প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপির সংকট কতটা গভীর এবং কোথায় মুক্তি?

অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার: দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার জেল রাজনৈতিক। সরকারের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে বিচার বিভাগ বিচারিক সিন্ধান্ত দেওয়ার পারিপার্শ্বিক অবস্থান কোথায়? রাজনৈতিক জেল রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার একমাত্র নির্ভরযোগ্য স্থান আদালত নয়, রাজপথ। রাজপথে থাকতে গিয়ে বিএনপিকে অনেক মাশুল দিতে হয়েছে বটে, কিন্তু রাজপথেই যাদের জীবনমরণ তাদের কি দল যথাযথভাবে সঠিক স্থানে অবস্থান দিয়েছে? এ বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে যাদের হাতে দলের দন্ডমুন্ড তাদের। জেলাভিত্তিক কমিটি কোথাও আছে, কোথাও দ্বন্দ্বে কোন্দলে দিন কাটাচ্ছে, কোথাও নিষ্ক্রিয়, তবে মেক্সিমাম জেলায় বিএনপি কমিটি গঠিত হয়েছে সাংগঠনিক পদ্ধতিতে নয় বরং তদবিরভিত্তিক। এ বিষয়গুলো সমাধান করাও কোনো কঠিন বিষয় নয়, যদি ওপর ওয়ালাদের সদিচ্ছা থাকে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের মুুক্তির আইনি লড়াইয়ে নিযুক্ত আইনজীবীরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে এবং নিযুক্ত আইনজীবীরা দেশের সেরা আইনজীবী। পেশার পাল্লায় ওজন করলে জ্ঞান ও আইন পেশার পারদর্শীতে তারা আন্তর্জাতিক মানের। ফলে মামলা পরিচালনায় কোনো ত্রুটি বিচ্যুতি নেই এ কথা জোড় দিয়েই বলা যায়। দেশব্যাপী জাতীয়তাবাদী সকল আইনজীবীই বিএনপি চেয়ারপার্সনের জামিনের জন্য উৎগ্রীব এবং তারা এটাকে প্রেসটিজ ইস্যু মনে করছেন, এ মর্মে তাদের আবেগ উৎকন্ঠায় অভাব নেই। তারপরও এত বড় শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী সমাজ সাংগঠনিকভাবে কি কোনো ভূমিকা রাখতে পেরেছে? এর কারণ কী? (একটু গভীরে যাওয়া দরকার, অবশ্য গভীরে যাওয়ার ফুসরৎ (সময়) আমাদের কারও নেই, বড় বড় নেতাদের থাকবে কি করে?)

অ্যাডভোকেট শামছুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ এরশাদবিরোধী আন্দোলন সাংগঠনিকভাবে দেশব্যাপী আইনজীবীদের যেভাবে উজ্জীবিত করেছিল বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিরুদ্ধে এ রূপ অমানবিক আচরনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী শক্তি সাংগঠনিকভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা কি রাখতে পেরেছে? কেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের সাংগঠনিক শক্তি মজবুত হয়নি? এ জন্য কি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একটুও দায়ী নন? এক সময় বিএনপিন্থী সিনিয়র আইনজীবীদের প্রচেষ্টায় জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের একটি প্লাটফর্ম গঠিত হয়েছিল যার নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি টি.এইচ. খাঁনসহ স্বনামধন্য দেশবরণ্য আইনজীবী বৃন্দ। এখন সে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সাংগঠনিক শ্রী হারিয়ে ২ নেতার কব্জায় বন্দি হয়ে আছে প্রায় ১০ বছর যাবৎ। তারা ছাড়া জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামে অন্য কারও কোনো পদ-পদবি নেই। মে ২০১৮ তারিখের বার কাউন্সিলের নির্বাচনের বিএনপিপন্থীদের ভরাডুবির কারণ ব্যাখ্যা করে এক নেতা যখন সাংবাদিক সম্মেলন (যদিও মায়া কান্না) করছিলেন ঠিক ওই মুহূর্তে আরেক নেতা সরকারি দলীয় যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাদেরকে ফুল দিয়ে সংবর্ধনা জানানোর ছবি ভাইরাল করছেন, ওই সময় তিনি হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে, ক্ষমতাসীনদের হাতে তার নেত্রী কারাবন্দী। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম কাজীর গোয়ালের মতো, গাভী কিতাবে আছে গোয়ালে নেই। তাদের সাংগঠনিক প্লাটফর্ম অস্তিত্বহীন, এটাই বার কাউন্সিল নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী শক্তির পরাজয়ের অন্যতম কারণ।
এবারও যদি সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে সরকারের এক তরফা জাতীয় নির্বাচন ঠেকানো না যায় তবে জাতির জন্য হবে অশনি সংকেত। এখন তো সরকার বিরোধীরা গুম, খুন, পলাতক ও কারাবন্দী রয়েছে। খোদা না করুন এমন দিন তো আসতে পারে যে দিন সরকার বিরোধীদের এ দেশে থাকা নিষিদ্ধ করা হতে পারে। সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী (স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর মতিয়া চৌধুরী সংসদে দাঁড়িয়ে দৃঢ়তার সাথে যখন বলেন, রাজাকারদের সন্তানদের তারা চাকরি দেবেন না। তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে যদি আমরা গভীরে যাই তবে একথাও পরিষ্কার যে সরকার অর্ধশতাব্দী পরেও জাতিকে দ্বিখন্ডিত ভাবেই তারা চিন্তা করছেন)। মতিয়া চৌধুরী, হাসানুল হক ইনু প্রভৃতি মন্ত্রীরা এক সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্পর্কেও অশালীন কথা বলেছেন। আজ প্রধানমন্ত্রী তাদের সাথে হাত মিলিয়েছেন শুধু মাত্র বিএনপিকে কোনঠাসা করার জন্য। তারাও (বামপন্থী) বুক ফুলিয়ে স্পষ্টই বলেদিয়েছেন যে, তাদের ছাড়া আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে পারবে না। অনুরূপ মন্তব্য এরশাদও করছেন যাকে এক সময় শেখ হাসিনা মহাচোর বলতেন। এখন টাই পরিষ্কার যে, মহাচোর ও পিতার কুৎসাকারীদের ( ১৯৭২-৭৫ পর্যন্ত) সাথে প্রধানমন্ত্রীর হাত মিলাতে বাধা নেই শুধু বিএনপিকে ধ্বংস করার জন্য।

বিএনপি ইতোপূর্বে এমন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেনি যা এখন করছে। দলের সকল স্তরের দায়িত্ব প্রাপ্তদের জবাবদিহিতায় আনা যায়নি, অন্যদিকে কর্মের পুরষ্কার বা তিরষ্কারের প্রচলন না থাকার বিষয়টি অনেকাংশে দায়ী। এ কান্তিকাল থেকে উত্তোরণের একমাত্র অবলম্বন রাজপথ। ঐতিহাসিক ‘রাজপথই’ নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে সরকারকে বাধ্য করবে। এ রাজপথই দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি এনে দেবে। অন্যথায় কেউ যদি খালেদা জিয়াবিহীন (মাইনাস) নির্বাচনের কথা চিন্তা করেন বা নতুন করে সংস্কারবাদী গ্রুপ সৃষ্টি হয় তা হবে গুড়ে বালি, কারণ বিষয়টি বিশ্বাস ঘাতকেরা মেনে নিতে পারে, কিন্তু তৃণমূল মেনে নেবে না। এমতাবস্থায় নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার। শুধু জামিন নয়, সাজা মুক্ত খালেদা জিয়া চাই, নির্বাচন হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে, নেতৃত্ব দেবেন খালেদা জিয়া এটাই তৃণমূলের কামনা-বাসনা। পুনরায় এ জন্য রাজপথই একমাত্র অবলম্বন এবং এ জন্য স্বেচ্ছায় কারাবরণের জোড়াল সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া এ ক্রান্তিকাল অতিক্রমের বিকল্প কোনো রাস্তা নেই। বিষয়গুলো বিএনপিকে আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। কর্মীদের মুক্তচিন্তার সুযোগ দিতে হবে এবং তদবির নয় সাংগঠনিক পদ্ধতিতে দলকে আরও গতিশীল করতে হবে। মনে রাখতে হবে তদবিরে সরকার চলতে পারে কিন্তু রাজনৈতিক দল গতিশীল হয়নি। প্রকৃত জাতীয়তাবাদী শক্তির একটি তালিকা দলের নিকট আছে বলে মনে হয় না।
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত