প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘গম আছি, দেশত আর ন যাইউম’

ডেস্ক রিপোর্ট: আছিয়া বেগম (ছদ্মনাম), বয়স ১৮ কি ১৯। গত আগস্টের শুরুর দিকের এক ভয়ংকর সকাল কেড়ে নেয় তার জীবনের সব স্বস্তি। সেদিন তাদের বাড়িতে হানা দেয় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জনা বিশেকের একটি দল, সঙ্গে আরও কয়েকজন স্থানীয় মগ। দলে দলে ভাগ হয়ে গুলি করে মেরে ফেলে তার বড় ভাই আব্বাসকে (৩০)। একদল তাদের ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়, অন্য আরেকদল তার ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন।

২৩ মে (বুধবার) উখিয়া শরণার্থী শিবিরের ছোট্ট অন্ধকার ঘরে আছিয়ার মা কান্নাভেজা ধীর কণ্ঠে সারাবাংলার প্রতিবেদকদের কাছে এভাবেই সেদিনের ঘটনার তুলে ধরছিলেন। এ সময় তার পাশেই ভাবলেশহীন শূন্য দৃষ্টিতে বসেছিলেন ধর্ষণের অন্তঃসত্বা মেয়েটি।

ক্যাম্পে সন্তানদের নিয়ে দাঁড়িয়ে এক রোহিঙ্গা নারী। চূড়ান্ত সহিংসতার অভিজ্ঞতার মুখে প্রাণ বাঁচাতে এ দেশে এসেছেন তারা

আছিয়ার মা বলেন, ‘দুই মেয়ের হাত ধরে এক কাপড়ে প্রতিবেশীদের সাথে পালিয়ে ছিলাম। কখনো দৌড়ে, কখনো হেঁটে, কখনও নৌকায় চড়ে কয়েকদিনের পথ পাড়ি দিয়ে এ দেশে আসি। কয়েকদিন পর মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলে শিবিরে।’ তবে এর মাসখানেক পরই যেন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, যেদিন বুঝতে পারেন তার অবিবাহিত মেয়েটি অন্তঃসত্বা।

লজ্জা আর ভয়ে বিষয়টি প্রথম দিকে লুকিয়ে রাখলেও পরে অনেকেই টের পেয়ে যায়। মাসখানেক আগে মেয়েটি রক্ত স্বল্পতার কারণে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন মাঝিদের (রোহিঙ্গা দলনেতা) সহযোগিতায় ভাম্যমাণ মেডিকেল টিম তাদের ব্লকে আসে। হাসপাতালে ভর্তি হতে বললেও উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ আর দূরত্বের কারণে তা সম্ভব হয়নি। মেডিকেল টিমের ফোন নম্বর নিয়ে রেখেছেন। কিন্তু যেকোনো সময় প্রসব বেদনা উঠলে কিভাবে সামাল দেব্নে, তা নিয়েই শঙ্কায় আছেন আছিয়ার মা।

পাহাড়ি পথ বেয়ে ত্রাণ নিয়ে ক্যাম্পের ঘরে ফিরছেন এক রোহিঙ্গা নারী

আছিয়ার দিকে তাকাই। খুব ভালো করে খেয়াল না করলে বোঝাই যাবে না যে ১৮-১৯ বছরের মেয়েটি অন্তঃসত্বা। হাড় জিরজিরে শরীর, চোখের নিচে কালচে দাগ। পাশের ঘরের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম জানালেন, কারো সাথে কথা বলে না আছিয়া।

সুফিয়া বলেন, ‘দুই মেয়ে আর মায়ের সংসারে বড়ই অভাব। মাছ-মাংস কিনে খাবার সামর্থ্য নাই। সেদিন আমার ঘরে একটু শুঁটকি মাছ রান্না করেছিলাম। সেখান থেকেই একটু দিয়েছিলাম।’

আছিয়ার মা বলেন, ‘প্রতিদিন পানি ভাত আর শাক ভাত কিংবা ডাল খেতে খেতে তার নিজেরই অরুচি ধরে গেছে। এমন সময়ে মেয়েটা কেমন করে এসব খায়।’ আবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, বিধবা হলেও মিয়ানমারে ভালোই ছিলেন। চাষের জমি ছিল, বড় ছেলেটি ছোট একটা চাকরি করত। হাতের কাজ করত দুই মেয়ে।

তবে কি নিজের দেশে ফিরতে চান— জানতে চাই আছিয়ার মায়ের কাছে। কিছুক্ষণ চুপ হয়ে থাকেন। তারপরের উত্তরটা অবশ্য স্পষ্ট— ‘শত কষ্টের পরও এ দেশত গম (ভালো) আছি, নিরাপদ আছি। ওই বর্বরদের দেশত ন যাইউম (যাব না)।’

সব হারিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঠাঁই পাওয়া এক নারী; আছিয়ার মায়ের মতো তিনিও হয়তো আর ফিরতে চান না রাখাইনে

তার পরিবারের সাথে যে নিষ্ঠুরতা আর বর্বরতা হয়েছে, তার বিচার চান কিনা— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিচার অবশ্যই চাই।’

অবিবাহিত মেয়েটির কোলজুড়ে যে শিশু আসবে তাকে কিভাবে পালন করবেন, তার মেয়েই বাচ্চাটাকে মেনে নেবে কিনা— এমন হাজারও প্রশ্ন আর দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম চলে গেছে, বলেন আছিয়ার মা।

আছিয়ার মায়ের মতো যারা তাদের নিজের দেশে সেনাসদস্যদের হাতে স্বামী-সন্তান হারিয়েছেন, তারাও আর ফিরে যেতে চান না মিয়ানমারে— এমনটাই জানালেন উখিয়া ক্যাম্পে কাজ করা রেড ক্রিসেন্টের একজন স্বেচ্ছাসেবক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই স্বেচ্ছাসেবক বলেন, মিয়ানমারে ধর্ষণ আর নির্যাতনের শিকার ছেলে বা মেয়ে কেউই আর তাদের দেশে ফেরাটা নিরাপদ মনে করছে না। সূত্র: সারাবাংলা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত