প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কালের খেয়া
এসব কাহিনী

ডেস্ক রিপোর্ট:  এসব কাহিনী বলতে গেলে নিজের কাছেই অবাক লাগে। আমি কীভাবে ওইসব বৈরী পারিস্থিতির ভেতর দিয়ে একদিন বেরিয়ে এসেছিলাম- এ কথা ভেবে। একাত্তরের বিশাল সেই মুক্তিযুদ্ধ আমাকে দেহ-মনে ক্লান্ত করে ফেলেছিল বিজয়ের আনন্দ হৃদয়ে ধারণ করার পরও। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু বা অপমানের ভয় আমাকে ক্লান্ত করে তুলেছিল সেই নয় মাস। নয় মাসব্যাপী সেই মুক্তিযুদ্ধে আমার প্রতিদিনের দিনগত পাপক্ষয় কাহিনী, স্বামীকে শত শত মাইল দূরে নিরাপদে পাঠিয়ে দেবার পরও তাঁকে নিয়ে দুশ্চিন্তা, লন্ডনের পথে পথে তার দিন যাপন, টাকাপয়সার ক্রমাগত অনটন আমাকে ভেতরে ভেতরে যেন বিধ্বস্ত করে তুলেছিল। অথচ বাইরে থেকে আমি ছিলাম নীরব, নির্বিকার। তারপর দেশ স্বাধীন হলে দিনের পর দিন মাসের পর মাস অপেক্ষায় থাকা- কবে বিলাতের মাটিতে সৈয়দ হক একটা চাকরি জুটিয়ে আমাদের বৈধভাবে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে পারবেন। উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষাও কি আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল না? বয়স হয়ে যাচ্ছে, অথচ কোনো পোস্ট গ্র্যাজুয়েট আয়ত্ত করতে পারছি নে- সেটাও তো একটা দুশ্চিন্তা বটে। বাবা-মা একবার জ্ঞানের প্রদীপ মনের ভেতরে জ্বালিয়ে দিলে কে পারে তাকে রোধ করতে? সুতরাং সেটাও একটা সমস্যা ছিল বটে। সর্বক্ষণ মনের ভেতরে গুনগুন করে ফিরত- বেলা যে চলে যায়, মন্দিরে তো পৌঁছানো হলো না!

অবশেষে যখন ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখতে পারলাম, স্বামীর মুখে শুনলাম, ডাক্তার হলেও নাকি সেখানে চাকরি করা যাবে না; যেহেতু সেদেশে চাকরি করতে গেলে একটা ট্রেনিং দরকার। কতটা ইংরেজি জানি, কীভাবে রোগীর সঙ্গে কথা বলি, কীভাবে প্রেসক্রিপশন লিখি, কতখানি সপ্রভিত- সব মিলিয়ে একটা অ্যাসেসমেন্ট।

শুনে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। এতদিন জানতাম, আমি খুব স্মার্ট। কারণ পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে বছরের পর বছর চাকরি করেছি, ট্রেনিং করেছি। লেফ্‌ট-রাইট করেছি। ডাক্তারিতেও ভালো। কারণ আমার রোগীরা আমার প্রতি সন্তুষ্ট।

কিন্তু না। সেসব কোনো কথা না। আমাকে যেতে হবে লন্ডন ছাড়িয়ে শেফিল্ডে, সেখানে নর্দার্ন জেনারেল হাসপাতালে প্রশিক্ষণ নিতে। এক মাস থাকতে হবে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে তাদের বাবার কাছে ছেড়ে যেতে হবে। বিষম সংকটে পড়ে গেলাম। কিন্তু আমার পাগল স্বামী একভাবে বলে যেতে লাগলেন, আরে, এটা কোনো সমস্যাই নয়। এক মাস দেখতে দেখতে পার হয়ে যাবে। আমিই ওদের এক মাস দেখেশুনে রাখতে পারব।

কীভাবে? আমি করুণ চোখ তুলে বললাম।

তিনি বললেন, সক্কালবেলা ওদের ঘুম থেকে তুলে হাত-মুখ ধুইয়ে কর্নফ্লেক্স খাইয়ে সোজা স্কুলে ছেড়ে দিয়ে আমি বিবিসিতে চলে যাব। তারপর ওরা প্রতিবেশীর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসবে। বিদিতার গলায় ঘরে ঢোকার চাবি ঝুলিয়ে দেব স্কুলে যাওয়ার আগে। ওরা ঘরে ফিরলে আমি টেলিফোন করে জানব ঘরে ফিরেছে কি-না। তারপর ঘণ্টা দুয়েকের ভেতরে আমি নিজে বাড়ি ফিরে আসব। বাড়ি এসে ওদের গোসলে পাঠাব। বাথ-এ পানি ছেড়ে দিলে ওরা নিজেরাই গোসল সেরে নেবে। এই ফাঁকে আমি টপ করে ওদের জন্যে রান্নাটা করে ফেলব। বিফ বার্গার বা ফিশ ফিঙ্গার। আর তার সাথে পটেটো চিপস্‌। তারপর ওরা বেরোলে ওদের গা মুছিয়ে রাতের জামা-কাপড় পরিয়ে দিয়ে ডিনার খেতে দেব। তারপর ওদের বিছানায় পাঠিয়ে আমি নিজে খেয়ে নিয়ে কিচেন টেবিলে বসে তোমাকে টেলিফোন করে সারাদিনের ফিরিস্তি দেব। তারপর এক কাপ কফি তৈরি করে আমি লিখতে বসব!

তাঁর এত ফিরিস্তি শোনার পরেও আমার মন সায় দেয় না। একবার ভাবি, এ বছর আর যাব না ট্রেনিং করতে; পরের বছর যাব। কিন্তু সৈয়দ হক মাথা নেড়ে বলেন, না। এখনই যেতে হবে। কারণ খুব শিগগির এরা এখানে ভীষণ কঠিন একটা পরীক্ষা সিস্টেম তৈরি করছে। সেই পরীক্ষা একেবারে এমবিবিএস পরীক্ষার মতো কঠিন। তুমি কি এত বছর পরে সেই পরীক্ষা আবার দিতে চাও?

তাঁর কথা শুনে আমার মুখ শুকিয়ে আমচুর! আবার সেই ছেলেবেলার এমবিবিএস পরীক্ষা? এখন কি আর মাথার ঘিলু সেভাবে সক্রিয় আছে? বাজারের হিসেব, ছেলেমেয়েদের পেসাব-পায়খানার কাঁথা, সংসারের দৈনন্দিন ঝামেলার ভেতরে সেই ঘিলুভর্তি মাথা কবে গোবরের ভাণ্ডে পারিণত হয়েছে! এখন আবার সেই অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি? না বাবা, আমাকে মাফ করতে হবে।

সৈয়দ হকই তাঁর অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাচ্চাদের আমাদের পারিবারিক বন্ধু মেরিলিন স্ট্যাফোর্ডের বাসায় রেখে, আমাকে নিয়ে শেফিল্ড রওনা হলেন। খুব সম্ভব চার ঘণ্টার মতো ট্রেন জার্নি। আমার পরনে সিল্ক্ক শাড়ি, যতদূর সম্ভব স্মার্টভাবে পরা, গায়ে কোট, যতদূর সম্ভব দামি (একজন ডাক্তার কম দামি কোট পরতে পারে না!), পায়ে দামি শু। এদিকে সংসার চালাতে সৈয়দ হক হিমশিম। কারণ তিনি বিবিসি থেকে প্রতি মাসে পান মাত্র ৫০টি পাউন্ড। সেই পাউন্ডের ১০ পাউন্ড খরচ করলেই লন্ডনের কোনো না কোনোখানে সারা মাসের জন্যে একখানা ঘর ভাড়া পাওয়া যায়। কিন্তু সৈয়দ হকের ব্যাপার আলাদা। তিনি এমন জায়গায় ঘর ভাড়া নিয়েছেন যেটা ইংরেজদের কাছেই মহার্ঘ্য, জায়গাটার নাম হ্যামস্টেড হিথ। যেখানে আমাদের বাসার পাশেই থাকেন এলিজাবেথ টেইলর এবং রিচার্ড বার্টন। এটা তাদের লন্ডন হোম। আর আমরা থাকি তাঁদের বাসার পাশেই। ভাগ্যের কী হাস্যকর পরিহাস!

সুতরাং ৫০ পাউন্ডের অর্ধেক চলে যায় ঘর ভাড়া দিতে। অবশ্য সেই ঘরে আছে একটি বসার জায়গা, সেই ঘরেরই এক পাশে ছোট্ট একটি কিচেন, দুটি বেডরুম, মাঝখান থেকে পার্টিশন করা; ঘরের সামনে, দরজার বাইরে আছে একটি বড় চাতাল। তারপর সিঁড়ি, সেই সিঁড়ি ডিঙিয়ে রাস্তাটা পেরুলেই ওপাশে বিশাল জঙ্গল বা হিথ। সেই জঙ্গলে পায়ে চলার সরু রাস্তা। রাস্তা দিয়ে চলার সময় দু’পাশ থেকে বনফুলের ঝাঁপি শরীর জড়িয়ে ধরে। রাস্তাটা এঁকেবেঁকে বহুদূর চলে গেছে। যেতে যেতে এক সময় তাকিয়ে দেখি, একটা সুন্দর পুরনো দিনের বাড়ি। আর সেই বাড়ির গায়ে লেখা- হিয়ার লিভ্‌ড ট্যাগোর। নাইনটিন ইলেভেন টু টুয়েল্‌ভ।

সুতরাং আমার সৈয়দ হকের এই জায়গাটাই পছন্দ, যেখানে অনতিদূরে বাংলার নয়নমণি কবিগুরু শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাস করে গেছেন তাঁর নোবেল প্রাপ্তির ঠিক আগে আগে।

এই স্থানে আরও কবি-সাহিত্যিকদের বসবাস। যতদূর মনে পড়ে কবি কিটস্‌ এবং আরও বড় ও নামকরা মানুষের পছন্দের জায়গা এই হ্যামস্টেড হিথ।

তো সৈয়দ হকের সঙ্গে ট্রেনে চেপে চললাম সেই শেফিল্ডে। নর্দার্ন জেনারেল হাসপাতালে যখন পৌঁছলাম, তখন হাসপাতালের ছুটি হবার পথে। অর্থাৎ বিকেল ৫টা। অফিসে রিপোর্ট করলাম আমি। কাগজপত্র দাখিল করলাম মনে মনে কাঁপতে কাঁপতে। ফরমালিটিজ সারতে সময় লাগল। তারপর একজন অফিসার গোছের কেউ আমাকে হাসপাতালের ভেতরেই একটা থাকার জায়গায় পৌঁছে দিয়ে হাসিমুখে বিদায় নিলেন। আমার হাতে দিয়ে দিলেন ঘর খোলার চাবি। পরদিন থেকেই আমার হাসপাতালের ডিউটি শুরু হবে।

হোস্টেল টাইপের সেই ঘরে আমি আর সৈয়দ হক ঢুকলাম। এক রুমের সুন্দর সাজানো একটি ঘর। পাশে অ্যাটাচড্‌ বাথ ও টয়লেট। ধবধবে শাদা বিছানা। ঘরের দেয়ালে পেইন্টিং। হুররে! মনে মনে বলে উঠলাম আমি। পুরো একটা মাস এই ঘর আমার দখলে। তাও বিনা পয়সায়। চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু মনের ভাব প্রকাশ করলাম না। তার কারণ, একজন গৃহিণী তার দুটি শিশু সন্তানকে স্বামীর কাছে পুরো একটি মাস ফেলে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, এটা সমাজের চোখে বিশেষ আদর্শিক কর্ম নয়। তার ওপর স্বামী তো আছেনই। কিন্তু আমার স্বাধীন সত্তা মনে মনে খুশি।

অথচ আসার আগে ট্রেনে বসে সৈয়দ হকের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করছিলাম পুরো একটি মাস তাদের ছেড়ে থাকতে হবে বলে। আর উত্তরে সৈয়দ হক শুধু ধমক মেরে বলছিলেন, আরে, ছেলেমানুষী করছ কেন? বিদেশে কি মানুষ শুধু স্ম্ফূর্তি করতে আসে? কিছু কাজ করতে হবে না?

এখন সেই কাজ করতে এসে আমার মনে খুব স্ম্ফূর্তি হচ্ছে। সব দেখেশুনে সৈয়দ হককে বললাম, তাহলে তুমি এখন যেতে পার। বাচ্চারা একা আছে।

কিন্তু দেখি সৈয়দ হক এখন চনমন করছেন! তিনি যেতে চান না, যেন আমাকে এখানে এই বিরান অচেনা জায়গায় একা ফেলে রেখে যেতে তাঁর অনীহা। তিনি আমাকে নিয়ে বাইরে বেরোলেন। এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। সব শাদা মুখের মানুষ। কেউ ডাক্তার, কেউ নার্স, কেউবা হাসপাতালের কর্মচারী।

এমন সময় আমরা তাকিয়ে দেখি একজন ইন্ডিয়ান মহিলা শাড়ি পরে হন হন করে হেঁটে হাসপাতালের দিকে যাচ্ছেন। তার গায়ে কোনো অ্যাপ্রন সেই। সৈয়দ হক যেন শাদার সমুদ্রে কালোর ডিঙি একটা ভেসে যেতে দেখলেন। ত্বরিতে সেই মহিলার গতিরোধ করে বললেন, মিস, মে আই টক টু ইউ?

ভদ্রমহিলা থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। ঘুরে তাকিয়ে বললেন, ইয়েস?

সৈয়দ হক মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, মে আই আস্‌ক্‌ ইউ সামথিং, ডু ইউ ওয়ার্ক হিয়ার?

মহিলা সদয় হয়ে বললেন, ইয়েস, আই হাভ স্টার্টেড টেকিং মাই ট্রেনিং হিয়ার। আই হ্যাভ কাম ফ্রম ইন্ডিয়া ফিউ মান্থস্‌ এগো।

তার কথা শুনে সৈয়দ হক যেন হাতে চাঁদ পেলেন। কৃতজ্ঞ স্বরে বললেন, আই অলসো থট সো, ডক। মাই ওয়াইফ হ্যাজ কাম টুডে টু ডু দি সেইম ট্রেনিং। নাও আই অ্যাম লিভিং মাই ওয়াইফ অল অন হার ওন। সো মে আই আস্‌ক ্‌ইউ টু কিপ ইন টাচ উইথ হার প্লিজ, ইফ পসিবিল?

ভদ্রমহিলা, হয়তো আমারই বয়সী হবেন বা আমার চেয়ে কিছু ছোট। সৈয়দ হকের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে হিন্দিতে বলে উঠলেন, জরুর, জরুর। আপ ফিক্‌র মাত কিজিয়ে!

তার কথা শুনে আমার লজ্জা লাগল। মুখে এত বড় বড় কথা বলে এখন আমাকে এখানে ছেড়ে যেতে তিনিই ইতস্তত করছেন!

মেয়েটির সঙ্গে পরে আমার বেশ সখ্য হলো। শুনলাম হেমা অবিবাহিত। তবু আমাকে সব সময় একটা সাহস দিয়ে রাখত। বাচ্চাদের জন্যে মন খারাপ হলে আমার সঙ্গে অনেক গল্প করত। একদিন হেমা বলল, আমি অনেক ভেবেচিন্তে এদেশে অ্যানেসথেসিয়া করতে এসেছি, বুঝলে? রাতদিন রোগী ঘাঁটাঘাঁটি করতে আমার ভালো লাগে না। তাই এই ট্রেনিংটা শেষ হলে আমি অ্যানেসথেসিয়ার জন্যে হাউস অফিসারের পোস্টে দরখাস্ত করব।

অ্যানেসথেসিয়াতে কেন? গাইনি অবস্‌-এ কেন নয়? মেয়েরা সকলেই তো দেখি এদেশে গাইনি অবসটেট্রিক করতে আসে। আমি কৌতূহলী হয়ে একদিন জিজ্ঞেস করলাম।

উত্তরে সে বলল, ওই যে বললাম। রোগী ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভালো লাগে না। রোগীরা ডাক্তারদের জান তিতো করে দেয়! তার চে’ এটা বেশ- রোগী অজ্ঞান করে তার মাথার কাছে বসে থাকব। আর অপারেশন শেষে চোখ খুলে আমাকেই সে প্রথম দেখবে। আর ভাববে, আমিই বুঝি তার অপারেশনটা করেছি! বলে হি-হি করে সে হাসল। হাসিটা ভারী নির্মল দেখাল।

আমি বললাম, আমার আবার রোগীর দরকার! আমি কথা বলতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছে, আমি গাইনি অবস্‌ করব। আর প্রতিবার বাচ্চা ডেলিভারি করার পর রোগীর আত্মীয়দের কাছ থেকে ভালো ভালো শাড়ি উপহার পাব! না চাইলেও পাব। কারণ এইটা একটা রেওয়াজ আমাদের দেশে।

আমার কথা শুনে ডাক্তার হেমা হাসল।

আমি বললাম, একবার দেশে আমার গাইনি ম্যাডামের কাছে একজন গর্ভবতী মহিলার স্বামী খুব দামি একটা শাড়ি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। আর আমার ম্যাডাম দাঁত খিঁচিয়ে তাকে মারতে উঠেছিলেন, এই বলে যে, আবার আপনি আমার জন্যে উপহার এনেছেন? কতবার আপনাকে বলেছি না- আমাকে কোনো উপহার দেবেন না? তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, শাড়ি পেলেই আমার রাগ ধরে, জানো? গ্রামের দাইদের কথা মনে হয়। বাচ্চা খালাসের পর তারা বাড়ির উঠোন ছাড়ত না, যতক্ষণ তাদের কোনো শাড়ি উপহার দেওয়া না হচ্ছে।

আমার কথা শুনে হেমা হেসে আকুল হতো। বলত, তুমি খুব মজা করে কথা বলো। তুমি কি লেখক?

এই কথা আমাকে ওদেশে ডাক্তারি করতে গিয়ে প্রায়ই শুনতে হতো। আরে আশ্চর্য, শেষে আমার রাগ ধরত মনে মনে। আমি যখন সাইকিয়াট্রির ওপর ট্রেনিং নিচ্ছি, তিন বছরের ফুল ট্রেনিং, তখন সেখানে সপ্তাহের ক্লিনিক্যাল মিটিংয়ের সময় আমার কেস প্রেজেনটেশন শুনে কনসালট্যান্টরা বলতেন, ডক্টর, তুমি তো কেস প্রেজেন্ট করলে না; একজন দুঃখী নারীর জীবনের বর্ণনা দিলে! আমরা তো এখানে কেস প্রেজেনটেশন করতে বসেছি! গল্প শোনার জন্যে নয়!

সেদিন সেই কনসালট্যান্টের কথা শুনে আমার কলিগরা মুচকি হেসেছিল। আর আমার খুব রাগ হয়েছিল। পরে অবশ্য খুব হেসেছি। সেই ভদ্রলোক তো আর জানতেন না যে আমি আদতেই কথাসাহিত্যিক। শুধু তাই না, ট্রেনিংয়ের খাতার পাতা ভর্তি করে আমার গল্পের ছক, কবিতার ছক কাটা আছে! খাতার এক পাশে মানুষের মাথার ঘিলুর ছবি আঁকা আছে, আরেক পাশে কবিতার আঁকাবাঁকা খসড়া।

এদিকে ট্রেনিং করতে গিয়ে গালে চড় খাবার মতো অবস্থা। একটাও ইংরেজি বুলি বুঝতে পারিনে। পেশেন্টদের কথা তো নয়ই, নার্সদের কথাও।এখন এই বিদঘুটে ইংরেজি বুলি বুঝে আমাকে রোগী দেখতে হবে, নার্সদের পরামর্শ দিতে হবে, মেডিকেল হিস্ট্রি লিখতে হবে!

চোখেমুখে অন্ধকার নেমে এলো আমার। দৌড়ে গিয়ে হেমাকে ধরলাম। হেমার ইংরেজি বুলি আমি যেমন বুঝি, আমার ইংরেজি বুলি হেমাও তেমনি বোঝে। আমাদের ইংরেজিতে কথাবার্তা বলতে মোটেও কষ্ট হয় না। আবার নার্সরা যখন কথা বলে তখন মাঝে মাঝে শুনি, তারা নিজেদের ভেতরে বলাবলি করছে- মঞ্জু, মঞ্জু, মঞ্জু!

এদিকে লন্ডনের মানুষদের ইংরেজি বুলিও দিব্যি বুঝতে পারি। অথচ এই ধাবধাড়া গোন্দিপুরের ইংরেজি কথা একটাও বুঝতে পারি নে। এটা অনেকটা যেন অক্সফোর্ডে যে ইংরেজ ভদ্রলোক উইলিয়াম রাদিচি বাংলা পড়ান এবং রবিঠাকুরের তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, তাঁকে যদি পুরান ঢাকার সাইনু পালোয়ানের মোরগ পোলাও খাওয়াতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ করতে বলা হয়, তাহলে তার যে অবস্থা হবে, আমারও ঠিক সেই অবস্থা।

আমি তো ভেবেই পাই না- ওয়ার্ডের নার্সরা আমার নাম ধরে এত কী বলাবলি করে! আর আমার ডাক নাম যে মঞ্জু, তাই বা তারা জানল কী করে!

আবার দৌড়লাম ডাক্তার হেমার কাছে। সে আমার চেয়ে আগে এই দেশে এসেছে। তার ট্রেনিংও এখন শেষের দিকে। তাই তাকে গিয়ে বললাম, হেমা, নার্সরা শুধু কথা বলার সময় আমার নাম ধরে কী সব যেন আলোচনা করে! এখানে আমার দুটো প্রশ্ন আছে। প্রথম প্রশ্ন- তারা আমার ডাক নাম জানল কী করে? আর দুই, আমার নাম ধরে আমার সামনেই তারা কথা বলতে সাহস পায় কী করে?

হেমা আমার কথা শুনে হেসেই অস্থির। বলল, ওরে বোকা মেয়ে, ওরা তো তোমার নাম ধরে কথা বলে না। ওরা নিজেদের ভেতরে যখন কথা বলে, তখন কথার রেশ ধরে প্রথমে বা শেষে বলে, মাইন্ড ইউ! সেটা এদের লোকাল ভাষায় শোনা যায়, মাইঞ্চু! যার মানে হচ্ছে, মনে রেখো বা জেনো রেখো বা বুঝলে।

আর তুমি মাইঞ্চুকে ভাবছ মঞ্জু!

আসলে জানো, ওরা আমাদের বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিংয়ে পাঠায় ওদের দেশ ও মানুষ এবং ওদের আঞ্চলিক ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে। নইলে ওরা কি আর জানে না- ওদের লেখা বই পড়েই তো আমরা ডাক্তারি পাস করেছি এবং রোগী চিকিৎসা করতে শিখেছি।

তো এক মাস মানে চার সপ্তাহ ট্রেনিং শেষে যখন বাড়ি ফিরে এলাম; একাই, তখন মেরিলিন স্ট্যাফোর্ড মহিলার জন্যে ঢাউস একটা চীনামাটির ফুলদানি কিনে নিয়ে এলাম। মহিলা এই চার সপ্তাহের প্রতিটি শনি ও রবিবার আমার বাচ্চাদের পার্কে বা চিড়িয়াখানায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

তারপর আবার সেই হ্যামেস্টেড হিথ।

সৈয়দ হক আমাকে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ট্রেনিং কেমন হলো, মঞ্জু?

আমি হেসে বললাম, পানির মতো সহজ! আরে এটা কোনো ট্রেনিং নাকি? শুধু শুধু সময় নষ্ট!

কিন্তু মনে মনে ভয়ে থাকলাম। শেফিল্ড থেকে এক সপ্তাহ বাদেই আমার সেই কনসালট্যান্টের লিখিত রিপোর্ট এসে পৌঁছবে। সেই রিপোর্ট যদি সৈয়দ হকের হাতে পড়ে তাহলে আমার দফারফা। সব প্রেস্টিজ পাংচার। কত ডাক্তারকে দেখেছি দু’বার করে ট্রেনিংয়ে পাঠায়!

ঠিক তাই। এক সপ্তাহ বাদেই মোটা খামে করে আমার অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট হ্যামস্টেড হিথের বাসার ঠিকানায় পৌঁছে গেল। সৈয়দ হকের চোখের আড়ালে সেই রিপোর্ট দুরু দুরু বুকে খুলে দেখলাম। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস হলো না! রিপোর্ট ভালো। আমার ইংরেজি কথা বলা ভালো, ব্যবহার বেশ ভালো, ডাক্তারি জ্ঞানও মন্দ নয়। তবে রোগীকে আরও বেশি সময় দিয়ে দেখতে বলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গর্বভরে এবার রিপোর্ট সৈয়দ হকের হাতে তুলে দিয়ে বললাম, আমি জানি তো এসব অ্যাসেসমেন্ট এমন কিছু গুরুতর নয়। তবে একটা ঝামেলা মিটে গেল, এই আর কি!

এর পর শুরু হলো শুধু চাকরির জন্যে অ্যাপলিকেশন ছাড়া। একের পর এক। যেন চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত প্রাণে শান্তি নেই। ঘর-সংসার আর ভালো লাগে না! শুধু হাসপাতালের পরিবেশ খোঁজে মন। হাসপাতালের ফিনাইল, লাইজল, রেক্টিফায়েড স্পিরিটের একটা গন্ধ আছে। সেই গন্ধ নাকে না গেলে মনে হয়, আমি আর ডাক্তার না!

এদিকে বাচ্চারা স্কুলে আর সৈয়দ হক অফিসে চলে গেলে আমার খুব একা লাগে। বিশেষ করে শেফিল্ড থেকে ট্রেনিং করে আসার পর শুধু একা লাগে। মনে হয়, আমি সময়ের অপচয় করছি। এভাবে বাড়ি বসে বসে শুধুই সময়ের অপচয়। আজ কতদিন আমি বাসায় ঠায় বসা। কোনো কাজ নেই। শুধু সংসার। শুধু সংসার তো আমার কোনোদিন ভালো লাগেনি!

এই সময় একদিন সৈয়দ হক বললেন, শোনো, বাসায় সারাদিন বসে না থেকে ট্রাফালগার স্কোয়ারে ন্যাশনাল গ্যালারিতে গিয়ে ছবি দেখে আসো। শুনেছি, মডার্ন ছবির একটা এক্সিবিশন চলছে।

তার কথামতো চললাম ন্যাশনাল গ্যালারিতে ছবি দেখতে। ছবি দেখতে গিয়ে অবাক। দেখি, গ্যালারির বিশাল মেঝের একটা অংশজুড়ে মেঝেতে বালু ছড়িয়ে হাবিজাবি কিছু জিনিস পড়ে আছে। একটা দড়ির ফাঁস, একটা লোহার আংটা, কিছু দলা পাকানো ছেঁড়া কাগজ, এ রকম আরও হাবিজাবি। জায়গাটা আবার ঘেরা আছে বালির বাঁধ দিয়ে। আমি সেই বালির ওপর পা হড়কে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলাম।

আমার মুখ দিয়ে অস্ম্ফুটে বেরিয়ে এলো- মাই গড, হোয়াটস্‌ দিস?

একজন মাঝবয়সী ইংরেজ আমার দিকে তাকিয়ে একটু করুণা করে যেন বললেন, মাই ডিয়ার, দিস ইজ এ্যা স্কাল্পচার!

থমকে গিয়ে পা সরিয়ে আমি মনোযোগ দিয়ে সেই স্কাল্পচারের দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি হাসতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলাম। কী জানি, লোকে যদি আমাকে গাধা মনে করে! গাধারা কি আধুনিক শিল্পের মর্যাদা বোঝে?

এর পর আমি ঘুরে ঘুরে দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলো মন দিয়ে দেখতে লাগলাম। এক জায়গায় গিয়ে আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। দেয়ালে ঝোলানো আছে একটা পেইন্টিং। একটি যুগলের শারীরিক অবয়ব থাকলেও তাদের মাথার ভেতরটা শুধু আকাশের মেঘ দিয়ে ভর্তি। তাদের নাক-চোখ-মুখ কিছু নেই, শুধু মাথার অবয়ব। আর আছে মেঘ।

আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মাথার ভেতরে যেন কেমন করে উঠল! হঠাৎ আমার সৈয়দ হকের কথা মনে হলো। হায় আল্লাহ! এই লোকটা সারাদিন অফিসে খাটুনি করে এসে আবার বাসায় ফিরেই তার লেখা নিয়ে বসে। তার আগে আমার আর বাচ্চাদের খোঁজ-খবর নেয়। আমার রান্নায় সাহায্য করে। বাচ্চাদের গোসল করিয়ে তাদের রাতের জামা-কাপড় পরিয়ে তাদের খাইয়ে বিছানায় পাঠায়। আমিও নতুন ওই দেশে গিয়েছি বলে আমারও সব কাজ করে দেয়। কিন্তু কোনোদিন তার অফিসের গল্প করে না। কোনোদিন কাউকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করে না। অথচ সর্বক্ষণ তার মুখে হাসি থাকে। কত রকমের গল্প করে সে। তার ছেলেবেলা, তার মা-বাবা, তার ভাইবোন, তার যৌবন, তার বন্ধুবান্ধব। কিন্তু কাউকে বিদ্রূপ করে কথা বলে না। কাউকে ছোট করে না।

কখনও বা তার কথা শুনে আমি আর বাচ্চারা হেসে কুটি কুটি হই, কিন্তু সে হাসে না, মজা দেখে।

আমি কতভাবে তাকে চাপ দিই, আমার কিচ্ছু হচ্ছে না বলে। সে সব সময় বলে, হবে, হবে, সব হবে। একবার যখন মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোর হাত থেকে বেঁচে গেছি, নতুন একটা দেশ পেয়েছি, তখন আমাদের সবই হবে!

শুধু কাজ করে যাও। কাজেই মানুষের আনন্দ।

তখন সেই দুপুর বেলা ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারির ভেতরে দাঁড়িয়ে মেঘভর্তি মাথা দুটোর দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, আমার আর সৈয়দ হক; দু’জনের মাথা ভর্তি হয়ে আছে এই মেঘে। এই মেঘ তো শুধু মেঘ নয়, এ হচ্ছে মানুষের ভেসে বেড়ানো স্বপ্ন, তার আকাঙ্ক্ষা, তার দিগন্তের হাতছানি, তার অবয়বহীনতার ভেতরেও অবয়ব গড়ে তোলার সাহস।

এই মেঘ তো সাধারণ মেঘ নয়!

বাসায় ফিরে এসে সেদিন চার চোখে-মুখে আনন্দ উপচে ফেলে সৈয়দ হকের কাছে যখন সেই এক্সিবিশনের ফিরিস্তি দিচ্ছিলাম, তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিলেন।

আমি আদুরে গলায় বলে উঠলাম, আমাদের দু’জনের মাথা ভর্তি হয়ে আছে এই মেঘে, তাই না? তুমি কী বলো?

উত্তর না দিয়ে তিনি জোরে হেসে উঠলেন। সূত্র: সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত