিন্তু এবার অতি বৃষ্টির কারণে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সব সড়কে মেরামত কাজ চলছে। ঈদের আগে অতি বৃষ্টির কারণে যেন সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি না হয় সে দিকেও লক্ষ্য রেখে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক : গত সপ্তাহে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ৬০ কিলোমিটারের বেশি যানজটের সৃষ্টি হয়। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা এই সড়কের মেঘনা সেতু, দাউদকান্দি, চৌদ্দগ্রাম, ফেনী, কুমিরা ও সীতাকুণ্ড পর্যন্ত যানজটের আশঙ্কা করছেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের হানিফ পরিবহনের বাসচালক রফিকুল ইসলাম জানান, যানজট নিরসনে বাস্তবমুখী কোনো পদক্ষেপ এখনই নেয়া না হলে ঈদের আগে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি দূর হবে না। এবার এই ভোগান্তি আরো বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে, এই দীর্ঘ সড়কের কোথাও দুই লেন, আবার কোথাও চার লেন। কোনো স্থানে মহাসড়কের ওপরই হাটবাজার বসে। যানবাহন পার্কিং করার কারণেও যানজটের সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে আবার ফেনীতে ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ চলমান থাকায় সমস্যা যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা রোজা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই কিছুটা আঁচ করা গেছে। ফেনীর ফতেহপুর রেলক্রসিং এলাকায় ওভারপাস নির্মাণের কারণে এবার চট্টগ্রামের কুমিরা পর্যন্ত অন্তত ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত সড়কে যানজটের আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট ঢাকার কাছের কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। রোজার প্রথম দিনেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়া অংশেও ১৩ কিলোমিটার সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। হাইওয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, এখানে ‘মেঘনা’ ও ‘মেঘনা-গোমতী’ পরপর দুটি সেতু রয়েছে। এই সেতু গজারিয়া অংশে দুই লেনের এবং মহাসড়ক চার লেনের। ফলে মহাসড়কের চার লেন দিয়ে আসা যানবাহন দুই লেনে জায়গা নিতে গিয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। আসছে ঈদে যানবাহনের চাপ বেড়ে গেলে এখানেও তীব্র যানজট সৃষ্টি হবে। এর রেশ ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও কিলোমিটারের পর কিলোমিটার যানজট দেখা দেবে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল : ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। এবারো এই সড়কে তীব্র যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। অনেক দিন ধরে সাউথ এশিয়ার সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক) প্রকল্পের আওতায় সড়কটি চার লেনে উন্নয়নের কাজ চলছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ঈদের আগে এই কাজের আরো অগ্রগতি হবে। কাজ শেষ না হলেও যানজট এড়াতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, চার লেনের কাজের কারণে মির্জাপুর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে দীর্ঘ যানজটে সৃষ্টি হয়। এর রেশ গাজীপুরের চান্দনা ও সাভারের আশুলিয়া সড়কেও পড়ছে। এই সড়কের ভোগড়া বাইপাস থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত রাস্তার চার লেনের উন্নয়ন কাজের কারণে মহাসড়কের উন্নয়নে মাটি, বালু ভরাট, ইট বিছানোসহ কার্পেটিং কাজে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতি ও উপকরণ রাখার কারণেও যানজটের সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক : ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক আর এশিয়ান হাইওয়েতেও যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। দেশের পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগের জেলাগুলোসহ নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশপাশের বেশ কয়েকটি জেলার মানুষ এই সড়কটি ব্যবহার করে। ঈদের আগে এই সড়কেও যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। এর ফলে বরাবরই নরসিংদীর ভুলতা থেকে বিভিন্ন স্থানে যানজট সৃষ্টি হয়। সড়কের বিভিন্ন স্থান গর্ত ও ভাঙা থাকা, কাঞ্চন সেতুর টোল প্লাজার কারণে এখানে যানজট বেড়ে যায়। হাটের দিন রাস্তার পাশে হাট বসার কারণে যানবাহনের গতি কখনো কখনো ১৫ কিলোমিটারে নেমে আসা, রাস্তার পাশে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে ১৪ থেকে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক : দেশের উত্তরাঞ্চল এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিভাগের ৫ জেলায় যাতায়াতের প্রধান সড়ক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। এবার ঈদ যাত্রায় এই সড়ক ব্যবহারকারীদের ভোগান্তির আশঙ্কা অন্যান্য বারের চেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন যাত্রী ও বাসচালকরা। টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সড়কের এমনই বেহাল অবস্থা, যেতে আড়াই ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। এখনই পানি জমে বড় বড় গর্তের কারণে যানবাহন ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে। টঙ্গী থেকে চান্দরা পর্যন্ত ঈদের আগে এই সড়কের মেরামত কাজও হবে। তবে রাস্তার চার লেনের উন্নয়ন কাজ চলমান থাকা এবং বৃষ্টি হলে এই সড়ক গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে। অতি বৃষ্টি হলে ডেনেজ ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার কারণে এই সড়কের ভয়াবহতা কোন পর্যায়ে যাবে তা যানবাহন চালকরা এখনই আঁচ করতে পারছেন। এই সড়কে চার লেন নির্মাণ কাজের কারণে জয়দেবপুর চৌরাস্তা পেরিয়ে শ্রীপুরের জৈনাবাজার পর্যন্ত যানজট ও দুর্ভোগের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

যশোর-বেনাপোল সড়ক : ভয়াবহ রকমের খানাখন্দের পরও আইনি জটিলতার কারণে যশোর-বেনাপোল সড়কটি মেরামত হয়নি। ঈদের আগে ও পরে লাখ লাখ মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করে নাড়ির টানে বাড়ি এবং ছুটি কাটাতে ভারতে যাবে। এখানেও মানুষ দুর্ভোগে পড়বে। সড়কটি মেরামতের জন্য কিছুদিন আগে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সরকারের নানা উদ্যোগ : মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ১ হাজার ৭০৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অনুক‚লে ১৩ হাজার ৭০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বন্যা ও অতি বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অতিরিক্ত আরো ১ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ খাতের অধীনে চলতি অর্থবছরে গৃহীত ও চলমান কর্মসূচির সংখ্যা ১৮৬টি এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় চলমান প্রকল্পের সংখ্যা ১২৫টি।

অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে সড়ক-মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণ খাতে দৈনন্দিন মেরামতের জন্য ১০০ কোটি টাকা, পিএসই মাইনর কর্মসূচির আওতায় ৫৫৯ কোটি টাকা, পিএমপি মেজর কর্মসূচির আওতায় ১ হাজার ১২৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাতে ২০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর ফলে টাকার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সময়ের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক উন্নয়নের জন্য আনুষঙ্গিক অনেক কাজ করতে হয়। জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে নির্মাণকাজ শেষ করার মাঝখানে অনেক কাজ থাকে যেগুলো সম্পন্ন করতে সময়ের প্রয়োজন হয়। তা ছাড়া আবহাওয়ার কারণেও কাজের গতি কমে যায়। আগামী কোরবানির ঈদের আগেই সব সড়কের উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন আর সড়কে কোনো ভোগান্তি থাকবে না বলেই সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। সূত্র : ভোরের কাগজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত