প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাকুর শব্দে মুখর গ্রাম

ডেস্ক রিপোর্ট : টাঙ্গাইল শহরের বারো কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বল্লা ইউনিয়ন। বৈরি আবহাওয়া উপেক্ষা করে এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোরিকশায় বল্লা যাওয়ার পথেই চোখে পড়ল গ্রামবাংলার সেই অপরূপ চিত্র। বিলবোর্ডে লেখা- ‘নদী-চর-খাল-বিল গজারির বন, টাঙ্গাইল শাড়ি তার গর্বের ধন’। এটি মূলত টাঙ্গাইল জেলার স্লোগান। এরপর বল্লার কাছে যেতেই শোনা যায় তাঁতের মাকুর খটখট শব্দ। পথে যেতে যেতে দেখা মিলল, প্রায় বাড়ির উঠোনজুড়ে রোদে রঙিন সুতা শুকানোর দৃশ্য। জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত থাকায় এখানে ঘরে ঘরে তৈরি হয় তাঁতের শাড়ি। সারাবছরই এখানে শাড়ির বাজার জমজমাট থাকে। রমজান মাস এলে তা আরও সরগরম হয়ে ওঠে। ঈদ যত এগিয়ে আসছে, বল্লায় পাইকারি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি খুচরা ক্রেতাদের আনাগোনা ততই বাড়ছে। ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ির সূতিকাগার এই বল্লা।

এর পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন রায়পুর, কোকডহড়া, কাজিবাড়ী, খুসিল্লা, মোমিনগর, উত্তর ছাতিহাটি, দক্ষিণ ছাতিহাটি, পশ্চিম ছাতিহাটি, সিঙ্গাইর, দত্তগ্রাম, টেঙ্গুরা, গোহালিয়াবাড়ী, নাগবাড়ী, বীরবাসিন্দা ও সহদেবপুরের প্রায় দেড় হাজারেরও অধিক তাঁতি শাড়ি উৎপাদন করেন। দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইলের কাপড় ব্যবসায়ীরা এসব গ্রাম থেকেই নামমাত্র মূল্যে শাড়ি কেনেন। পরে তা পাথরাইল হাট, করটিয়া হাট, বাবুর হাট এবং বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব স্টেশন সংলগ্ন জুগাচর হাটে পাইকারি মূল্যে বিক্রি করেন।

বৃহস্পতিবার কোকডহরা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এখানকার প্রায় ১০০ পরিবার তাঁতের সঙ্গে জড়িত। প্রতিটি বাড়ির লোকজন ঈদ সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের বাজারের চাহিদা মেটাতে এখন মহাব্যস্ত। শাড়ি বোনেন পুরুষরা, চরকায় সূতা কেটে সহায়তা করেন নারীরা। এ অঞ্চলের শাড়ি বোনার তাঁত কয়েক রকমের রয়েছে। তার মধ্যে চিত্তরঞ্জন, পিটলুম, অটোমেটিক, সেমি অটোমেটিক তাঁত উল্লেখযোগ্য। এসব তাঁতে তৈরি হয় নানা রঙ ও ডিজাইনের নানা নামের শাড়ি।

কোকডহরা গ্রামে বাবা সূর্যত আলীর হাত ধরে ২০ বছর আগে তাঁতের বুনন শুরু করেন মোহাম্মদ সাইফুল। তার কথামতে, শাড়ির নিজের কিছু ইতিহাস আছে। বিশেষ ধরনের বুননের সঙ্গে তাঁতের শাড়ি যারা পরেন, তাদের শিল্পবোধ ও প্রয়োজনের সম্মিলন জড়িত। তিনি সমকালকে বলেন, এ অঞ্চলের প্রায় পরিবারের জীবন-জীবিকা চলে তাঁতের শাড়ি বুনে। ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি চলে বুনন কাজ। মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকা লাভেই আড়তদারদের কাছে শাড়ি বিক্রি করেন তারা। সাইফুল জানান, তার তত্ত্বাবধানে ১১ জন কারিগর কাজ করেন। প্রতিদিন একজন কারিগর ছয়টি শাড়ি বোনেন। প্রতি সপ্তাহে দুই হাজার ৫০০ শাড়ি উৎপাদন হয়। ডিজাইন অনুযায়ী প্রতি পিস শাড়ির মূল্য ৩৩০ থেকে ৪০০ টাকা।

পাইকারি ব্যবসায়ীর সমাগম ঢাকা থেকে আসা শাড়িঘরের মালিক মো. মনতাজ উদ্দীন বলেন, রোজার শুরুতে এসে যে চালান নিয়ে যাই, তা শেষ হয়ে গেছে। মাঝে ফোনে চাহিদা জানিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে শাড়ি নিয়েছি। কিন্তু এবার টাঙ্গাইল শাড়ির চাহিদা বেশি। তাই নতুন ধরনের শাড়ি নিতে নিজেই চলে এসেছি। বল্লা বাজারের বেশ কয়েকজন তাঁতি জানান, তাদের কারও এখন দম ফেলার সময় নেই। ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুয়ায়ী এখন অতিরিক্ত সময় ধরেও বুনন করতে হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা ফোনেও চাহিদা জানাচ্ছেন। সে অনুযায়ী কুরিয়ার সার্ভিসে শাড়ি পাঠানো হচ্ছে। বাজারের ফারুক ট্রেডার্সের মালিক মো. ফারুক বলেন, রোজার মাস তিনেক আগে থেকেই শুরু হয় ঈদ বাজারের প্রস্তুতি। নতুন নতুন নকশা তৈরি করে শাড়ি বুনন শুরু হয়। শাড়ি কিনতে রোজা শুরুর ১০-১৫ দিন আগে থেকেই পাইকারি ব্যবসায়ীদের আসা শুরু হয়েছে। চলে ঈদের কয়েক দিন আগ পর্যন্ত। আর খুচরা ক্রেতাদের আসা শুরু হয় ১৫ রোজার পর থেকে।

কালীহাতি উপজেলায় অবস্থিত বল্লা তাঁত বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, তাঁত (হ্যান্ডলুম) সংখ্যা ৪১ হাজার ৭১টি। আর পাওয়ার লুম প্রায় ১০ হাজার। এখানে প্রতি মাসে বস্ত্র উৎপাদন হয় প্রায় ৭২ লাখ গজ। প্রতি মাসে বিক্রি হচ্ছে অন্তত ২৭ কোটি টাকা। সুতা ও রং আমদানি হচ্ছে প্রায় ২৫ কোটি টাকার।

তাঁতের শাড়ি ঘিরে এ অঞ্চলে রঙ এবং সুতা ব্যবসাও জমে উঠেছে বহু বছর ধরে। এখানকার ব্যবসায়ীরা জানান, স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে বল্লায় তৈরি সাধারণ মানের তাঁতের শাড়ি এখন ‘বিখ্যাত টাঙ্গাইল শাড়ি’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। তাঁতশিল্পীদের নিপুণ হাতে বুনন করা এ শাড়িই আজ দক্ষিণ এশিয়ার সীমানা পেরিয়ে ইউরোপ-আমেরিকা জয় করেছে।

বল্লা বাজার সুতা ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি আবু আইয়ুব জানান, বল্লা বাজারে প্রায় ৫০টি সুতার দোকান রয়েছে। তবে এ বাজারে তাঁতিদের কোনো শো-রুম নেই। ব্যবসায়ীরা সরাসরি এখানকার তাঁতিদের কাছ থেকে শাড়ি কিনে নেন। পরে পাথরাইল হয়ে অন্যান্য হাটে ওই শাড়িই পাইকারি দরে বিক্রি করেন। অর্থাৎ টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির ৯০ ভাগই উৎপাদন হয় বল্লা, রামপুরসহ আশপাশের গ্রামে।

বাজারের সুতা ব্যবসায়ী আসিফ ট্রেডার্সের আসিফুর রহমান মিথুন সমকালকে বলেন, সপ্তাহে পাঁচ রিল সুতা বিক্রি হয়। বাজারে হ্যান্ডলুম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁতগুলো খড়ির দামে বিক্রি হচ্ছে। এরই মধ্যে ২৫ হাজার বন্ধ হয়ে গেছে। ২০ হাজারের মতো মেশিন দিয়ে এখন বুনন চলছে।

বল্লার ঐতিহ্যবাহী শনিবারের হাট

এখানকার শাড়ি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি দামেও কম। এটিই এ হাটের আকর্ষণ। এখানে ৩৫০ থেকে ৮০০ টাকায় ভালো শাড়ি পাওয়া যায়। এ ছাড়া পাওয়া যায় মোটা সুতার জাকাতের শাড়ি। এ শাড়িগুলো যে বিশেষ ধরনের তাঁতে তৈরি হয়, তার নাম চিত্তরঞ্জন তাঁত। চিত্তরঞ্জন তাঁতকে সেমিঅটোমেটিক তাঁতও বলা হয়। প্রতি শনিবার সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত চলে বল্লার এ ঐতিহ্যবাহী হাট।

বল্লা কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে ট্রেনে গেলে যমুনা সেতু পূর্ব স্টেশন থেকে সিএনজি অটোরিকশায় টাঙ্গাইল স্টেশন পর্যন্ত ভাড়া প্রতিজন ৫০ টাকা। বাসস্ট্যান্ড থেকে বল্লা যেতে হবে সিএনজি অটোরিকশায়। ভাড়া প্রতিজন ৩৫ টাকা। তাছাড়া রেলস্টেশন থেকে বল্লা যাওয়ার রিজার্ভ ভাড়া হলো ২৫০ টাকা। সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত