প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অভিযানে ভেজাল

প্রভাষ আমিন: দেশে এখন দুটি অভিযান চলছে; একটি মাদকের বিরুদ্ধে, একটি ভেজালের বিরুদ্ধে। দুটি অভিযানেরই সাফল্য দরকার। মাদক ধ্বংস করে দেয় আমাদের তরুণ প্রজন্ম, আর ভেজাল ধ্বংস করে দিচ্ছে গোটা জাতিকে। ভেজাল খেয়ে খেয়ে আমাদের অসুখ-বিসুখ আর পিছু ছাড়ে না। ঘরে ঘরে ক্যান্সার। মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে আলাদা করে লিখব। এখানে কথা বলব, ভেজাল বিরোধী অভিযান নিয়ে।

ভেজাল বিরোধী অভিযানের একটা দারুণ সাফল্য আছে। একসময় মাছ আর ফল কিনলে বোনাস হিসেবে ফরমালিন পাওয়া যেত। বছরের পর বছর অভিযান আর জনসচেতনতায় ফরমালিনের যুগ বোধহয় অতীত হয়েছে। কিন্তু পচা, বাসী মাছ-মাংস, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য, আগেই পাকানো ফল বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ তো আছেই।

সুপারশপ সংস্কৃতি বদলে দিয়েছে শহুরে মধ্যবিত্তের বাজার করার অভ্যাস। প্যাচপ্যাচে কাদার কাচাবাজার, আর দর-কষাকষির মাছের বাজার চাইলেই পেছনে ফেলে আপনি ঢুকে যেতে পারেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুপারশপে; এক ছাদের নিচে পেয়ে যাবেন সবকিছু। মান নিয়ে চিন্তা নেই, দাম নিয়ে ভাবনা নেই; পছন্দ করুন, ট্রলিতে তুলুন; তারাই গাড়িতে তুলে দেবে। আগোরা, স্বপ্ন, মীনাবাজার, প্রিন্সবাজার পা বাড়ালেই পেয়ে যাবেন। বাজার নিয়ে নিশ্চিন্ত, নির্ভার। কিন্তু ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান আমাদের সেই নিশ্চিন্তিতে ধাক্কা দেয়। যখন শুনি আগোরা বা স্বপ্নের মতো স্বপ্নের সুপারশপেও পচা-বাসী মেয়াদোত্তীর্ণ, নিম্নমানের পণ্য বিক্রি হয়; দাম বেশি রাখা হয়, ওজনে কারচুপি করা হয়। তখন সত্যিই আমাদের নিশ্চিন্তিতে আঘাত লাগে। স্বপ্ন-আগোরার মতো সুপারশপেও যদি এমন দুই নাম্বারি হয় তাহলে আমরা কোথায় যাবো? তবে অভিযানের সময় প্রায়শই অতিরিক্ত কঠোরতা আরোপ করা হয়। সঠিক যাচাই ছাড়াই শাস্তি দেওয়া হয়, সাথে হয় মিডিয়া ট্রায়াল। ফলে দোষ না করেও বদনামের ভাগিদার হতে হয়। আমরা চাই আইনি কাঠামোয় সুষ্ঠু অভিযান। তবে কাউকে যেন অযথা হয়রানি করা না হয়। বিনা পাপে বা লঘু পাপে যেন গুরুত্ব না হয়।

সুপারশপের পাশাপাশি ফলের আড়তেও চলছে অভিযান। মণকে মণ আম ধ্বংস করা হচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী গত কদিনে ঢাকায় অন্তত ৩ হাজার মণ আম ধ্বংস করা হয়েছে। বুলডোজারের চাকাকে আরও পিচ্ছিল করেছে কলার কাদি। ফলের আড়তে অভিযান দেখেও আমরা পুলকিত হচ্ছি, যাক অভিযানটা চললে এবার বিষমুক্ত আম খাওয়া যাবে। সত্যি বলতে কি গত কয়েকবছরে বিষের ভয়ে ফল খাওয়া ছেড়ে দেওয়ার দশা হয়েছিল। আমার স্ত্রী মুক্তির খুব প্রিয় ফল তরমুজ। কিন্তু কেমিক্যালের ভয়ে সে তরমুজ খাওয়া ছেড়েই দিয়েছে প্রায়। আমের মৌসুম এলেই ‘বিষমুক্ত আমের দোকান’ বসে যায় রাস্তার ধারে। বিষমুক্ত আমের দোকান মানে বাজারে বিষযুক্ত আমও বিক্রি হয়। তবে ইদানিং সরকারের কঠোর অবস্থান আর জনসচেতনতায় অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। নজরদারিটা শুরু হয়েছে বাগান থেকে। কোন আম কবে পাড়া যাবে, তার রীতিমতো ক্যালেন্ডার আছে। তারপরও অনেকই বেশি লাভের আশায় অপরিপক্ক আম পেড়ে মেডিসিন দিয়ে পাকিয়ে বাজারে নিয়ে আসে। সেখানেই হানা দেয় ভ্রাম্যমান আদালত। আর আম ধ্বংসের খবর আমরা তালি দিই। কিন্তু মণকে মণ আমের ওপর দিয়ে বুলডোজার চলতে দেখলে আমার খালি মনে হয়, আহারে কত ব্যবসায়ী যে এই ঈদের মাসে সর্বশান্ত হয়ে গেল। জোর করে পাকানো হয়তো অপরাধ। কিন্তু সেই অপরাধে একজন ছোট ব্যবসায়ীকে পথের ফকির বানিয়ে দেওয়া কতটা সমর্থনযোগ্য? আর এখন তো জানা যাচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় ইথোফেন বা কার্বাইড ব্যবহার অনুমোদিত। আর অভিযানের আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার কোনটা অপরাধ, কোন মাত্রার অপরাধ? আড়তের পেছনে কার্বাইডের জার পেলেই মণকে মণ আম ধ্বংস করে ফেলা কোনো কাজের কথা নয়।

ভেজাল বিরোধী অভিযানের এক নম্বর সমর্থক আমি। চাই বছরজুড়ে চলুক ভেজালবিরোধী অভিযান। কেউ যেন অন্যায়ের শিকার না হয়, লঘুপাপে যেন গুরুতর না হয়। ভেজালবিরোধী অভিযানে যেন ভেজাল না থাকে। অভিযান চলুক বাজারে শৃঙ্খলা আনতে, ব্যবসায়ীদের শৃঙ্খলিত করতে নয়।
লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত