প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডায়াবেটিস হলে কি চোখ পরীক্ষা করাবেন?

ডেস্ক রিপোর্ট : বর্তমান বিশ্বে যে রোগগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে তার মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম। এটি কোনো জীবাণুঘটিত বা ছোঁয়াচে রোগ নয়। শরীরে প্রয়োজনীয় হরমোন ইনসুলিনের অভাবে অথবা ইনসুলিনের কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়ার কারণে এ রোগ দেখা দেয়।

অতিরিক্ত মোটা ব্যক্তি যারা অধিক খাদ্যগ্রহণ করেন এবং যারা কায়িক পরিশ্রম করেন না বা কম করেন তাদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্বপুরুষের এই রোগ থাকলে ডায়াবেটিস হতে পারে। গর্ভকালীন সময়েও এই রোগ হতে পারে।

আপনি জানেন কি ডায়াবেটিসের সঙ্গে চোখের রোগের সম্পর্ক আছে। তাই যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের অবশ্যই চোখ পরীক্ষা করতে হবে।

ডায়াবেটিস কি?

স্বাভাবিকের চেয়ে রক্তে বেশি শর্করা বা সুগার থাকলে তাকে বলা হয় ডায়াবেটিস মেলাইটাস বা সংক্ষেপে ডায়াবেটিস। বাংলায় এই রোগকেই মধুমেহ বলা হয়। এই রোগের সঙ্গে চোখের অসুখের অবশ্যই সম্পর্ক রয়েছে।

ডায়াবেটিসের প্রকারভেদ

ডায়াবেটিস প্রধানত দুই প্রকারের। টাইপ ওয়ান এবং টাইপ টু। এ ছাড়াও আরও বেশ কয়েক প্রকারের হয়ে থাকে।

টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস কী?

টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস প্রধানত কম বয়সীদের হয়। বিভিন্ন কারণে অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামক হরমোনটি নির্গত হয় না। এই অবস্থায় ইনসুলিনের অভাব পূরণে ইনজেকশন দেয়া ছাড়া কোনও উপায় থাকে না। মোটামুটিভাবে সব ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ১০ শতাংশ রোগী এই ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন।

টাইপ টু ডায়াবেটিস কী?

এই ধরনের ডায়াবেটিস সবচেয়ে বেশি হয়। ভারতেও টাইপ টু ডায়াবেটিসে বেশিসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হন। মধ্যবয়স্ক, উচ্চতার তুলনায় ওজন বেশি, প্রধানত পরিশ্রমবিমুখ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত মানুষ এই রোগের শিকার হন। তবে আগেও বলেছি বংশানুক্রমিক ইতিহাস এবং জিনগত প্রভাবও এই রোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে।

আসুন জেনে নেই ডায়াবেটিস হলে কি চোখ পরীক্ষা করাবেন ডায়াবেটিস চোখের ক্ষতি করে
ডায়াবেটিস সারা শরীরে প্রভাব ফেলে। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগেই বলেছি এর মধ্যে চোখও পড়ে। চোখের রেটিনা, হার্ট, কিডনি, ধমনি, শিরা, উপশিরা, নার্ভ ইত্যাদি বিভিন্ন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

চোখের ওপরে ডায়াবেটিসের প্রভাব

চোখের নানা অংশে ডায়াবেটিস প্রভাব ফেলতে পারে। তবে চোখের ভেতরে রেটিনায় এই রোগের প্রভাব গুরুতর। রেটিনা হলো চোখের সবচেয়ে ভেতরের অংশ। এটি খুব সূক্ষ্ম এবং লালচে রঙের হয়। এটিই আসলে দৃষ্টি-চেতনা সংবেদনকারী এক পর্দা। তার মাঝে থাকে ম্যাকুলা ল্যুটিয়া যা সূক্ষ্মদৃষ্টি- চেতনার অংশ এবং অপটিক নার্ভ যা মস্তিষ্কের মূল দৃষ্টি-চেতনা বহনকারী নার্ভ তার সূচনা হয় এখান থেকে। রেটিনার বাইরের অংশে নিজের রক্ত সরবরাহ নেই। কিন্তু ভেতরের অংশে নিজের রক্ত সরবরাহের ব্যবস্থা আছে। আশঙ্কার কথা হলো, টাইপ ওয়ান এবং টাইপ টু—দুই ধরনের ডায়াবেটিসেই রেটিনার ওপর খারাপ প্রভাব পড়ে।

রেটিনা আক্রান্ত

চিকিৎসাশাস্ত্রের উন্নতি হওয়ার জন্য এখন আমাদের দেশে মানুষের বেঁচে থাকার গড় বয়স প্রায় ৭০ বছর। এর ফলে ডায়াবেটিস রেটিনা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও বেড়ে যাচ্ছে।

কারণ, কত দিন ধরে এক জন ডায়াবেটিসে কষ্ট তার ওপর রেটিনা আক্রান্ত হওয়ার হার নির্ভর করে। একটু সোজা করে বললে, যত বেশি দিন ধরে কেউ ডায়াবেটিসে ভুগবেন এই রোগের প্রভাবে ততই তার চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে।

রেটিনায় প্রভাব

ডায়াবেটিস আক্রান্ত হওয়ার ১০ বছর পরে প্রায় ২০ শতাংশ টাইপ ওয়ান রোগী এবং ২৫ শতাংশ টাইপ টু রোগী রেটিনার অসুখে ভুগতে শুরু করেন। একই ভাবে ২০ বছর পরে ৯০ শতাংশ টাইপ ওয়ান ও ৬০ শতাংশ টাইপ টু রোগী এবং ৩০ বছর পরে দুই ধরনের ডায়াবেটিসেরই প্রায় ৯৫ শতাংশ রোগী রেটিনার অসুখে আক্রান্ত হন।

১২ বছর বয়সের পর যত কম বয়সে ডায়াবেটিস হবে রেটিনা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তত বেশি। রক্তের সুগারের পরিমাণ ঠিক রাখা নিঃসন্দেহে জরুরি। কিন্তু অসুখটি কত দিন আছে সেটি খুব বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এ ছাড়া অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় উচ্চরক্তচাপ, ধূমপান, উচ্চতার তুলনায় বেশি ওজন, রক্তস্বল্পতা, রক্তে বেশি কোলেস্টেরল থাকলে বা কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে রেটিনা খারাপ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

যেভাবে রেটিনার ক্ষতি করে?

এই নিয়ে নানা গবেষণা হয়েছে। তবে এত গবেষণার পরেও এখন পর্যন্ত রেটিনা খারাপ হওয়ার ঠিক কারণটি জানা যায়নি। খুব সহজ ও সংক্ষেপে বলা যায়, রক্তে বেশি শর্করার ফলে রেটিনা ও রক্তনালির কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে রক্তের তরল অংশ রক্তবাহী নালি থেকে বেরিয়ে রেটিনার স্তরে জমা হয়। রেটিনা ফুলে ওঠে। রক্তনালিগুলোও ফুলে ওঠে। রক্তের থেকে স্নেহ পদার্থ বেরিয়ে জমা হয় রেটিনার মধ্যে এবং তা শক্ত হয়ে ফুলে ওঠে। এর ফলে, রেটিনার নিজের পুষ্টির অভাব হয়।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হয় যখন নতুন এবং অতি সূক্ষ্ম রক্তজালিকা রেটিনার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে রেটিনার বিকল্প পুষ্টির জন্য।

কিন্তু এই নতুন জালিকাগুলো খুব ভঙ্গুর এবং সহজেই রক্তক্ষরণ ও থ্রম্বোসিস হয়ে রেটিনার স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়। রেটিনাকে অস্বচ্ছ করে তোলে। এর ফলে প্রথমে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে দৃষ্টি খুব কমে যায়।

এ থেকে বাঁচার উপায় কী?

প্রথমেই চিকিৎসাশাস্ত্রের সেই চিরপরিচিত কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই— ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ অর্থাৎ, প্রতিকার আরোগ্যের থেকে ভালো।

তবে আমি আরও একটু বাড়িয়ে বলতে চাই, ডায়াবেটিস আটকাতে পারলে এর চিকিৎসার পেছনে খরচও হবে না। গাঁটের কড়ি কম খরচ হবে।

এর জন্য নিয়মিত কিছু রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে। রক্তের শর্করা, কোলেস্টেরলের মাত্রা, হিমোগ্লোবিন, ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন, হিমোগ্লোবিন-এ ১ সি, প্রস্রাবের বিভিন্ন পরীক্ষা, নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো দরকার। চোখের ক্ষেত্রে রেটিনার পরীক্ষার ওপরে জোর দিতে হবে।

পরামর্শ?

সতর্ক থাকতে হবে প্রথম থেকে। রোগ হলে চিকিৎসা করা যাবে না ভেবে রোগ যাতে না হয় সে দিকে নজর দিতে হবে। মূল কথা হলো, অলসতা ছেড়ে তথাকথিত ফাস্টফুড পরিহার করে আমাদের ফেলে আসা গ্রামীণজীবনের খাওয়াদাওয়া ও জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারলে ডায়াবেটিস থেকে দূরে থাকা যাবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত