প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সর্বরোগহারী ওষুধ, গোপন রোগ এবং ক্রসফায়ার

কাকন রেজা : রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে ভার্চুয়াল জগত সবখানেই মাঝেমধ্যে কিছু বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। সর্বরোগহারী ওষুধের বিজ্ঞাপন। এক ওষুধেই সব রোগ খতম। ক্যান্সার থেকে চুলকানি পর্যন্ত। চিকিৎসা বিজ্ঞান এ ধরণের ওষুধে বিশ্বাস না করলেও, সাথে আইন এ ধরণের বিজ্ঞাপনকে প্রতারণা হিসাবে আখ্যা দিলেও, বিজ্ঞাপন কিন্তু বন্ধ হয় না। মজার বিষয় হলো এসব ওষুধের ক্রেতাও রয়েছে। বিজ্ঞাপন দেখে তারা ঠিকই যোগাযোগ করেন, ওষুধ সংগ্রহ করেন এবং সেবন করেন। বলতে পারেন, হঠাৎ করেই ওষুধ নিয়ে পড়লাম কেন। ওষুধ হলো অসুস্থতার নিরাময়। কেবলমাত্র শারীরিক নয়, সকল অসুস্থতায় ওষুধ হলো বেঁচে থাকার আশা এবং প্রচেষ্টা।

আমাদের সমাজও নানা অসুখে আক্রান্ত। গত এক দশকে সামাজিক অসুস্থটা ঠেকেছে অসহনীয় পর্যায়ে। আর এই সময়কালীন মূল সংক্রমণটা শুরু হয়েছে অনুল্লেখ্য জায়গা থেকে। উৎস অজানা থাকা বা অস্বীকার করার কারণে সামাজিক অসুখের নিরাময় সম্ভব হয়ে উঠেনি, উঠছে না। অবস্থা এমন চরমে পৌঁছেছে যে, ক্ষতিকর জেনেও সর্বরোগহরকরা ওষুধের উপরই ভরসা করতে হচ্ছে। সামাজিক রোগে এখন সর্বরোগহারী হিসাবে আবিভর্‚ত হয়েছে ‘ক্রসফায়ার’ নামক ওষুধ। আইন এটাকে স্বীকার করে না, মানবতা এটাকে বিকার মনে করে। কিন্তু তারপরেও ‘ক্রসফায়ার’ চলছে। সেই সর্বরোগহারী ওষুধের মতন এক শ্রেণির লোক এটাকে খাচ্ছেও। দেখবেন ‘গণ’ থেকে শুরু করে ‘সামাজিকমাধ্যমে’ এই শ্রেণির লোকের এ নিয়ে উৎসাহের কমতি নেই। মৃত্যু যেন তাদের কাছে একটা উৎসব। অথচ এনাদের যদি প্রশ্ন করা হয়, অপরাধ দমন না করে, অপরাধী প্রমাণ না করে এ হত্যাযজ্ঞের সার্থকতা কোথায়- উত্তরে পাওয়া যাবে আবেগ নির্ভর কিছু বাক্যরাজি, কোনো ক্ষেত্রে বকাবাজিও! অথচ উৎস বন্ধ না করে চলার পথে বাঁধ দিয়ে আর যাই হোক ধ্বংস ঠেকানো যায় না।

একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ, সর্বোপরি রাষ্ট্র যদি ফেল করে যায় তাহলে হয়তো ক্ষতিকর জেনেও এমন প্রতিকার মেনে নেওয়া যায়। যেমন, মৃত্যু ঝুঁকি সত্তে¡ও ক্যান্সার রোগীদের কেথোথেরাপি দেওয়া হয়। মৃত্যু নিশ্চিত জেনে শেষ চেষ্টা হিসাবে রোগীও তা মেনে নেয়। প্রশ্ন হলো, যারা ‘ক্রসফায়ার’কে সমর্থন করেন তারা কী বলবেন, মৃত্যু নিশ্চিত! আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতরা, আইনি প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ সর্বোপরি রাষ্ট্র কী ফেইল করে গেছে? না হলে নিরাময়ের সর্বশেষ এমন প্রচেষ্টা কী কারণে!

অনৈতিক সত্তে¡ যৌন রোগের ক্ষেত্রে দেওয়া বিজ্ঞাপনের ভাষা হয় অত্যন্ত আপত্তিকর, অশ্লীল। রাস্তায় চলতে বিব্রতকর এমন লিফলেট হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়, মধ্যরাতে কোনো কোনো টিভি চ্যানেলও এমন অশ্লীল বিজ্ঞাপন প্রচার করে। যারা করেন তারাও জানেন এটা অনৈতিক। কিন্তু তারপরেও করেন এবং রোগীও পান। আক্রান্ত অনেকে লুকিয়ে-চুরিয়ে এসব বিজ্ঞাপনে দেওয়া ঠিকানায় যোগাযোগ করেন। মুখ ঢেকে যান এসব কথিত চিকিৎসকদের কাছে, যাতে কেউ জানতে না পারে, সামাজিকভাবে লজ্জা পেতে না হয়। আমাদের সমাজও কী এমন গোপন রোগে আক্রান্ত, যার কথা লজ্জায় জানানো যাচ্ছে না! কী-ভাবে আক্রান্ত হলো সেটাও বলা যাচ্ছে না! আর সে কারণেই লুকিয়ে-চুরিয়ে সর্বরোগহরকরা ওষুধের স্মরণাপন্ন হওয়া! অবস্থা কী এতটাই মরণাপন্ন?

আমাদের সকল প্রতিষ্ঠান সক্ষম, যোগ্য লোক রয়েছে সেখানে। সব পরিস্থিতি, সকল সামাজিক অসুস্থতার নিরাময় স্বাভাবিক পন্থাতেই করার সামর্থ্য রয়েছে তাদের। সশস্ত্র সংগ্রামে অর্জিত একটি রাষ্ট্রের ফেইল করে যাওয়াটাও অত সহজ নয়। কিন্তু তারপরেও ‘এক্সট্রিম’ হওয়া কেন? কিছু প্রশ্ন আছে, যার উত্তর জানা, তবুও তা উত্তরহীন। অবস্থা দাঁড়িয়েছে ‘পেটে আছে কিন্তু মুখে আসে না’ এমনটা। পেটের কথা মুখে না আসার কারণের মধ্যেই রয়েছে সমূহ সকল প্রশ্নের উত্তর। অনুল্লেখতার মধ্যেই রয়ে গেছে সঠিক রোগের উপযুক্ত ব্যবস্থাপত্র।

ফুটনোট : ‘ক্রসফায়ার’ বলাতে অনেকের আপত্তি। অধুনা শুরু হয়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শব্দটির ব্যবহার, যার ইংরেজি হলো ‘গানফাইট’। ‘ক্রসফায়ারে’র বাংলা হলো ‘গুলিবিনিময়’। ‘গানফাইটে’র ‘ফায়ার’ তো ‘ক্রস’ই হয়, যেহেতু সেখানে দুটি পক্ষ থাকে। আর সে দুই পক্ষের ‘গুলিবিনিময়ে’ মারা যায় কোন পক্ষ বা উভয়পক্ষের কেউ। তবে সা¤প্রতিক ‘গানফাইট’ মনে হয় ‘ক্রস’ হয় না। যদি হতো তবে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটিকে প্রতিস্থাপনের এত জোর চেষ্টা চলছে কেন?

অপ্রাসঙ্গিক আরেকটা কথা, জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশের যারা আছেন তারা কিন্তু প্রশংসিত। প্রশংসিত ধৈর্য্য আর সহিষ্ণুতায়, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যতায়। প্রচলিত আছে, ‘এক্সট্রিমিস্টরা’ও সেখানে বাংলাদেশিদের প্রতি অনুরক্ত, তাদের কথা শোনে। প্রতিপক্ষের প্রশংসা বা অনুরক্তি পাওয়া কম কথা নয়।

লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত