প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘আনিসুল হক আছিল বাপের বেটা’

নিজস্ব প্রতিবেদক : সাতরাস্তার ট্রাকস্ট্যান্ডটি আবার দখল হয়ে গেছে। সেখানে আবার আগের মতো এলোপাতাড়ি রাস্তা দখল করে জট পাকিয়ে থাকে ট্রাকগুলো। আশপাশের এলাকায় লেগে থাকে নিত্যদিনের যানজট। ট্রাকস্ট্যান্ডকে ঘিরে মাদকের আড্ডাও জমছে ফের। সন্ধ্যা হতেই লোক চলাচলে রীতিমতো অনিরাপদ হয়ে পড়ে পুরো এলাকা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র নির্বাচিত হয়েই আনিসুল হক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে সরিয়ে দিয়েছিলেন সাতরাস্তার সে ট্রাকস্ট্যান্ড। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এসেছিল স্বস্তি। কিন্তু মেয়রের মৃত্যুর কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার দখল হয়ে গেছে সাতরাস্তা থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত ব্যস্ততম সড়কটি। মেয়র আনিসুল হকের স্বপ্নের নগরীর প্রত্যয় যেন ভুলতে বসেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও। স্বপ্নের কারিগর মেয়র আনিসুল মারা গেছেন আজ ১৮০ দিন। অর্থাৎ ৬ মাস। এ ৬ মাসে আনিসুল হককে সত্যিই কি ভুলে গেছেন ঢাকা উত্তরের বাসিন্দারা? না, কেউ ভোলেননি।

তেজগাঁওয়ের বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ কর্মজীবী আয়াত উল্লাহ আনিসুল হকের কথা স্মরণ করে দিয়ে বলেন, ‘আনিসুল হক আছিল বাপের বেটা। কোনো নেতাই এত বছর ধরে সাতরাস্তার ট্রাক স্ট্যান্ড সরাইতে পারেনাই। পারবে কী করে, সবাই তো ট্রাকস্ট্যান্ডরে ঘিইরা যে ব্যবসা হইতো তার ভাগ পাইতো। কিন্তু আনিসুল হক সেই ভাগের ধার ধারছে? ধারেনি। তাই স্ট্যান্ড সরাইতে পারছিল।’ পরক্ষণেই তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘কই, এহন আনিস সাবও নাই, ট্রাকস্ট্যান্ডও ফিইরা আসছে আগের মতো। এইগুলো দেখবে কে?’

আনিসুল হক ডিএনসিসির বাসিন্দাদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, জনবান্ধব তিলোত্তমা নগরীর। সে নগরী গড়ে তোলার জন্য নাগরিকদের প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও সাহসও জুগিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আনিসুল হকের তিলোত্তমা ঢাকা গড়ার স্বপ্ন আর সমাধান যাত্রা শুরুর পথেই থমকে গেছে। মেয়রের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ঘটে গেছে স্বপ্নের উলট-পালট।

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল নাগরিকদের ভোটে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন আনিসুল হক। স্বপ্ন, সাহস, অন্য নেতৃত্বগুণ ও আকর্ষণীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে অল্প দিনেই রাজধানীবাসীর মন জয় করেছিলেন আনিসুল হক। নাগরিক সমস্যার সমাধান যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। শুরু করেছিলেন ঢাকাকে জনবান্ধব নগরে পরিণত করার কাজ। তার সামনে এসেছে একের পর এক চ্যালেঞ্জ। সব চ্যালেঞ্জই তিনি সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করছিলেন। শুধু সাতরাস্তার ট্রাকস্ট্যান্ডই নয়, রাজধানীর যানজটের অন্যতম উৎসস্থল শ্যামলী থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত দীর্ঘ রাস্তা রাতারাতি পার্কিংমুক্ত ঘোষণা করে ছিলেন মেয়র আনিসুল হক। এ পর থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল সেখানকার যানজট। কিন্তু সে যানজটমুক্ত শ্যামলী-গাবতলী-আমিনবাজার এখন আর নেই।

আনিসুলের স্বপ্ন ছিল, রাজধানী ঢাকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে নাগরিকবান্ধব অভিন্ন গণপরিবহন ব্যবস্থার আওতায় আনা। নুরুল কবীর খোকন নামের রামপুরার এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আনিসুল হক রাজধানী ঢাকায় এক যুগান্তকারী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কয়েকটি নির্ধারিত কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে রাজধানীতে নামাতে চেয়েছিলেন ৪ হাজার বাস। সার্বক্ষণিক এ বাস সার্ভিসের মাধ্যমে নাগরিকরা নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে পারতেন।’

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ‘গ্রিন ঢাকা’ নামের একটি এসি বাস সার্ভিস চালু হয়েছে আব্দুল্লাহপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত। শুনেছি সীমিত বাস নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু হয়েছে। এরকম ঢাকার অভ্যন্তরে আরও কয়েকটি বাস সার্ভিস চালুর স্বপ্ন ছিল প্রয়াত মেয়রের। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে সুলভ ও সাশ্রয়ী মূল্য করে নিরাপদে নাগরিকদের যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন তিনি।’

নগরীর অভ্যন্তরে অবস্থিত সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, গাবতলীর মতো বড় বড় বাস টার্মিনালগুলো নগরীর বাইরে স্থাপনের পরিকল্পনাও করেছিলেন আনিসুল হক। যাতে নাগরিকরা যানজটের যন্ত্রণা থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে পারেন। এমনকি রাজধানীর সবচেয়ে বড় কারওয়ান বাজার কাঁচাবাজারও স্থানান্তর করে নগরীর বাইরে স্থাপন করার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সেসব পরিকল্পনার একটিতে হাতও দিতে পারেননি তিনি।

একটি স্বাস্থ্যকর নগরী গড়ার পরিকল্পনা হিসেবে সাধারণ যান চলাচলের পাশাপাশি অযান্ত্রিক সাইকেল চলাচলের জন্য আলাদা লেনের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন আনিসুল। নগরীর তরুণদের নিয়ে সাইকেল র‌্যালি করে উৎসাহ জুগিয়েছেন নগরবাসীকে।

মানুষ যেন রাজধানীর ঢাকার উন্মুক্ত খোলা আকাশ দেখতে পারে, আর নগরীর শিশুরা যেন মাটি ও আকাশের সঙ্গে গড়ে তুলতে পারে নিবিড় সম্পর্ক-সে জন্য ডিএনসিসি এলাকা থেকে ২২ হাজার বিলবোর্ড অপসারণ করেছিলেন মেয়র আনিসুল।

প্রিয় নগরকে সবুজ নগরে পরিণত করতে তিনি সবুজ ঢাকা কর্মসূচি নিয়েছিলেন। সরকারি-বেসরকারি ভবন ও বাড়ির ছাদ, কার্নিশে ব্যাপকভাবে বাগান সৃষ্টি করে সবুজায়নের কর্মসূচি নিয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, রাজধানীর ফুট ওভারব্রিজগুলোও সাজিয়ে তুলেছিলেন সবুজের বাগান সৃজন করে। তারই পরিকল্পনা ও উদ্যোগে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নির্মিত হয় আধুনিক গণশৌচাগার।

রাজধানীর উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আরমান বলেন, কোনো দুর্বৃত্তকে ভয় পেতেন না মেয়র আনিসুল হক। কূটনীতিকপাড়ায়ও অভিযান চালিয়ে তিনি দূতাবাসগুলোর অবৈধ দখল উচ্ছেদ করেছেন। কুখ্যাত স্বাধীনতাবিরোধী মোনায়েম খাঁর পরিবার বনানীতে যে বিশাল জমি অবৈধ দখলে রেখেছিল সেটাও উদ্ধার করেছিলেন তিনি। এর আগে ওই বাড়ি কেউ উদ্ধারই করতে সাহস করেনি। অথচ তিনি করেছিলেন। কারণ, তিনি নগরবাসীর জন্য ভাবতেন। কোনো রক্তচক্ষুকে ভয় পেতেন না।

২০১৬ সালে বনানীর ২৭ নম্বর সড়কে আব্দুল মোনায়েম খাঁর পরিবারের দখলে থাকা ১০ কাঠা জমিতে থাকা অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ডিএনসিসি। মেয়র আনিসুল হক নিজেই ওই অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে জামিটি ডিসিসির বেদখলে ছিল। এ ছাড়া আমিনবাজারে অবৈধ দখলে থাকা সিটি করপোরেশনের ৫২ একর জমিও উদ্ধার করেছিলেন তিনি।

নগরীর উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার দিকেই মূলত, সবচেয়ে বেশি নজর দিয়েছিলেন আনিসুল হক। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পনা দিয়ে সাজাতে শুরু করেছিলেন পুরো ঢাকাকে। দায়িত্ব পালনের দ্বিতীয় বছরের মধ্যেই নগরের প্রায় সবখানে ডাস্টবিন ও সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের কাজ শেষ করেন তিনি। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নগরের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থারও ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে তার সময়ে। নাগরিকদের নিরাপত্তায় তার অসাধারণ উদ্যোগ ছিল যা দারুণ প্রসংশনীয় হয়। ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকা তিনি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এনেছিলেন। নগরীর স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে তিনি নিবন্ধিত রিকশা ও বাস সার্ভিস চালু করেন।

ফুটপাত দখলমুক্ত করা, রাস্তাঘাট সংস্কার ও নির্মাণের পাশাপাশি আধুনিক ও সবুজ ঢাকার ধারণা তুলে ধরেন নগরবাসীর কাছে। গুলশানে আলোচিত ‘ঢাকা চাকা’ বাস সার্ভিসের উদ্যোগ নিয়েছিলেন মেয়র আনিসুল হকই। নাগরিকদের হাতের নাগলে ডিএনসিসি ও তার সেবা পৌঁছানোর জন্য তার স্মার্টফোন অ্যাপভিত্তিক সেবা কার্যক্রম ছিল যুগান্তকারী। এভাবেই তিনি সাধারণ নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এভাবেই তিনি হৃদয়ের মণিকোঠায় ঠাঁই নিয়েছিলেন নগরবাসীর। বিশেষ করে তরুণদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘স্বপ্নের দিশারি’।

কিন্তু স্বপ্নবাজ মেয়র আনিসুল হক যেসব জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার অধিকাংশই এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। দখল হয়ে গেছে রাজধানী উত্তরের অধিকাংশ ফুটপাত। আবার ফিরেছে বড় বড় বিলবোর্ড। সাতরাস্তা ট্রাকস্ট্যান্ড তো আগেই দখল হয়ে গেছে। শ্যামলী-গাবতলীর রাস্তায় আবার নিত্যকার যানজট লেগে থাকে। কঠোর হাতে এসব দুর্বৃত্তায়ন বন্ধের কেউ নেই।

আনিসুল হক মারা যাওয়ার তিন মাসের মধ্যে ডিএনসিসির নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন তফসিলও ঘোষণা করেছিল। কিন্তু একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সে নির্বাচনে স্থগিতাদেশ দেন আদালত। কবে ডিএসসিসিতে একজন নির্বাচিত মেয়র আসবেন, আনিসুল হকের স্বপ্নের নগরকে গড়ে তোলার দায়িত্ব নেবেন তার দিকে তাকিয়ে আছেন নগরবাসী।

প্রসঙ্গত, গত ৩০ নভেম্বর লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতালে মারা যান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। ১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সূত্র : পরিবর্তন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত