প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রোহিঙ্গা ক্যাম্প
গর্ভবতী নারীর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে

ডেস্ক রিপোর্ট : কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩০টি ক্যাম্পে বসবাস নতুন-পুরাতন মিলে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার। এর মধ্যে ১০ লক্ষাধিক নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে গত বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে পরবর্তী তিন মাসে। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের অর্ধেকের বেশি নারী। এর মধ্যে বর্তমানে গর্ভবতী নারীর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা।

আবার এই গর্ভবতীর ২০ শতাংশ মিয়ানমার সেনা-বিজিপি ও স্থানীয় মগ-মুরংদের দ্বারা যৌন সহিংসতার শিকার; যার বড় একটি অংশ অবিবাহিত ও কিশোরী। ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় কিশোরী ও কুমারী মহিলাদের গর্ভবতী হওয়ার বিষয়টি নতুন সংকট তৈরি করেছে। কারণ আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে জন্ম নিতে চলেছে এসব কিশোরী ও কুমারী মাতার জীবনের প্রথম এবং অপ্রত্যাশিত সন্তান। ইতিমধ্যে কেউ কেউ এমন শিশুর জন্মদানও করেছেন। ফলে ধর্ষণের শিকার এসব রোহিঙ্গা নারী কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের পরিবার ও সমাজের কাছে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন। দীর্ঘদিন চেপে রাখা গেলেও গর্ভবতী হওয়ার নয় মাস পার হতে চলায় এখন তা আর চাপা দিয়ে রাখা যাচ্ছে না। জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর অধিকাংশের পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও স্বজনরা বিষয়টি আর স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন না। এতে নতুন করে এক সামাজিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয়।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নারী-পুরুষদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিধন অভিযান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় রোহিঙ্গা নারীদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ও মগ-মুরংদের যৌন সহিংসতা। গত বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে যখন বাংলাদেশে রোহিঙ্গার ঢল নামে, তখন মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বিজিপি পরিকল্পিতভাবে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটায় বলে জানান রোহিঙ্গা নারীরা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ করা দাতব্য সংস্থাগুলো এখন এ সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। রোহিঙ্গা নারীদের বিরাট একটি অংশের স্বাভাবিক শিশু জন্মদানের পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত শিশু জন্মদানের সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। অনেকেই অপ্রত্যাশিত সেই শিশুর গর্ভপাত ঘটাচ্ছেন এবং কেউ কেউ মাতৃত্ব মেনে না নিয়ে নবজাতককে পরিত্যক্ত ঘোষণা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়গুলো এখানকার প্রজনন স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কর্মরত চিকিৎসক-নার্স ও সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে গর্ভবতী হওয়া নারীরা আগামী কয়েক সপ্তাহে সন্তান জন্ম দেবেন। কারও কারও অপূর্ণাঙ্গ সন্তান জন্মও নিয়েছে বলে সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে। চিকিৎসকদের সংস্থা মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) কক্সবাজারে বিভিন্ন হাসপাতাল পরিচালনা করছে। চিকিৎসাসেবা দানের পাশাপাশি আক্রান্ত মায়েদের কাউন্সেল করার কাজটিও তারা করে যাচ্ছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা নারীদের প্রজনন ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন এসিএফ, গণস্বাস্থ্য, উৎস, আরটিএম, মুক্তি, রেডক্রসসহ বেশ কয়েকটি দেশি-বিদেশি সংস্থা।

উেসর প্রকল্প ব্যবস্থাপকক রেজা আজিজ ও আনোয়ার হোসেন জানান, মাঠ পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অসংখ্য রোহিঙ্গা নারীর ধর্ষিতা হওয়ার করুণ কাহিনী শুনতে হয়েছে। অনেকেই আছেন যারা ঘুণাক্ষরেও কারও সামনে মুখ খোলেন না। ফলে মিয়ানমারে কত শত নারী ধর্ষণের শিকার ও গর্ভবতী হয়েছেন তার কোনো সঠিক সংখ্যা কেউ বলতে পারবে না। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এ সংখ্যা ২০ শতাংশের কম নয়। এমএসএফ বলেছে, এসব মায়ের অধিকাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অবাঞ্ছিতভাবে সন্তান গর্ভধারণের ক্ষেত্রে সামজিক কলঙ্কের চিন্তা তাদের মানসিক পীড়ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে বালুখালী ক্যাম্প-১-এর ১৩ নম্বর ব্লকের সুফিয়া আকতার (ছদ্মনাম) বলেন, ‘মংডু শহরে সহিংসতার সময় মিয়ানমারের চার সেনা সদস্য আমাদের ঘরে প্রবেশ করে সন্তানদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আমাকে এবং আমার ১৩ বছরের কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করেছে।’ আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘ভাবছিলাম কিছু হবে না। কিন্তু দিন কয়েক পর শারীরিক পরিবর্তন শুরু হলে আমি আমার চেয়ে আমার মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ি। এটা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে গোপন রাখার চেষ্টা করেও শারীরিক পরিবর্তনের কারণে তা হয়নি। তবে মেয়েকে এখন অন্য ক্যাম্পে আত্মীয়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি।’

এমএসএফ জানিয়েছে, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যৌন সহিংসতার শিকার ২২৪ নারীকে তারা চিকিৎসা দিয়েছে। তবে এমন বহু নারী আছেন, যারা সহিংসতার শিকার হয়ে সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে সাহায্য চাইতে বা চিকিৎসা নিতে আসেননি। এসব নারী বাসায় গর্ভপাতের চেষ্টা চালিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হন বলে এমএসএফের ধাত্রীদের ধারণা।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক জরিপের তথ্যানুযায়ী, দুই তৃতীয়াংশ নারী যৌন সহিংসতার শিকার হলেও তারা কোনো চিকিৎসক কিংবা দাতব্য সংস্থার কাছে যাননি। লজ্জা ও কলঙ্কের কথা মাথায় রেখে তারা এমনটা করছেন। এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে যেসব শিশু জন্ম নিয়েছে বা ভবিষ্যতে নেবে, তাদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণের কোনো কারণ নেই। বিভিন্ন সংস্থা পরিত্যক্ত বা অপ্রত্যাশিত শিশুর দায়িত্ব নিতে প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের তথ্যমতে, চলতি মাস থেকে আগামী কয়েক মাসে ধর্ষণের শিকার রোহিঙ্গা নারীদের পরিত্যক্ত সন্তানের সংখ্যা বেড়ে যাবে। হাজারো রোহিঙ্গা নারীর সন্তান প্রসবের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা রাখাইনে তারা যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ বলে জানাচ্ছে বিভিন্ন সংস্থা।বাংলাদেশ প্রতিদিন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত