প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কি একতরফা হবে?

অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার : ২০১৮ সালের শেষ দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন (সংবিধান মোতাবেক) হওয়ার সময় নির্ধারিত আছে। সকলের মনেই একটি প্রশ্ন জাতীয় নির্বাচন হবে তো? কারণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রার্থী ও ভোটারবিহীন নির্বাচনের অভিজ্ঞতা দেশবাসীর রয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিগত এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা না পেলেও ভারতের অভিভাবকত্বের কারণে নির্বাচনবিহীন সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দাপটের সাথেই চলছে। যেমন যাকে জেলে রাখা দরকার তাকে জেলে দিয়েছে, যাকে ব্যাংক, বীমা, মিডিয়ার লাইসেন্স দেওয়ার তাকে তা দিয়েছেন, ব্যাংক লুট করার সুযোগও এ সরকারের আমলে হয়েছে যা ইতোপুর্বে এমনভাবে দেখা যায়নি, নিরষ্কুশ দলীয়করণের মাধ্যমে সরকারি ঘরনাদের ভাগ্যের চাকা চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণমানুষের দাবি একটি স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার একই দাবি। তিনি চেয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তে নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন। এ কথাটির জন্য জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও চরম পরীক্ষা দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। স্বৈরাচারী বেড়াজালকে ভেদ করে তিনি কবে নেতাকর্মীদের নিকট ফিরবেন তাই এখন গণমানুষের চিন্তার খোরাক।

নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন এখন আর বিএনপি’র দাবি নয়, এটা এখন সকল দলের দাবি, যারা এতদিন বিএনপিকে স্বাধীনতা বিরোধীদের আশ্রয় দাতা হিসেবে নাক ছিটকাত তারাও এখন প্রকাশ্যে নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করছে। কারণ এখন তারা মনে করেন যে, শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না। একথার পেছনে যুক্তি হলো নির্বাচন কমিশনের অধীনে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা। খুব সম্প্রতি খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগিতা হরিলুট করে ‘নৌকার’ জয় ছিনিয়ে নেওয়ার দৃশ্য, সকাল ১০টার আগেই নৌকার সীল মারার বাহিনী কিছু মিডিয়াতে প্রকাশ পেলেও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য মতে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। নাটকীয়তার মাধ্যমে হলেও রাষ্ট্রপতি নিশ্চয় যোগ্যদের নির্বাচন কমিশনার হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন বলে দাবি করবেন। কারণ রাষ্ট্রপতির সার্চ কমিটিতে বর্তমান প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বেই গঠিত হয়েছিল ‘সার্চ কমিটি’। সেই সার্চ কমিটি অনেক তল্লাশি করে যোগ্যদের দ্বারাই নির্বাচন কমিশন গঠন করার দাবি অমূলক হবে না। তবে মেরুদ-হীন ‘যোগ্যব্যক্তি’ দেশ, জাতি ও সমাজের কোনো কাজে না লাগলেও নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের খুবই সহায়ক। এ কারণেই ব্যক্তিত্বহীন ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের বড় বড় পদে আসীন হয়ে নিজ ও পরিবারের উন্নয়নে ব্যস্ত থাকে। ফলে জাতিকে পোহাতে হয় কালো রাত্রি। সাংবিধানিক পদসহ দায়িত্বশীল জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বড় বড় কর্মকর্তাদের যোগ্যতা হিসেবে ব্যক্তিত্ব, সৎ চিন্তার বাস্তবায়ন সম্পন্ন লোকের প্রয়োজন হয় না, বরং তেলের বাটি ব্যবহারের অনুশীলন থাকাটাই এখন বড় যোগ্যতা। তবে তেলের বাটির অনুশীলন যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, যারা ব্যতিক্রম তাদের ঝড়ে যেতে হয়েছে।

কাক্সিক্ষত জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছিলেন যে, তিনি ভবিষ্যতে আর বিতর্কিত নির্বাচন দেখতে চান না। ৫ জুনের নির্বাচন বির্তকিত হওয়ার উপলব্দি থেকেই হয়তো তিনি এ কথা বলতে পারেন, অথবা কথাটি লোক দেখানো কথাও হতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি লোক দেখানো কিনা এটাও ‘সময়ই’ প্রমাণ দেবে। তবে দৃশ্যত মনে হচ্ছে যে, বক্তব্যটি প্রধানমন্ত্রীর লোক দেখানো। কারণ শুধু স্থানীয় নির্বাচন নয়, বরং স্কুল-কলেজের পরিচালনা পষদ, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নির্বাচনও সরকারি দলের প্রভাব মুক্ত নয়। ১৪ মে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন হয়ে গেল। ক্ষমতাসীনরা আগেও বার কাউন্সিলে ক্ষমতায় ছিল এবং এবারও তারাই পাস করেছে। সুপ্রীম কোর্ট বারে ক্ষমতাসীনরা পরাস্ত হওয়ায় সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রায় ৮ হাজার ভোটের মধ্যে মাত্র ৮৫৩ ভোট রেখে বাকি ভোট বিভিন্ন জেলা বারে স্থানান্তর করে দেওয়ায় সুপ্রীম কোর্টের অনেক আইনজীবীই এবার বার কাউন্সিল নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। সুপ্রীম কোর্ট বার কেন্দ্রে ক্ষমতাসীনদের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে একমাত্র অ্যাড. আ. বাসেত মজুমদার ছাড়া। ক্ষমতাসীনদের সাথে মনস্তাতিক দ্বন্দের কারণে সুপ্রীম কোর্টের বারের দুই বার নির্বাচিত সভাপতি ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ ভোট দিতে পারেননি। কারণ তার অজান্তেই ভোটটি চট্টগ্রাম বারে ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়েছিল। এমননিভাবে সুপ্রিম কোর্টের অনেক সিনিয়র আইনজীবী ভোট দিতে পারেননি, যদি তা সম্ভব হতো তবে বার কাউন্সিলের রিজাল্ড সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের মতোই হতো যেখানে ক্ষমতাসীনদের ভরাডুবি হয়েছে।

সরকারের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে মনে হয় যে, তারা (সরকার) বিএনপিবিহীন আর একটি নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপার্সনের সাজা ও জামিনের কাহিনী, অসংখ্য নেতাকর্মীদের নামে ডজন ডজন মামলা, পুলিশের মতো আদালতকে নিয়ন্ত্রণ, সকল নির্বাচনে হরিলুট, প্রধান বিচারপতিকে দেশত্যাগের বাধ্য করাসহ প্রশাসনে সার্বিক দলীয় করণ প্রভৃতি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন ও কলকাতা মনস্ক বুদ্দিজীবীদের লাগামহীন প্রচারের মাধ্যমে ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তিই দেশে ঘটতে যাচ্ছে।

লেখক : কলামিস্ট, আইনজীবী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত