প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাড়তি ট্রিপ লাভের ফাঁদে প্রাণ ঝরছে পথচারীর

ডেস্ক রিপোর্ট : দেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সড়ক মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত ৩ এপ্রিল ঢাকার কারওয়ানবাজারে দুই বাসের পাল্লায় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের হাত কাটা পড়ার ঘটনায় আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে সড়ক দুর্ঘটনা। দুই বাসের মাঝে রাজীবের আটকে যাওয়া কাটা হাতের ছবি দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ওই ছবিটিই মানুষকে নাড়া দেয়। সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। মানুষ আবার সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। যদিও শেষ পর্যন্ত রাজীবকে বাঁচানো যায়নি। রাজিবের ঘটনার পর ঢাকাসহ সারা দেশে একই ধরনের আরো তিন-চারটি ঘটনা ঘটে। তবু থামেনি বাসচালকদের বেপরোয়া বাস চালানো। কিন্তু এসব ঘটনায় একটি জিনিস আছে তাহলো মানুষ কথা বলছে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে। প্রতিবাদ হচ্ছে দুর্ঘটনার নামে সড়কে নীরব হত্যাকা-ের। চাইছে এর অবসান। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চালকরা বেপরোয়া হন নিজ নিজ রুটে বাসের বাড়তি ট্রিপ ধরতে এবং আরো লাভের আশায়। এই ফাঁদেই দুই বাসের মাঝে বা চিপায় পড়ে প্রাণ হারান পথচারীরা, হন পঙ্গু ও বিকলাঙ্গ।

এক পরিসংখ্যানে ওঠে এসেছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২০-২২ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই পথচারী। আর্থিক ক্ষতির হিসাবে বছরে এর পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের এক গ্রামে ছবির শুটিং স্পট দেখে ঢাকা ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন খ্যাতিমান চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী, নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর ছেলে এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন। এ ঘটনার পর তখন বেশ নাড়া পড়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর সবই চুপসে যায়। কিন্তু সম্প্রতি রাজীবের ঘটনাটি মানুষকে নাড়া দেয়। আবারও জেগে ওঠে মানুষ। এখনো প্রতিবাদ চলছে।

সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল যেভাবে চলছে, সেটি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। তবে সড়ক দুর্ঘটনার নতুন কারণ সামনে এসেছে। দুই বাসের চাপায় রাজীবের হাত আটকে গিয়ে কেটে যাওয়া এবং তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরিবহন মালিক এবং শ্রমিকের একটি মানসিকতা ফুটে ওঠেছে। সড়ক দুর্ঘটনার একটি কারণ সামনে এসেছে, যা প্রচলিত ধারণার বাইরে। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর মূল কারণ কী, তা জানা গেছে। আর তা হলো শ্রমিকদের প্রতি মালিকের মুনাফার লোভ।

যত বেশি ট্রিপ তত বেশি লাভ : ঢাকা শহরে পরিবহন ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন চালকদের ওপর। তাদের কোনো বেতন নেই। মালিক প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চালককে গাড়ি দিয়ে দেন। চালককে ওই টাকা দিন শেষে মালিককে দিতেই হবে। এর বাইরে যা আয় হবে তা থেকেই আয় নেবেন চালক এবং বাসের কন্ডাকটর, সুপারভাইজার, হেলপার। তাই কাকডাকা ভোরে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। শেষ হয় মধ্যরাতে। কে কত বেশি ট্রিপ দিতে পারে, কত বেশি যাত্রী তুলতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলে রাস্তায়। একটি বাসকে আরেকটি বাসের পেছনে ফেলার প্রতিযোগিতা। একটি বাস যাত্রী তুলতে গেলে তাকে চাপিয়ে রাস্তার আরেক পাশে হটিয়ে দেয়া। যাত্রী তোলার পাদানির কাছে আরেকটি বাস এমনভাবে অবস্থান নেয় যাতে যাত্রী সহজে উঠতে না পারে। এই প্রতিযোগিতা এবং মরণ রেসের শিকার হন যাত্রী, পথচারী সবাই। এটিই এখন নিত্যদিনের প্রতিযোগিতা।

এখন প্রশ্ন আসছে, দূরপাল্লার বাস মহাসড়কে কেন বেপরোয়া গতিতে চালায়? সেখানেও উত্তর একই রকম। বাসের ড্রাইভার, হেলপার বা কন্ডাকটর বাসের মাসিক বেতনের কোনো কর্মচারী নন। তাদের ভাতা বা বেতন দেওয়া হয় ট্রিপের ওপর। ট্রিপ নেই তো বেতন নেই। উল্টো যত বেশি ট্রিপ, তত বেশি টাকা। মালিকের লাভ চালকের লাভ। আর মাঝখানে মহাসড়কে বাড়ে মৃত্যুর মিছিল।

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, মুনাফার লোভেই মালিক কম দামে ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামায়। ওই গাড়ি চালাতে সে কোনোভাবেই দক্ষ ড্রাইভার খুঁজবে না। সে খুঁজবে কে তাকে দিনের চুক্তির টাকা দেবে। কে তাকে বেশি ট্রিপ দেবে। তাই চালকদের দায়ী করার আগে আমাদের মালিকদের নিয়ে ভাবতে হবে। তাদের দায়িত্বশীলতা এবং আইনের মধ্যে আনতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) চেয়ারম্যান এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, মালিকদের নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে পরিস্থিতি অনুকূলে আনা যাবে না। ট্রিপ অনুযায়ী অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণ দৈনিক টাকা দেয়ার ভিত্তিতে চালকদের হাতে গাড়ি দিয়ে দেয়াই সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ। চালকরা যেহেতু নির্দিষ্ট বেতন পান না তাই তারা বেশি ট্রিপ মেরে বেশি টাকা আয় করতে চান। তার তো পরিবার আছে। তাকে তো জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে হবে। ফলে তার ঘুমানোর সুযোগ কম থাকে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে গাড়ি চালায়। মালিকরা বেশি মুনাফার লোভে চালকদের এটা করতে বাধ্য করে। তিনি আরো বলেন, এখন বাস মালিকরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাদের কেউ সংসদ সদস্য অথবা তারা আমলা বা পুলিশের লোক। ফলে আইন করে পরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনা কঠিন। তবে সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই সম্ভব।

সড়ক এবং গণপরিবহন নিয়ে কাজ করে এ রকম প্রতিষ্ঠানগুলো সড়ক দুর্ঘটনার বেশকিছু সাধারণ কারণ নির্ণয় করেছেন। এর মধ্যে আছে ১. ভাঙাচোরা এবং ত্রুটিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত সড়ক, ২. ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ৩. চালকদের অদক্ষতা ৪. মাদকাসক্তি ও চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার, ৫. বেপরোয়া গতি এবং ৬. ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা। এছাড়া যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার, রাস্তায় ফুটপাত না থাকার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৯৭ জন। অপরদিকে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩ বছরে ১৫ হাজার ৭২৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই আবার চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির কমপক্ষে দুই শতাংশ। এছাড়া বছরে ৫০ হাজার পরিবার সরাসরি এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুত্র : প্রতিদিনের সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত