প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রকৃতির অভিশাপ বনাম উন্নয়ন

মঞ্জুরুল আলম পান্না :  ২০১৬ সালে ব্রিটেনের শেফিল্ড শহর কর্তৃপক্ষ এ্যামি নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় শহরটির সড়ক এবং ফুটপথ রক্ষণাবেক্ষনের জন্য। শহর সুন্দর দেখাতে উদ্যোগ নেওয়া হলো সেখানকার শতবর্ষী অনেক গাছসহ শেফিল্ডের প্রায় চার হাজার গাছ কেটে ফেলার। মূল উদ্দেশ্য আসলে রক্ষণাবেক্ষণ কাজের খরচ কমিয়ে আনা। অর্থাৎ দীর্ঘকায় গাছগুলোর শেকড় রয়ে গেলে ফুটপথগুলো তুলনামূলকভাবে আরও বেশি বড় করতে হলে দীর্ঘ মেয়াদে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে খরচ অনেক বেশি পড়ত। তাই সহজ হিসেবে কেটে ফেলা। মাথা-ব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো অবস্থা। হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলার পেছনে শেফিল্ড শহর কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল গাছগুলো অনেক পুরানো এবং রোগাক্রান্ত। বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন, শেফিল্ড কর্তৃপক্ষ মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। বললেন, ৭৫ শতাংশ গাছই সম্পূর্ণ ভালো অবস্থায় রয়েছে। কোনোপ্রকার কর্ণপাত করা হলো না পরিবেশবিদ, পরিবেশবাদী আর বিশেষজ্ঞদের আপত্তিতে। বৃক্ষশূন্য হয়ে যাওয়ার সৌন্দর্যহানিতে স্থানীয় ঘরবাড়িগুলোর বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়া, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মানুষের বেঁচে থাকার সুযোগ কমে আসা, মানুষসহ প্রাণীকূলের জীবন-ধারণের জন্য অক্সিজেনের মাত্রা হ্রাস পাওয়া, বন্যা প্রবণতা এবং পরিবেশ দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি সত্ত্বেও নির্মমভাবে গাছগুলো কেটে ফেলল শহর কর্তৃপক্ষ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘এ্যামি’ মিলেমিশে। ওই কাহিনীর এখানেই শেষ নয়।

শেফিল্ড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে করা পিএফআই (পাবলিক ফিনেন্সিয়াল ইনিশিয়েটিভ)-এর চুক্তি অনুযায়ী বেসরকারি ওই প্রতিষ্ঠানটির গাছ কাটার বিষয়টি ফৌজদারি কোনো অপরাধ বলে বিবেচিত হয়নি। বরং সেখানকার রাষ্ট্রীয় অনেক আইনই ছিল বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী পরিবেশবাদীদের বিপক্ষে, যদিও অপরাধ বিজ্ঞানের অন্যতম একটি শাখা ‘গ্রীন ক্রিমিনোলজি’তে পরিবেশ বিধ্বংসকারী হিসেবে শেফিল্ড এবং এ্যামি ছিল প্রকৃত অপরাধী। ইংল্যান্ডের আইন অনুযায়ী গাছগুলো ছিল শহর কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকা ফুটপথের উপর। তাই তারা তাদের সম্পদ রক্ষার্থে যা খুশি তা-ই করতে পারে, এমন কথাই বলছে দেশটির আইন। শতবর্ষী গাছগুলো বাঁচানোর দাবিতে দুজন বিক্ষোভকারীকে তাই আটক করে পুলিশ। পেশায় শিক্ষক ওই দুজনকে অভিযুক্ত করা হয় ‘আইনসিদ্ধভাবে সরকারি কাজে বাঁধা’ দেওয়ার আইনি ধারায়। (দ্যা গার্ডিয়ান; ২৮.১১.২০১৬ ইং)। উপরের ঘটনাটি একথাই প্রমাণ করে যে, বুর্জোয়া রাষ্ট্রগুলোতে মানুষের কল্যাণের অজুহাতে অনেক আইনই রয়েছে যা প্রকৃত অর্থে পরিবেশের বিরুদ্ধে অবস্থান করছে। আর এই কারণেই সম্ভবত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধীদেরকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দেওয়া যায় এখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনকারীদেরকে চ্যাং-ধোলা করে পুলিশ। মাত্র সাড়ে ৪ কোটি টাকায় কক্সবাজারের মহেশখালীর (বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ বন) ১৯১ একর সংরক্ষিত বনভূমি কিনে নিতে চায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। সেখানে নির্মাণ করা হবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রাখার টার্মিনাল। বন উজাড় করে, গাছপালা কেটে একর পর এক স্থাপনা নির্মাণ করার কাহিনী এদেশে নতুন নয়। উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার নিরন্তর।

পরিবেশবিদ থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদরা পর্যন্ত বলেছেন, ‘দেশের উন্নয়ন সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার ফলে আমরা প্রকৃতিবিরোধী অবকাঠামো তৈরি করেছি। আর সে কারণেই প্রকৃতি এখন বাংলাদেশের প্রতি হয়ে উঠেছে চরম প্রতিশোধপরায়ন’। এই কথাটি উপরওয়ালাদের কেউ কখনো বুঝতে চান না, অথবা বুঝতে পারলেও গোষ্ঠী বিশেষের বিশেষ সুবিধার কারণেই একের পর এক গ্রহণ করা হয় পরিবেশ বিধ্বংসী নানা প্রকল্প। তাই বুঝি পরিবেশবিদ, পরিবেশবাদী, বিশেষজ্ঞ মহলসহ সচেতন সাধারণ মানুষের প্রবল আপত্তি প্রতিবাদ আর পরামর্শ উপেক্ষা করে উন্নয়নের নামে গাছ কেটেই যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের সম্প্রসারণের কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। এতে মহাসড়কটির দুই পাশের ২ হাজার ৩১২টি গাছ কাটা পরলেও আমাদের নীতি-নির্ধারকদের বুকে সামান্যতম কাঁপুনি ধরে না। বৃটেনের সেই শেফিল্ড কর্তৃপক্ষের মতোই যশোর জেলা পরিষদও বলছে, ‘মহাসড়কে গাছের অবস্থা ভালো নয়। গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে, মরে যাচ্ছে। মরা গাছ শরীরের ওপর পড়ে এলাকার অনেকেই আহত হয়েছেন। জনগণ ও উন্নয়নের স্বার্থে গাছ কাটা উচিত’।
যশোর রোডটি এশিয়ান হাইওয়ের অংশ। দিন দিন এর গুরুত্ব বাড়বে। তাই সরকারের জন্য এই সড়কের সম্প্রসারণের কাজ হাতে নেওয়া খুব স্বাভাবিক। কিন্তু প্রকৃতির ওপর আঘাত হেনে কেন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কের একপাশের গাছকে সড়ক বিভাজক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। অন্য পাশ দিয়ে তৈরি করতে হবে আলাদা একটি সড়ক। যা হবে সড়কটির আলাদা একটি লেন। এতে গাছও কাটা পড়বে না, আবার সড়কও প্রশস্ত হবে। অনেক উন্নতে দেশেই এমনটা হয়েছে। তাছাড়া যশোর রোডের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক বড় ইতিহাস, যার কালের স্বাক্ষী ওই গাছগুলো।

২০১৩ সালে ভারতের কর্ণাটকের তুমকুড়ে মহাসড়ক প্রশস্ত করার উদ্দেশ্যে ৪, ১৫৩টি গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার। সেখানকার উচ্চ আদালত সুয়োমটো দিয়ে বলেন, গাছ না কেটে মহাসড়কটি প্রশস্ত করার বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে হবে। প্রধান বিচারপতি ডি. এইচ বাঘেলা এবং বিচারপতি বি. ভি. নগরতেœর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সরকারের উদ্দেশ্যে দেওয়া রুলে মন্তব্য করেন, ‘পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ গ্রহণযোগ্য নয়’। সরকারের প্রতি তারা প্রশ্ন করেন, ‘শত বছরের পুরোনো অনেক গাছ হত্যা করে তার ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব’? যশোর রোডকে চার লেনে উন্নীত করতে গিয়ে সেখানকার শতবর্ষী গাছ কাটার ক্ষেত্রে আমাদের উচ্চ আদালতও ছয় মাসের জন্য স্থিতাবস্থার নির্দেশ দিয়েছেন, যার সময়সীমা প্রায় শেষের পথে। কিন্তু তারপর কী হবে, জানি না। আমাদের সরকারের হাত অসীম লম্বা যে!
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট /আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত