প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সেদিন আমরাই জিতব!

প্রতীক ইজাজ ;   একটা নির্বাচনের কথা আমার বেশ মনে আছে। আমরা তখন স্কুলে। পাড়ায় একটা ক্লাব ছিল। ক্লাবটি খুব প্রিয় ছিল আমাদের। নানাভাবে ক্লাবের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতাম। সে অর্থে বল-ব্যাট-প্যাড কিনতাম। ট্রাঙ্ক কিনতাম। এমনও হয়েছে, ক্ষেত থেকে শুকনা মরিচ তুলেছি আমরা। বিনিময়ে জমির মালিক মরিচ দিত। সে মরিচ বিক্রি করে ক্লাবের জন্য জিনিসপত্র কিনতাম। পাড়ার একমাত্র সড়ক ঠিক করার জন্য পৌরসভা গম দিত। আমরা দল বেধে নিজেরা রাস্তা ঠিক করতাম। গম বিক্রি করে দিতাম। সে অর্থ ক্লাবে লাগাতাম। নির্বাচন প্রসঙ্গে আসি। আমাদের পাড়াটাই পৌরসভার শেষ অংশ। এর পরই ইউনিয়ন। ওই ইউনিয়নে আমাদের অনেক বন্ধু ছিল। ওরা আমাদের সঙ্গে খেলত, মিশত, সুখে-দুখে পাশে থাকত। মূল সংযোগ ছিল মজনুর মাধ্যমে। মজনুই একদিন একটা প্রস্তাব আনল। প্রস্তাবটা হলো এক চেয়ারম্যান প্রার্থীর পক্ষে আমরা মাঠে থাকব। প্রচারণা চালাব। নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্র পাহারা দেব। প্রতিপক্ষের জাল ভোট বা ভোট কেন্দ্র দখল ঠেকাব। আমাদের প্রার্থীর পক্ষে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করব। বিনিময়ে ওই প্রার্থী আমাদের ১০ হাজার টাকা দেবে। মজনুসহ আমাদের পাড়ার সমবয়সী ১০ জনকে নিয়ে একটা টিম করলাম। টাকা অগ্রিম এনে দিল মজনু। আমরা সে টাকার কিছু রাখলাম প্রতিদিন নির্বাচনি প্রচারণার কাজের জন্য। বাকিটা ক্লাবকে দিলাম। খুব আনন্দ নিয়ে কাজটা করতাম। প্রতি বিকেল থেকে সন্ধ্যা মিছিল করতাম। পোস্টার মারতাম। ব্যানার ঝুলাতাম। এ নিয়ে ওই প্রার্থীর জনপ্রিয়তা অনেক বাড়লো। আবেগ তৈরি হলো ভোটারদের।

যথারীতি নির্বাচনের দিন এল। আমরা ভোটকেন্দ্রে অবস্থান নিলাম। সুন্দর পরিবেশ। ভোট শুরু হলো। ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে ভোট দিতে লাগল। বিপত্তিটা ঘটলো ঠিক দুপুর ১২টার দিকে। হঠাৎ কেন্দ্রের মাঠের পশ্চিম পাশ দিয়ে ভোঁ ভোঁ করে ১০-১২ টি মটর সাইকেল ঢুকল। মটর সাইকেলের সামনে প্রতিপক্ষের প্রতীক ঝুলছে। মাঠের মাঝখানে চক্কর দিতে লাগল বৃত্তাকারে। পরিবেশ বদলে গেল। ভীতসন্ত্রস্ত ভোটাররা পালাল যে যেদিকে পারল। আমরাও প্রস্তুতি নিলাম বাধা দেওয়ার। সামনে যাব। এমন সময় রুবেল বলল, দেখ, সামনের মটর সাইকেলে কে? তাকিয়ে দেখি পাড়ার এক বড় ভাই। তাকে আমরা খুব ভয় পাই। অগত্য পিছু হটলাম। পাছে সে আমাদের দেখে ফেলে এই ভয়ে মুহূর্তেই ওই এলাকা ছাড়লাম। রাতে জানলাম ওই কেন্দ্রে আমাদের প্রার্থী হেরেছে।

সেদিন মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এই খারাপ বহুদিন আমাকে ভাবিয়েছে। এখনো ভাবি। ওই মটর সাইকেল, পেশিশক্তি, তার সঙ্গে যুক্ত রাজনীতির ক্ষমতা- এখন তো প্রধান নিয়ামকই বলা চলে নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের। আগে যেটা হতো এক’দুটি কেন্দ্রে, সীমিত পরিসরে; এখন সেটা রূপ নিয়েছে নির্বাচনের সর্বময় সংস্কৃতিতে। অবস্থা এমন রূপ নিয়েছে যে, এটা যে অপরাধ, তা সে যত ক্ষুদ্র পরিসরেই হোক; সেটা যেন বিবেকেই বাঁধছে না কারো। আমরা মনে করছি, এ আর এমনকি!
প্রসঙ্গটা তুললাম নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ এক সংশোধনীর পরিপ্রেক্ষিতে। সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিধিমালা থেকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তি হিসেবে সাংসদদের নাম বাদ দিয়েছে ইসি। এর ফলে এখন থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনি প্রচারণায় সাংসদরা অংশ নিতে পারবেন। এই নিয়ম ২০১০ সাল পর্যন্ত ছিল। সে বছর সংশোধনী এনে সাংসদদের নির্বাচনি প্রচারণার বাইরে রাখা হয়। উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনি প্রচারণায় সবার জন্য সমতল মাঠ করা। আবার সেই সমতল মাঠের কথা বলেই এবার প্রচারণার সুযোগ ফিরে পেলেন সাংসদরা। তার মানে মাঝখানের এই এত বছর মাঠ সমতল ছিল না; এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে।
প্রশ্ন অনেক। অনেকের। কিছুর সমাধান মেলে। কিছু মিলিয়ে নেই। কিন্তু ওই যে স্কুল জীবনে আমাদের প্রার্থী হেরেছিল; সেই হারাকে আমি

এখনো মেনে নিতে পারি না। আমরা সেদিন ভয়ে পিছু নিয়েছিলাম। টাকাটা ফেরত দিতে পারিনি। প্রার্থীর বিষণœ মুখ আমাদেরও ব্যথিত করেছিল; কষ্ট পেয়েছিলাম। এরপর আমরা আর কোনোদিনই তার মুখোমুখি হইনি।
এখনো যখন ভোটের হিসাব মেলে না; ভোটারদের অবাধ ভোটদান বাধাগ্রস্ত হয়; ভোটকেন্দ্রগুলো উৎসবহীন হয়ে পড়ে; তখনই আমার স্কুলজীবনের ওই প্রার্থীর কথা মনে পড়ে। চোখের সামনে ভাসে তার বিষণ্ণ মুখ। নির্বিঘ্নে ভোটদানের জন্য তার পক্ষ নিয়ে নির্বাচনি মাঠে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি। আমরা ভয়ে পিছু হটেছি। কেন্দ্র ছেড়ে দিয়েছি। আমরা হেরেছি। অথচ পরদিন যখন দেখা করতে গেলাম, অবাক করে অবলীলায় লোকটি বললেন: ভেবো না, এমন দিন থাকবে না, ভোটাররা নিশ্চয় তার পছন্দের প্রার্থীকেই ভোট দিতে পারবে। সেদিন আমরাই জিতব!
লেখক: সাংবাদিক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী / – আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত