প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বাচনি প্রচারণায় মোদি, তিস্তায় মমতার অনীহা এবং ‘অরবিন্দ ভবন’ প্রত্যাশায় জট!

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে:  গত সপ্তাহে সাংস্কৃতিক সফরে শান্তিনিকেতনে ‘বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধন করতে যাওয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামগ্রিক সফর নিয়ে আনন্দবাজার প্রকাশনীর বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক যথাক্রমে আনন্দবাজার পত্রিকা ও দ্য টেলিগ্রাফে তীর্যক দৃষ্টিভঙ্গী প্রতিফলিত হলেও, তা ছিল অভিন্ন। এক কথায়, দুটো পত্রিকাই একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছে। আনন্দবাজার খোলাসাভাবেই লিখেছে, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারালে পশ্চিমে আর পূর্বের দুদিকেই পাকিস্তান নিয়ে ঘর করতে হবে ভারতকে’। এমন আশংকার কথা তুলে নাকি নির্বাচনি বছরে শেখ হাসিনা ‘তাই ভারতের সহযোগিতা’ চেয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে এ যেন সমীচীন হয়নি! সেজন্য যুক্তি হিসেবে ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার জনসভায় ইন্দিরা গান্ধীর উপস্থিতিতে কলকাতার জনসভায় সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ‘নিঃস্ব আমি, রিক্ত আমি। দেওয়ার কিছু নেই। শুধু বুক ভরা ভালবাসা জানাই ভারতের মানুষকে’ উদ্ধৃত করে আরও লিখেছে, ‘ছেচল্লিশ বছর পরে হাসিনার বার্তা, তাঁরা যা দিয়েছেন, ভারত এবার তার প্রতিদান দিক’।

সেই ‘প্রতিদান’ উল্লেখ করতে যেয়ে বলেছে, ‘তার সরকার উত্তর-পূর্বের জঙ্গিদের দেশছাড়া করেছে, ট্রানজিট দিয়েছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বরাবর দিল্লির পাশে থেকেছে’। কিন্তু সুকৌশলে লিখেনি, শান্তিনিকেতনে চরম হট্টগোলের মাঝে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনি প্রচার করতে কসুর করেননি। এছাড়া অনির্ধারিতভাবে ওই সফরের শেষবেলায় কলকাতার তাজ বেঙ্গল হোটেলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘বিশদ না জানানো’ বৈঠকের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রত্যাশায় জটবাঁধা ‘অরবিন্দ ভবন’ সম্পর্কে কলকাতার অপর দুই বাংলা দৈনিক ‘আজকাল’ ও ‘গণশক্তি’ ভিন্ন সচিত্র সংবাদ ছেপেছে।

২৬ মে প্রকাশিত আজকাল পত্রিকার দুটি শীর্ষ সংবাদ হচ্ছে: ‘হাসিনাকে পাল্টা সৌজন্য, মমতা এবার বঙ্গবন্ধু ভবন গড়তে চান’ ও ‘আচার্য কার্যত ভোট-প্রচারে’। প্রথমটিতে মমতা-হাসিনার ‘আত্মিক সম্পর্কের অবতারণা করে’ নিজস্ব প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছেÑ ‘‘শেখ হাসিনা এবং তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানার উপস্থিতিতেই শুক্রবার শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ঘোষণা করেন, নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুলের নামে বিমানবন্দর, কলকাতায় নজরুল তীর্থ, নজরুল অ্যাকাডেমির পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে বঙ্গবন্ধু ভবন তৈরি করতে চাই। পরে ভাষণের সময় শেখ হাসিনাও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কথা বলতে গিয়ে আপ্লুত। বলেই ফেললেন, এখানে মমতা আছেন। দু’দেশ এক হয়ে চলতে চাই”।

আর দ্বিতীয়টিতে শান্তিনিকেতন থেকে সব্যসাচী সরকার রচিত প্রতিবেদনের সূচনায় রয়েছে- ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে দেশ গড়ার ডাক দেওয়ার পাশাপাশি, তার সরকারের কৃতিত্বের কথাও সুকৌশলে জানিয়ে গেলেন নরেন্দ্র মোদি। বক্তব্যের মাঝে মাঝে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী, সংস্কৃতির মিশেল থাকলেও তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর সরকার কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে, সে বার্তাও দিলেন সমাবর্তনের মঞ্চ থেকে। আচার্য তথা প্রধানমন্ত্রী মোদি রবীন্দ্রনাথের ‘একলা চলো রে’ প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘গুরুদেব বলেছেন কেউ তোমার ডাকে না সাড়া দিলে একলা চলো। তবে আমি আপনাদের বলব, আপনারা এক পা এগোলে এই সরকার চার পা এগোবে। ভারতকে আরও ভাল করাই সরকারের লক্ষ্য’।

কিন্তু ওই একইদিনের এই ফিরিস্তির ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখিয়েছে গণশক্তি পত্রিকাটি। সেখানে শীর্ষ সংবাদ হিসেবে রয়েছে: শান্তিনিকেতন থেকে প্রসূন ভট্টাচার্য রচিত “কোণঠাসা রবিঠাকুর, বিশৃঙ্খলার সমাবর্তনে ‘মোদী মোদী’ ধ্বনি”। এতে অমিত করের তোলা শান্তিনিকেতনের আ¤্রকুঞ্জে বিশ্বভারতীর সমাবর্তন মঞ্চে উপবিষ্ট শেখ হাসিনা ওয়াজেদ, নরেন্দ্র মোদী, কেশরীনাথ ত্রিপাঠী, মমতা ব্যানার্জি এবং সবুজকলি সেনের ছবির নিচেই রয়েছে ‘খাওয়ার জল নেই, বসার জায়গাও অমিল। ছাত্রছাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করতেই রে রে করে তেড়ে এলেন বিশ্বভারতীর কর্মীদের তৃণমূল সংগঠনের নেতারা। চুলের মুঠি ধরে, ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হলো বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে’ এমন ক্যাপশন সংবলিত অপর একটি ছবি। আর প্রতিবেদনটির তৃতীয় ও চতুর্থ ছত্রে রয়েছে- ‘বিশ্বভারতীর সমাবর্তন অনুষ্ঠান নানা কারণে বৈশিষ্ঠ্যপূর্ণ। কেন্দ্রীয় এই বিশ্ববিদ্যালয়টির সমাবর্তন হয় অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মতো অডিটরিয়ামে নয়। আম্রকুঞ্জের খোলা মাঠে ছাত্রছাত্রী ও আশ্রমিকরা সমবেত হন এবং সেখানেই বেদগান, আশ্রমসঙ্গীত ইত্যাদির পরে ছাতিম পাতার সপ্তপর্ণী তুলে দেওয়া হয় সফল ছাত্রছাত্রীদের হাতে।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বহু প্রাক্তনীও আসেন। কিন্তু শুক্রবার সেই প্রথা এবং ঐতিহ্যম-িত সমাবর্তন উৎসব পরিণত হলো বিশৃঙ্খলা ও হট্টগোলের আসরে। ভারতের একমাত্র বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েরই আচার্য হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সমাবর্তনে আসেন বলে প্রতিবারই নিরাপত্তা নিয়ে কড়াকড়ি থাকে। এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। ফলে নিরাপত্তার কড়াকড়ি ছিল আরও বেশি। মেলার মাঠে পাঁচটি হেলিকপ্টারে নেমেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এই পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু দুই প্রধানমন্ত্রী যখন বিশ্বভারতীর আম্রকুঞ্জে এলেন, তখন সেখানে হইচই শুরু হয়ে গিয়েছে। এই প্রচ- গরমের মধ্যেও সমাবর্তনস্থলে কাউকে জলের বোতল নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আম্রকুঞ্জে প্রবেশের আগে সকলকে তল্লাশি করে পুলিশ জলের বোতলও ফেলে দিয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বভারতীর পক্ষ থেকে যে সামান্য কিছু পাউচের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তা অচিরেই শেষ হয়ে যায়। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী এবং আমন্ত্রিতদের সকাল নটার আগে আম্রকুঞ্জে প্রবেশ করতে বলা হয়েছিল। অনেকেই সকাল আটটা থেকে এসে বসেছিলেন।

৫ বছর পরে এবার সমাবর্তন অনুষ্ঠান হচ্ছে বলে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতির সংখ্যাও ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। দুই-তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরেও তাঁরা জল না পেয়ে চিৎকার করতে থাকেন। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বসার জায়গা না পেয়ে অনেকে ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে এলে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। মোবাইলে ছবি তোলার চেষ্টা, প্রবল ধাক্কাধাক্কি থেকে মারামারি পর্যন্ত বেঁধে যায়’। তবে সমাবর্তনের এই দৃশ্যপট তুলে ধরার পাশাপাশি গণশক্তি পত্রিকাটি পরদিন ২৭ মে ‘হাসিনা-মমতা বৈঠকের বিশদ জানানো হলো না’ নিজস্ব শীর্ষসংবাদে তিস্তার জলবণ্টনের মতোই ‘বঙ্গবন্ধু ভবন’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি আলো-আধারি প্রত্যাশার সংবাদ যুক্ত করেছে। এতে বলা হয়েছে, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘদিন শেক্সপিয়র সরণির অরবিন্দ ভবনে ছিলেন। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পরও এই অরবিন্দ ভবনে থেকে কিছু সরকারি কাজকর্ম হতো। ঐতিহ্যবাহী এই অরবিন্দ ভবনকে নিতে চায় বাংলাদেশ সরকার। কলকাতার অরবিন্দ ভবনের হস্তান্তর নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর কথা হয়েছে বলে জানা গেছে।

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘অরবিন্দ ভবনটি সরকারের অধীনে নেই। ওটা অরবিন্দ ট্রাস্টের সম্পত্তি। ওদের সঙ্গে কথা বলে যা করার দ্রুত করা হবে।’ এছাড়াও মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন,‘বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের নামে একটি মিউজিয়াম রাজ্য সরকার গড়ে তুলতে চায়।’ উল্লেখ্য, রাজ্য সরকার চাইলেও সহজে অরবিন্দ ভবনকে বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দিতে পারে না। ভবনটিকে ট্রাস্টের কাছ থেকে নিয়ে রাজ্য সরকারকে সেটা কেন্দ্রীয় সরকারকে দিতে হবে। এরপর ভারত সরকার আইনত অরবিন্দ ভবনকে হস্তান্তর করবে বাংলাদেশ সরকারের কাছে”। মন্তব্য নিস্প্রয়োজন! –  আমাদের নতুন সময়
ই-মেইল: নঁশযধৎর.ঃড়ৎড়হঃড়@মসধরষ.পড়স

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত