প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অস্তিত্ব সংকটে পড়বে দেশীয় টেলিযোগাযোগ কোম্পানি

রাশেদ মেহেদী : টেলিযোগাযোগ খাতে দেশীয় কোম্পানিগুলোর সামনে বড় শঙ্কা তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার টেলিযোগাযোগ সেবার জন্য আইটিইউ পরামর্শক প্রণীত আইএলডিটিএস খসড়া নীতিমালা। দেশীয় কোম্পানি-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এই খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত হলে টেলিযোগাযোগ খাতের সব সেবা এমনকি ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণও বিদেশি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটরদের হাতে চলে যাবে। ফলে টেলিযোগাযোগ খাতে যেসব দেশীয় কোম্পানি ক্রম বিকাশমান রয়েছে, সেগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

যদিও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসি কর্তৃপক্ষ বলছে, আন্তর্জাতিক টেলিকম ইউনিয়ন-আইটিইউর একজন পরামর্শককে দিয়ে এই খসড়া গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে। এখন খসড়ার ব্যাপারে সব পক্ষের মতামত নেওয়ার পর এই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। তবে দেশীয় কোম্পানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, খসড়া নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে আইটিইউর পরামর্শক তাদের মতামত আমলে না নিয়ে শুধু তিনটি বড় মোবাইল অপারেটরের ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখেছেন। ফলে এ নীতিমালা টেলিযোগাযোগ খাতে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের শঙ্কায় ফেলেছে। মোবাইল অপারেটরদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত হলে মোবাইল সেবায় গুণগত মান নিশ্চিত করা সহজ হবে।

এ ব্যাপারে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার  বলেন, বিটিআরসি থেকে খসড়া নীতিমালাটি এখনও মন্ত্রণালয়ে আসেনি। এটা মন্ত্রণালয়ে এলে এ ব্যাপারে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টেলিযোগাযোগ শিল্পের সংশ্নিষ্টদের মতামত অবশ্যই নীতিমালা তৈরিতে গুরুত্ব পাবে।

বিদ্যমান ও খসড়া নীতিমালায় যেসব পরিবর্তন : ২০০৭ সালে প্রথম টেলিযোগাযোগ খাতে আইএলডিটিএস নীতিমালা গ্রহণ এবং ২০১০ সালে এটি একবার হালনাগাদ করা হয়। এই নীতিমালার আলোকেই মূলত দেশে টেলিযোগাযোগ সেবার বিভিন্ন লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। নানা স্তরে লাইসেন্সের ভিত্তিতে টেলিযোগাযোগ খাতে দেশীয় ও বিদেশি কোম্পানি ব্যবসা করছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৯৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত টেলিযোগাযোগ খাতে বিদেশি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটররাই একচ্ছত্র ব্যবসা করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটক কিংবা বিটিসিএল কখনোই প্রতিযোগিতায় আসতে পারেনি। ২০০৯ সালে দেশীয় মালিকানায় এনটিটিএন বা টেলিযোগাযোগ খাতে ট্রান্সমিশনের জন্য আইএলডিটিএস নীতিমালার আলোকে পৃথক লাইসেন্স দেওয়া হয়। পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) এবং ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) লাইসেন্স দেওয়া হয়। এ তিনটি ক্যাটাগরিতেই শুধু দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মালিকানাতেই টেলিযোগাযোগ কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়।

এখন নতুন খসড়া নীতিমালায় বিদ্যমান আইএলডিটিএস নীতিমালার আমূল পরিবর্তন করা হয়েছে। যেমন বিদ্যমান নীতিমালায় আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সেবার জন্য সাবমেরিন কেবল কোম্পানি এবং ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্টোরিয়াল কোম্পানি (আইটিসি) রাখা হয়েছিল। জাতীয় টেলিযোগাযোগ সেবার ক্ষেত্রে প্রথম স্তরে আইজিডব্লিউ ও আইআইজি, দ্বিতীয় স্তরে ইন্টার কানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) এবং ন্যাশনাল ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ (নিক্স) অপারেটররা ছিল। তৃতীয় স্তরে ভয়েস কল এবং ডাটা সার্ভিসের জন্য লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে পৃথক অবস্থান রাখা হয়েছিল। এর ফলে মোবাইল অপারেটরদের জন্য শুধু ভয়েস কল ও এ-সংক্রান্ত ভ্যালু অ্যাডেড সেবা এবং আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত ছিল। এ ক্ষেত্রে এনটিটিএন অপারেটররা সব স্তরেই ট্রান্সমিশন সুবিধা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল।

অন্যদিকে খসড়া নীতিমালায় প্রথম স্তরের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সেবার জন্য নির্ধারিত সাবমেরিন কেবল কোম্পানি এবং আইটিসি কোম্পানিগুলোকে একেবারেই বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে প্রথম স্তরে ইন্টারন্যাশনাল টেলিযোগাযোগ সেবার জন্য আইজিডব্লিউ এবং আইআইজি; দ্বিতীয় স্তরে জাতীয় টেলিযোগাযোগ সেবার জন্য একই সঙ্গে এনটিটিএন, আইসিএক্স, নিক্স ও মোবাইল অপারেটরদের রাখা হয়েছে। এর বাইরে খসড়া নীতিমালায় সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে খুচরা মূল্যে টেলিযোগাযোগ সেবা দেওয়ার স্তরেও রাখা হয়েছে মোবাইল অপারেটরদের। তাদের সঙ্গে আইএসপি, ওআইম্যাক্স এবং পিএসটিন অপারেটররাও রয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক স্তরের জন্য পৃথকভাবে লাইসেন্স দেওয়া হবে। অর্থাৎ খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত হলে একই সঙ্গে দুটি স্তরে অবস্থানের কারণে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরে বিদ্যমান সব ধরনের টেলিযোগাযোগ সেবার লাইসেন্স পাবে মোবাইল অপারেটররা। ফলে মোবাইল অপারেটর শুধু ভয়েস কল কিংবা তারবিহীন ইন্টারনেট সেবা নয়, পাশাপাশি ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা, ল্যান্ডফোন সেবা, এনটিটিএন বা ট্রান্সমিশন সেবা, ইন্টারকানেকশন এবং ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ সেবা প্রদানের লাইসেন্সও নিতে পারবে।

দেশীয় কোম্পানিসহ সংশ্নিষ্টদের অভিমত :বর্তমানে জাতীয় টেলিযোগাযোগ ট্রান্সমিশন (এনটিটিএন) এবং তারের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা, আইসিএক্স, নিক্স ও পিএসটিএন সেবা দিচ্ছে দেশীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে এনটিটিএন সেবায় দুটি দেশীয় মালিকানাধীন কোম্পানি এরই মধ্যে সারাদেশে ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই দুই কোম্পানিতে পাঁচ হাজারেরও বেশি দেশীয় প্রকৌশলী ও অন্যান্য কর্মী কাজ করছেন। শতাধিক আইএসপি প্রতিষ্ঠানও বিভাগীয়, জেলা শহরসহ প্রায় সারাদেশেই নেটওয়ার্ক তৈরি করে সেবা দিয়ে যাচ্ছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানেও শত শত দেশীয় কর্মী কাজ করছেন। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, খসড়া আইএলডিটিএস নীতিমালা চূড়ান্ত হলে বিদেশি মালিকানাধীন তিনটি মোবাইল অপারেটরের নিয়ন্ত্রণেই টেলিযোগাযোগ খাতের সব ধরনের ব্যবসা চলে যাবে। এর ফলে দেশীয় মালিকানাধীন এনটিটিএন এবং আইএসপি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

এ ব্যাপারে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি এনটিটিএন কোম্পানি ফাইবার অ্যাট হোমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈনুল হক সিদ্দিকী বলেন, মোবাইল অপারেটরদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল দেশীয় মালিকানাধীন এনটিটিএন কোম্পানিসহ অন্যান্য কোম্পানির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা। তারা কম সময়ে বেশি লাভ তুলে নেওয়ার জন্য টেলিযোগাযোগ খাতে দেশীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোকে অস্তিত্বহীন করতে চায়। আইটিইউ পরামর্শক মূলত মোবাইল অপারেটরদের সেই স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই আইএলডিটিএস খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছে। এ নীতিমালা চূড়ান্ত হলে দেশীয় এনটিটিএন কোম্পানিগুলো একেবারেই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। এ নীতিমালায় শুধু মোবাইল অপারেটরদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে।

আইএলডিটিসির নীতিমালা হালনাগাদ করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আইএসপি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেন, এ খসড়া নীতিমালার ব্যাপারে এরই মধ্যে নিজেদের আপত্তি ও মতামত লিখিতভাবে বিটিআরসিকে জানানো হয়েছে। খসড়া নীতিমালায় একীভূত লাইসেন্স দেওয়ার যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তার ফলে বিদেশি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটররা ইন্টারনেটের পাইকারি বাজার ও আইএসপি সেবা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাবে।

মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব টি আই এম নুরুল কবীর বলেন, বিদ্যমান আইএলডিটিএস নীতিমালায় মোবাইল অপারেটররা স্বাধীনভাবে সেবা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে গ্রাহক পর্যায়ে গুণগত সেবার মান নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় খসড়া নীতিমালয় একীভূত লাইসেন্স দেওয়ার যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তার ফলে মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবায় নির্ভরতা কমবে এবং সেবার মান নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে দেশীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সমকাল।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত