প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঘোষণার স্বচ্ছ ঢাকা ডুবছে আবর্জনায়

ডেস্ক রিপোর্ট : ডিএসিসিতে আওয়াজ বেশি, কাজ কম ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাসের মাথায় ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর ২০১৬ সালকে পরিচ্ছন্ন বছর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। ওইদিন রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ঢাকা ক্লিন: টোয়েন্টি সিক্সটিন’ কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের কথাও বলেছিলেন। গণমাধ্যমও এই কর্মসূচির খবর ফলাও করে প্রকাশ করে। শহর পরিচ্ছন্নতায় আজ পর্যন্ত ওইসব উদ্যোগ সংস্থাটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি অভিযোগ রয়েছে নগরবাসী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের। তারা বলছেন কিন্তু বছর শেষে অর্জন ‘শূন্য’ই। সংস্থাটির কর্মকর্তারাও নিজেদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করেছেন।

‘ঢাকা ক্লিন: টোয়েন্টি সিক্সটিন’ ঘোষণার সময় মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু, ১০০টি আধুনিক গণশৌচাগার নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অর্ধশত সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করার কথা জানান। পাশাপাশি সড়ক থেকে আবর্জনার কনটেইনার স্থানান্তর, অনুমোদনহীন ব্যানার-ফেস্টুন অপসারণ ও অনুমতি ছাড়া ব্যানার ফেস্টুন লাগানো নিষিদ্ধ, ফুটপাতে মিনি ডাস্টবিন নির্মাণ, সন্ধ্যার পর থেকে সকাল ৭টার মধ্যে সব বর্জ্য স্থানান্তর, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মনিটরিং করার জন্য মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টিম ট্র্যাকার চালু, এলইডি বিলবোর্ড নির্মাণ, সড়কে এলইডি বাতি স্থাপন, দখলমুক্ত সড়ক নিশ্চিত করা, পরিচ্ছন্নতাবিষয়ক অভিযোগ জানার জন্য হটলাইন চালু, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য না ফেললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন মেয়র।

এছাড়া বর্ষার আগে ৩০০টি রাস্তা কংক্রিটে তৈরি, জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন তৈরি করে গণমাধ্যমে প্রচার, মোবাইলে নগরবাসীকে খুদে বার্তা দেওয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে শিক্ষাদান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রচারাভিযান, জনপ্রিয় ব্যক্তিদের দিয়ে প্রচার চালানো ও হকার উচ্ছেদসহ নানা কর্মসূচির ঘোষণা করেন সাঈদ খোকন। তবে ঘোষিত সময়ের মধ্যে ডিএসসিসি ওই বছর শুধু কিছু ব্যানার, পোস্টার অপসারণ ও প্রধান সড়কসহ কয়েকটি এলাকায় এলইডি বাতি লাগাতে পেরেছে বলে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানিয়েছেন। পরের বছর ডিজিটাল এলইডি লাইট ও এলইডি বিলবোর্ড লাগানো ছাড়া বাকি সব উদ্যোগই ভেস্তে যায়।

এসব প্রকল্পগুলোর মধ্যে নগরজুড়ে ৫০টি এসটিএস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত মাত্র ১০টির নির্মাণ কাজ শেষ করতে পেরেছে সংস্থাটি। বাকিগুলো বিভিন্ন মামলা ও অবৈধ দখলের কারণে নির্মাণ শেষ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে সংস্থার অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম। তিনি জানান, এডিবি ও আরবান পাবলিক অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল হেল্থ সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় এই এসটিএসগুলো নির্মাণ কাজ হচ্ছে।

ডিএসসিসি সূত্র জানিয়েছে, ২২ নং ওয়ার্ডের প্রগতি ডেইরি ফার্মা সংলগ্ন খালি জায়গা, হাজারীবাগের মেটাডোর, জুরাইন কবরস্থান, হাজারীবাগের আকাশ অটো মটর ওয়ার্কশপ, সিক্কাটুলী, কাপ্তান বাজার, উল্টিনগঞ্জ গুদারাঘাট সংলগ্ন খালি জায়গা, নারিন্দা ট্রাক স্ট্যান্ড, সায়েদাবাদ দয়াগঞ্জ ক্রসিং লংলগ্ন ফ্লাইওভারের নিচের খালি জায়গা ও আনন্দবাজারের দক্ষিণ পাশ সংলগ্ন খালি জায়গায় এসটিএস নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ধলপুর স্টাফ কোয়ার্টার, ধানমন্ডি লেক সংলগ্ন খালি জায়গা, ধলপুর স্টাফ কোয়ার্টার সংলগ্ন পুরানো এসটিএসের খালি জায়গা ও যাত্রাবাড়ী মোড় সংলগ্ন সামাদ মার্কেটের সামনের স্থানের এসটিএস নির্মাণ কাজ চলমান।

এছাড়া আজিমপুর সরকারি কলোনি, ঢাকা মেডিক্যাল জরুরি বিভাগ সংলগ্ন ঢাবির ফিজিক্যাল মাঠের দক্ষিণ পাশের গ্যারেজ সংলগ্ন খালি জায়গা, উসমানী উদ্যানের খালি জায়গা, পান্থকুঞ্জ ও নবাবগঞ্জ পার্কের পার্শ্ববর্তী বেড়িবাঁধ সংলগ্ন খালি জায়গায় এসটিএসের নির্মাণ কাজ চিহ্নিত করা হলেও মামলাজনিত কারণে এখনও শুরুই করা যায়নি। বাকি এসটিএসগুলো নির্মাণের জন্য এখনও জায়গা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী স্বচ্ছ ঢাকা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই কর্মসূচি ঘোষণায় বলা হয়েছিল—রাস্তা, ফুটপাত, রোড মিডিয়ান, সসার ড্রেন, ডিট ড্রেন, ওপেন ড্রেন পরিষ্কার ও প্রয়োজনীয় স্থানে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যাক্রম পরিচালনা করা, কন্টেইনার স্থাপনের জায়গা পরিষ্কার রাখা, ধোয়া, রঙ করা ও এতে গ্রাফিতি আঁকা হবে। সিটি করপোরেশনের মার্কেট, ওয়েস্টবিন ও ফুটওভার ব্রিজ পরিষ্কার করা। সাকার মেশিনের সাহায্যে আবর্জনা অপসারণ করার ঘোষণাও দেওয়া হয় ওই সময়ে।

এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, পুরান ঢাকার পঞ্চায়েত কমিটি, টিভিসি তৈরি ও প্রচার, লিফলেট ও বিজ্ঞাপন বিতরণ, প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক্স ও অনলাইন মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন প্রচার, নগরবাসীর কাছে পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত এসএমএস, বিভিন্ন সেলিব্রেটিদের অংশগ্রহণে প্রচারণা ও স্বচ্ছ ঢাকা কনসার্টের মাধ্যমে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয় বলে জানান মেয়র সাঈদ খোকন। তবে, জানা গেছে, ঢাকা স্বচ্ছ না হলেও এরই মধ্যে এসব প্রচারণা করেছে ডিএসসিসি।

পরিচ্ছন্ন বছরের পর আরও একটি বছর অতিক্রম হলেও এখনও পরিচ্ছন্নতায় কোনও সুফল দেখছে না নগরবাসী। তাদের অভিযোগ—উল্টো দিনদিন আরও বেহাল হচ্ছে রাস্তাঘাট। যেখানে-সেখানে পড়ে থাকছে আবর্জনার স্তূপ। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। আর সিটি করপোরেশন বলছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ছে বর্জ্যও। এ জন্য সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে। কিন্তু নগরবাসীর মধ্যে সে ধরনের কোনও সচেতনতা এখনও সৃষ্টি হয়নি। এ কারণে এ সেক্টরে সফলতা আসছে না বলেও তিনি দাবি করেন।

ডিএসসিসি সূত্রে জানায়—সড়ক পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন এলাকায় ৫ হাজার ৭০০টি মিনি ডাস্টবিন স্থাপন করা হয়। ময়লা রাখার ছোট ছোট ওই বিনগুলোয় মেয়রের নাম সংবলিত পরামর্শও দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে ওই সময়ই নগরবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছিল। ডিএসসিসির পরিচ্ছন্ন বিভাগের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বর্তমানে এই বিনগুলোর ৪৯ শতাংশই চুরি ও বিকল হয়ে গেছে। বাকি ৫১ শতাংশ সচল রয়েছে। এর মধ্যে ২৭ শতাংশ মেরামতযোগ্য। বাকি ২২ শতাংশ চুরি হয়ে গেছে। প্রকল্পটিতে বাস্তবায়নের পর এ যাবত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণবাবদ অন্তত ১০ কোটি টাকার মতো ব্যয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে, গত ১৩ এপ্রিল ঢাকা পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলে গ্রিনেজ বুকে রেকর্ড গড়ার ঘোষণা দেয় মেয়র সাঈদ খোকন। এ সময় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ব্যক্তিদের নিয়ে ব্যাপক শোড়াউন করান। যদিও ওই সময় মেয়রের দাবি ছিল—নগরবাসীকে সচেতন করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সংস্থাটির মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘আমরা নগরবাসীকে সচেতন করতেই এই প্রতীকী কর্মসূচি পালন করছি।’ এর মাধ্যমে নগরবাসীর মধ্যে সচেতনতা আসবে বলে মনে করেন তিনি।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেছেন, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ছাড়া এমন ঘোষণায় কোনেও কাজ হয় না। সিটি করপোরেশনের সক্ষমতার কথা মাথায় রেখেই প্রতিশ্রুতি দেওয়াসহ পরিকল্পনা করা উচিত বলে মনে করছেন তারা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহ-সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, সিটি করপোরেশনের যারা নির্বাচিত হন তারা প্রত্যেকেই রাজনীতিবিদ। তারা মানুষকে বোঝানোর জন্য যেভাবেই কথা বলা দরকার, সেভাবেই কথা বলেন। কিন্তু তাদের দেখতে হবে যে প্রতিশ্রুতিটি দিলেন, তা বাস্তবায়ন করার জন্য তারা প্রস্তুত কিনা।’ তিনি আরও বলেন, ‘নগরে যে পরিমাণ জনসংখ্যা আছে, তারা প্রতিদিনই কঠিন বর্জ্য উৎপাদন করে। এই বর্জ্যের পরিমাণ এতই বেশি যে, এগুলো সংগ্রহ করার মতো সক্ষমতা সিটির নেই। এ কারণেই মোট বর্জ্যের ৬০ ভাগ সংগ্রহ করা যায় না। এগুলো নালা-নর্দমায় রয়ে যায়। এসব আবর্জনাই পরিবেশদূষণ ও জলাবদ্ধতা তৈরি করে।’

নগর পরিচ্ছন্নতায় সফল হতে হলে তিনটি দিক থাকতে হবে উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘প্রথমত জনবলের সক্ষমতা, দ্বিতীয়ত টেকনিক্যাল সাইট ও তৃতীয়ত সে সংক্রান্ত জ্ঞান আছে কিনা। এই তিনটি বিষয় যদি একসঙ্গে না থাকে, তাহলে সিটি করপোরেশনকে এর ব্যবস্থা করতে হবে। এই তিনটি জিনিস একসঙ্গে কাজ করলে পরিচ্ছন্নতায় সফলতা আসবে। ডিএসসিসির এই ঘাটতিগুলো রয়েছে। যেই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। সিটি করপোরেশন সক্ষমতার কথা না জেনেই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।’

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থাপতি মোবাশ্বর হোসেন বলেন, বিগত বছরগুলোতে দুই শেয়র শুধু দেখানোর জন্যই কাজ করেছেন। এগুলো অবশ্যই ভালো কাজ। কিন্তু সমন্বিত ও পরিকল্পিত না। শহরকে পরিচ্ছন্ন করতে হলে সমন্বিত ও পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। কিন্তু সেগুলো হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি নাগরিকদের পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও স্বপ্নের ঢাকা উপহার তুলে দিতে। আমার চেষ্টার কমতি নেই। ইতোমধ্যে অনেক পরিবর্তন আপনারা দেখতেছেন। অনেক কাজ এখনও বাকি রয়েছে। এক্ষেত্রে জনগণের সহযোগিতাও অনেক জরুরি।’বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত