প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেন এই লাঞ্ছনা!

ডেস্ক রিপোর্ট: মাদ্রাসার জমি দখলে বাধা দেওয়া এবং ব্যবস্থাপনা কমিটিতে জায়গা না পেয়ে গত ১১ মে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া গ্রামের মাদ্রাসার সুপার মো. আবু হানিফের মাথায় প্রকাশ্যে মল-মূত্র ঢেলে দেয় স্থানীয় জাতীয় পার্টির নেতা জাহাঙ্গীর মৃধা ও মাসুম সরদারের লোকজন। এর আগে ২০১৬ সালের মে মাসে নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে স্থানীয় সাংসদের নির্দেশে কান ধরিয়ে ওঠ-বস করানো হয়েছিল। ২০১৬ সালের সেই ঘটনার প্রকৃত বিচার হয়নি। উল্টো, শ্যামল কান্তি ভক্তকে ঘুষের টাকা নেওয়ার অভিযোগে কারাগারে যেতে হয়েছিল। শুধু যে শ্যামল কান্তি ও আবু হানিফকেই এমন ন্যক্কারজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে, তা কিন্তু নয়। প্রায় প্রতি মাসেই কোথাও না কোথাও এমন ঘটনা ঘটছে। সব ঘটনার ভিডিও বা সঠিক প্রমাণ না থাকায় তা সামাজিক মাধ্যম বা গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে না। যেমন, গত মাসে কুষ্টিয়ার মিরপুরে চাঁদা না দেওয়ায় প্রধান শিক্ষককে থাপ্পড় মেরেছিল ওই স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি। বহু ঘটনার দু’এক বিষয়ে আমরা অবগত হই। বেশিরভাগই চাপা পড়ে যায়। কিন্তু, কষ্টের বিষয় এই যে, যে দু-একটি ঘটনা আমরা জানি, তার বিচার হয় না। নারায়ণগঞ্জের স্কুলশিক্ষককে লাঞ্ছনার পর যদি সত্যিকারের বিচার হতো তাহলে হয়তো আজ আবু হানিফকে প্রকাশ্যে এমন ন্যক্কারজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো না। কেননা, বিচারহীনতাই অপরাধীদের অপরাধ করতে অনুপ্রাণিত করে। তবে এবার আশার কথা এই যে, দ্রুত সময়ে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং গ্রামবাসী একজনকে ধরিয়ে দিয়েছেন।

বলা হচ্ছে, আবু হানিফের সঙ্গে এই ন্যক্কারজনক কাজটি করা হয়েছে দুটি কারণে। প্রথমটি, মাদ্রাসার জমি দখলে তিনি তাদেরকে বাধা দিয়েছেন এবং অন্যটি, ব্যবস্থাপনা কমিটিতে তাদের স্থান দেওয়া হয়নি। এই ব্যবস্থাপনা কমিটি বর্তমান স্কুল-কলেজের ওপর একটি বিষফোঁড়া। সময়ের পরিক্রমায় এসব কমিটি দুটি রূপ ধারণ করেছে। আমি যখন ছোট তখন দেখতাম- গ্রামের স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতিসহ অন্যরা নিজের কাজ-কর্ম বন্ধ রেখে সারাদিন কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান তুলতেন। যাদের বাঁশবাগান আছে তাদের কাছ থেকে একটি করে বাঁশ চাইতেন স্কুলের বেড়া বা ছাউনি দেওয়ার জন্য। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে তাদের পিছু পিছু ঘুরতাম আর এগুলো দেখতাম। গ্রামের স্কুলের উন্নয়নের জন্য গ্রামের মানুষ খুব আগ্রহের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা করতেন; সঙ্গে আশীর্বাদও করতেন এমন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ততার জন্য।

সময়ের পরিক্রমায় গ্রামের একটি স্কুল থেকে লেখাপড়া শেষে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছি। প্রসঙ্গক্রমে বলছি, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত আমার স্কুল এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি। আমাকে যারা লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন, সেই মহান শিক্ষকদের আমি দেখেছি অর্থাভাবে অন্যের জমিতে কাজ করতে। দেখেছি তাদের শ্রমিকের কাজ করতে; শিক্ষকতা ছেড়ে বিদেশে যেতে। যেদিন প্রথম দেখেছিলাম আমার শিক্ষক অর্থের জন্য অন্যের জমিতে কাজ করছেন; সেদিন খুব কেঁদেছিলাম এই বলে যে, কী হবে লেখাপড়া করে!

যাই হোক, সেই স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি আর আগের জায়গায় নেই। গ্রামের যারা মাতব্বর তারাই এখন স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে জায়গা করে নেয়। খুঁজলে হাজার হাজার প্রমাণ মিলবে যে, নিজে তার নামটি পর্যন্ত স্বাক্ষর করতে পারে না অথচ সে স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য। কারণ সে স্থানীয় পর্যায়ে আর্থিক বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। বর্তমানে ব্যবস্থাপনা কমিটির পদগুলো খুবই লোভনীয়। আগে আরও বেশি ছিল! তবে সেটা সম্মানের জন্য নয়! টাকা কামানোর জন্য। আগে তারা শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবই নিয়োগ দিতে পারত। এখন শুধু কর্মচারী ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারে। এ জন্য অবশ্য সরকারের প্রতি তারা খুবই বিরক্ত। কেননা, সরকার তাদের বিনা পুঁজির ব্যবসায় লাগাম টেনেছে। এমনকি সরকার যেন এই সিদ্ধান্ত না নেয়, সে জন্য সংসদেও কথা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার তাদের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে একটি মহৎ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন স্কুলের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ নিবন্ধন পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। ফলে যারা প্রকৃত মেধাবী তারাই শিক্ষকতায় আসার সুযোগ পাচ্ছেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থী ও রাষ্ট্র দুই-ই উপকৃত হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের সব নিয়োগের বিষয় যদি সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই স্কুল-কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে প্রবেশের ইচ্ছা তাদের কমে যাবে।

নিজে দেখেছি স্কুল কমিটির সভাপতিসহ অন্যরা কত নীচু পর্যায়ে নামতে পারে। একই সঙ্গে কিছু মহৎ হৃদয়ের সভাপতিকেও দেখেছি, সেটা হাতেগোনা। বর্তমানে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ বিক্রি হচ্ছে ১০-১৫ লাখ টাকায়, আর কর্মচারীর পদ ৫ থেকে ৮ লাখ টাকায়। যদি টাকা প্রদান না করা হয় তাহলে স্কুল কমিটির সভাপতির রাজনৈতিক গুরু বলে দিলেও চাকরি হয় না। এমনকি এটাও দেখেছি, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদের নেতা সুপারিশ করার পরও কর্মচারী পদে চাকরি হয়নি। কেননা, সে সভাপতিকে টাকা দেয়নি। এটি শুনে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাও তার কর্মীর কাছে অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছেন। আমার দুর্ভাগ্য, এমন কয়েকটি ঘটনার কথা আমি শুনেছি এবং বাস্তবে তার প্রমাণও পেয়েছি। যে টাকা দিয়েছে তারই চাকরি হয়েছে। এসব কারণেই হয়তো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছিলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নৈশ প্রহরী নিয়োগ দিয়ে যারা টাকা নেয় তেমন নেতার প্রয়োজন তাদের নেই। স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি স্কুলের সম্পদকে নিজের অর্জিত হালাল সম্পদ ভেবে যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই ব্যক্তিগত কাজে লাগায়। কেউ বাধা দিলে তাদের পরিণতি হয় আবু হানিফের মতো।

যেহেতু আবু হানিফ এই বড় লাভের একটি পদ থেকে তাকে বঞ্চিত করেছেন তাই তার সঙ্গে এই বর্বর কাজটি করা হয়েছে। সরকারের বড় বড় অর্জনে আমরা তরুণরা সাহস পাই, সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পাই। কিন্তু যখন দেখি আমাদের শিক্ষাগুরুদের সঙ্গে এমনটি করা হচ্ছে তা মেনে নিতে পারি না। আবার যখন দেখি এগুলোর বিচারও হচ্ছে না তখন আর সহ্য করতে পারি না। তাই তো নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পর সারাদেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থী কান ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমন ক্ষুুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা সরকারের সাফল্যগুলো ম্লান করে দেয়। তাই সরকারের উচিত দল-মত নির্বিশেষে এসব অপরাধীকে কঠোর হাতে দমন করা। কথায় আছে- ‘লাখ টাকার বাগান খায় এক টাকার ছাগলে।’ এমন কিছু হচ্ছে না তো?

যারা আবু হানিফের মাথায় মল-মূত্র ঢেলেছে তারা ব্যক্তি আবু হানিফের মাথায় তা ঢালেনি। তারা জাতির বিবেক, সর্বোপরি এই সমাজের মাথায় মল-মূত্র ঢেলেছে। অপরাধীরা এতই ক্ষমতাবান যে, রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না বা ইচ্ছা করেই নেয় না। এ জন্যই হয়তো এমন বর্বরতার শিকার হওয়ার পরও মাদ্রাসার সুপারের সাহস হয়নি তা পুলিশকে জানানো। সে কারণেই সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত এমন কুলাঙ্গারদের সামাজিকভাবে বর্জন করা, ঘৃণা করা ও তাদের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলা। সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষ যদি তাদের বর্জন করে, ঘৃণা করে, সেটাই হবে তাদের শাস্তি আর আমাদের সান্ত্বনা। এই কাজটুকুও যদি আমরা না করি, একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে নিজেকে দাবি করা সমীচীন হবে না। সূত্র: সমকাল

প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত