প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘পরিবহনে নৈরাজ্য-চাঁদাবাজি নির্মূল হলেই কমবে দুর্ঘটনা’

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় নৈরাজ্য বিরাজ করছে। এ খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রেখেছেন সরকারি দল, বিরোধী দলের নেতারা। এখানে চালক-মালিক থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রণকারীদের কেউ নিয়ম মানেন না। পাশাপাশি সড়ক-মহাসড়কে পদে পদে আছে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য। এসবই সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব নির্মূল করার পাশাপাশি পথচারীদের সচেতন করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমে যাবে।’

বৃহস্পতিবার (২৪ মে) বিকাল সাড়ে ৪টায় দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘বাস, গণপরিবহন এবং…’ শীর্ষক বৈঠকিতে আলোচকরা এসব কথা বলেন। পান্থপথে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করে এটিএন নিউজ। পাশাপাশি এ আয়োজন বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ দেখানো হয়।

এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় বৈঠকিতে অংশ নেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিকলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ (খোকন), বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী, গাজী টিভি ও সারাবাংলার এডিটর ইন চিফ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা এবং বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব নিউজ হারুন উর রশীদ।

বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব নিউজ হারুন উর রশীদ বলেন, ‘ঢাকার ভেতরে যারা বাস চালান, তারা কিন্তু বেতনভুক্ত নন। মালিকের কাছ থেকে একটি চুক্তিতে বাস এনে চালান তারা। তিনি (চালক) তার অধীনস্থদের বেতন দেন। অধীনস্থদের এই অর্থের জোগান দিতে গিয়ে তিনি তাড়াহুড়ো করে বাস চালান, তার মাথা ঠিক থাকে না। পাল্লা দেন। আবার দূরপাল্লার বাসের ড্রাইভাররা ট্রিপ দেওয়ার ওপর অর্থ পান। তারা দিনে যে ক’টি ট্রিপ দেন, সেই হিসাবে অর্থ পান। অর্থাৎ সে যত দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন, তিনি আরও একটি ট্রিপ দেওয়ার মাধ্যমে আরও কিছু অর্থ উপার্জনের সুযোগ পান। ট্রিপ বেশি দেওয়ার জন্য রাত জেগে বাস চালাতে মাদকও সেবন করেন এই চালকরা। ফলে তারা পথে-ঘাটে দুর্ঘটনায় পড়েন। এভাবে মুনাফার নৈরাজ্যে বাসচালকদের ঢুকিয়ে দেন মালিকরাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন সড়কে বাসচাপা পড়ে সাধারণ পথচারী মারা যাচ্ছেন। এটা উদ্বেগজনক হারে ক্রমেই বাড়ছে। হাত হারিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে মারা যাওয়া রাজীবের ঘটনা নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একসময় বাসে বাসে পাল্লা দিতে গিয়ে এই ঘটনা সুপরিচিত ছিল। এখন আবার নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘অশিক্ষিত, অপ্রাপ্ত বয়স্ক এবং অদক্ষ চালককে বাসের দায়িত্ব দিয়ে বড় ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করেন বাসমালিকরা। তাই মালিকদেরই সবার আগে আইনের আওতায় আনতে হবে। সম্প্রতি বাস দুর্ঘটনার পরে হাইকোর্ট যখন আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখন কিন্তু মালিকরা ঠিকই হামলে পড়লেন। তারা বললেন, তারা এই অর্থ দিতে পারবেন না। ফলে অদক্ষ-অযোগ্য-অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালককে নিয়োগ দেওয়া যাবে না, এই মর্মে আইন করা যায়। এই আইনের প্রয়োগ যদি ঠিকঠাক মতো হয়, তাহলে এই নৈরাজ্য অনেকাংশে কমে যাবে।’

হারুন উর রশীদ বলেন, ‘আমাদের দেশে ৭০ লাখ চালক রয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ১৬ লাখ বিআরটিএ থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত। বাকিদের লাইসেন্স নেই। প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত দায় আছে। একজন চালক যখন গাড়ি চালাবেন, তখন তার নিজেকেও গাড়ি চালাতে জানতে হবে। না জেনে গাড়ি চালাতে চাইলে সেটা তার ব্যক্তিগত দায়। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে তাকেও দায় নিতে হবে। তাকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এটাকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘অনেককেই নানা রকম চাঁদা দিতে হয়। ড্রাইভার ও হেল্পারদের বেতন দিতে হয়। অর্থাৎ একটি বাস চালিয়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা উপার্জন করতে গিয়ে চালকদের ওপর নানা চাপ থাকে। সারাদিন কাজ করে বেশিরভাগ স্থানে চাঁদা দেওয়ার পর পকেটে যখন মাত্র তিন থেকে চারশ’ টাকা ঢোকে, তখন সে এসব অনিয়ম করতে বাধ্য হয়। এই নানান জায়গায় চাঁদা দেওয়া বন্ধ না হলে এমন বেপরোয়া পরিস্থিতিও চলতেই থাকবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যারা বাসে কাজ করে তারা অপুষ্টিতে ভোগে, ঠিকমত খাবার পায় না; আমরাও দিতে পারি না। তাদের বয়সও বেশি না। দিন শেষে তারা তিন থেকে চারশ’ টাকা পায়। এতে তাদের চলে না। ফলে তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই প্রতিযোগিতাসহ নানাভাবে অপকর্মও করে চালকরা। সেটা খেয়াল রাখতেও কেউ পারে না।’ এ ছাড়া, গতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ফ্লাইওভারগুলোতে কোনও সাইনবোর্ড নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আসলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর জন্য প্রথমেই দরকার সচেতনতা সৃষ্টি। পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহীদেরও তো সচেতনভাবে রাস্তায় চলাচল করতে হবে। এ ছাড়া, এখন প্রতিটি সড়কে ফুটপাতের জায়গা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। কিন্তু সেই ফুটপাত দিয়ে কি আমরা ঠিকমত চলাচল করতে পারি? হকার বসে, কেনাবেচা হয়, তখন তো আমরা চলাচল করতে পারি না। ফুটওভার ব্রিজ ক’জন পথচারী ব্যবহার করেন? রাজধানীর হাতেগোনা কয়েকটি রাস্তায় মোড়েও জেব্রা ক্রসিং নেই মনে হয়। থাকলেও তার কার্যকারিতা কি আছে? আমি তো দেখি না। তাই আমাদের আরও অনেক সচেতন হতে হবে। সরকারকেও এ বিষয়ে অনেক কাজ করতে হবে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিকলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ (খোকন) বলেন, ‘দুনিয়ার চাঁদাবাজরা কিন্তু এক। তাদের ভেতর কোনও ভেদাভেদ নেই। সরকারি লোক হোক বা বিরোধী দলের লোক হোক, তাদের একে-অপরের সঙ্গে এই একটি জায়গায় খুব মিল। মতিঝিল থেকে ঢাকা পর্যন্ত দূরুত্বে একেক বাসে একেক রকম ভাড়া। এই টাকা কোথায় যায়? দিন শেষে এই টাকা চাঁদাবাজদের পকেটে যায়। অতিরিক্ত যে ভাড়া নেওয়া হয় তাও কিন্তু চাঁদাবাজদের পকেটে যায়।’

তিনি বলেন, ‘একজন শ্রমিক নেতা যদি ২০০ কোটি টাকার মালিক হন, তার বাড়ি-গাড়ির হিসাব না থাকে; তাহলে শ্রমিকদের উন্নয়ন কখনও হবে না। আমার কাছে জানতে চান, আমি দেখিয়ে দিতে পারি, কে কে টাকার পাহাড় গড়েছেন। সরকার এখানে কেন চুপ? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন চুপ? এই দুর্নীতি বন্ধ করে না কেন?’

মোহাম্মদ হানিফ আরও বলেন, ‘যে মালিক-শ্রমিকের ঐক্যের কথা বলা হয়, আদৌ কি তেমন কোনও ঐক্য আছে? আমাদের সঙ্গে কিন্তু কারও ঐক্য নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেড়ারেশনের সঙ্গে সরকারের দুই জন মন্ত্রী সম্পৃক্ত। মালিক সমিতির একজন এবং শ্রমিক সংগঠনের একজন। একাত্তর টেলিভিশনের একটি প্রোগ্রামে মশিউর রহমান রাঙ্গা ভাই বললেন, আমি আর শাজাহান ভাই বসে নির্ধারণ করে দেবো— কোন জায়গায় কত চাঁদা আদায় করবে। শ্রম আইনে রাস্তায় চাঁদা ওঠানোর কোনও বিধান নেই।’

তিনি বলেন, ‘কক্সবাজার থেকে নরমাল চেয়ারকোচে ঢাকায় আসতে লাগে ৮শ’ টাকা। কিন্তু এসি বাসে দুই হাজার টাকা। এত বাড়তি টাকা কেন? এই টাকা কার পকেটে যায়? মালিক কিন্তু ড্রাইভারকে মাসিক বেতন দেয় না। চুক্তিতে ট্রিপ অনুযায়ী দেয়। বিআরটিএ বারবার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলছে, এক নাগাড়ে কোনও চালক ৫ ঘণ্টার বেশি বাস চালাতে পারবে না। কিন্তু তা কি মানা হচ্ছে? একজন চালক যদি ২৪ ঘণ্টা স্টিয়ারিংয়ে বসে থাকে, তাহলে তার হাত-পা তো কাজ করার কথা নয়। তখন তো সে মানুষ থাকে না। দুর্ঘটনা কেন ঘটবে না! কিন্তু ওই চালকের যদি শ্রম আইন অনুযায়ী মাসিক বেতন থাকে, তাহলে তো এমনটি হতো না। কিন্তু মালিক তো সেই আইন অনুযায়ী তাকে বেতন দিচ্ছে না। তখন তাকে বেশি বেশি টাকার জন্য বেশি বেশি ট্রিপ দিতে হয়।’

মোহাম্মদ হানিফ বলেন, ‘আমরা শ্রমিকলীগের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বারবার স্মারকলিপি দিয়েছি। সেতুমন্ত্রীসহ সবাইকে বলেছি, পত্রিকাতেও বলেছি। কিন্তু, কোনও লাভ তো হচ্ছে না। আমি বলতে চাই— চাঁদাবাজি-হয়রানি বন্ধ করুন। দুর্নীতি দমন কমিশন এত কিছু নিয়ে অনুসন্ধান করে, এই খাত নিয়ে কেন করে না? সরকার কেন স্টেপ নেয় না? একজন ড্রাইভারের আঁতুড়ঘর, বিআরটিএ। তাকে কিভাবে লাইসেন্স দেওয়া হয় তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ছাড়া, একজন চালক রাস্তায় নামার আগে তাকে কিছু মৌলিক প্রশিক্ষণ তো দিতে হবে, সেই প্রশিক্ষণের জন্য কোনও ব্যবস্থাও তো সরকার করতে পারে, তা তো করে না।’

গাজী টিভি ও সারাবাংলার এডিটর ইন চিফ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, ‘শুধু লেগুনা থেকে প্রতিদিন ২৫ লাখ টাকা চাঁদা ওঠে। এই চাঁদা ওঠানো বন্ধ না করতে পারলে দুর্ঘটনা কমবে না। আসলে রেষারেষি-দাপাদাপির যে সংস্কৃতি তা সুষ্ঠু সড়ক ব্যবস্থাপনা নয়। প্রায় প্রতিদিনই দেখছি, সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। প্রতিদিনই আমাদের এমন খবর প্রকাশ করতে হয়। এই নৈরাজ্য কমানোর জন্য আমরা কি করতে পারি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়াত আনিসুল হকের সঙ্গে ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে একটি কমিটিতে কাজ করছিলাম। সেখানে বেশ কিছু ভালো সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল, যার সবই ডিজিটাল পদ্ধতিনির্ভর। সমস্ত জায়গায় যদি অনলাইন, ডিজিটাল ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো যায়, তাহলে পরিবহন খাত কেন ডিজিটালাইজড করা হবে না। এর বিরোধী কিন্তু বাসমালিকরাই। তারা ডিজিটালাইজড লেনদেন করতে চান না। কারণ, নগদ লেনদেনে বিশাল অঙ্কের টাকা চাদা হিসেবে দেওয়া-নেওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে এই নগদ লেনদেনকে তারা জিইয়ে রাখতে চান।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ। একটি পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিমা দেশ ও পাশের দেশ ভারতের চেয়েও অনেক অনেক বেশি দুর্ঘটনা এখানে ঘটে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের যদি সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যেতো, তাহলে জিডিপি তিন শতাংশ বাড়তো। প্রায় সব দেশেই এই পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমটি সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তা কি হয়? শুধু ঢাকায় এত বাসমালিক তা সারা আমেরিকাতেও নেই।’ সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত