প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঢাকায় চার কৃষক সংগঠনের সংবাদ সম্মেলন
অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠির ডাটা ব্যাংক তৈরী’র দাবি

মতিনুজ্জামান মিটু : অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠির ডাটা ব্যাংক তৈরী, কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রবর্তন ও কৃষকের ব্যাংক একাউন্ট খোলার ব্যবস্থা ফের চালু করাসহ ২২ দফা দাবি জানিয়েছে চারটি কৃষক সংগঠন। আসন্ন জাতীয় বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি বাড়ানোর দাবিতে বুধবার রাজধানীর ২৩/২ তোপখানা রোডের কমরেড নির্মল সেন মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন, বাংলাদেশ কিষাণী সভা, বাংলাদশ ভুমিহীন সমিতি ও বাংলাদেশ আদিবাসী সমিতি যৌথভাবে এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে।

সংবাদ সম্মেলনে ২২ দফা দাবি তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ভুমিহীন সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুবল সরকার। বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি বদরুল আলমের সভাপতিত্বে এসময় উপস্থিত ছিলেন, জায়েদ ইকবাল খান, মুখলেছউদ্দিন শাহীন, অমলি কিসকু, সাবিনা ইয়াসমীন, রেহেনা বেগম, মিলি আক্তার, তাসলিমা বেগম। সুবল সরকার বলেন, বাজেটের আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। আসন্ন বাজেটে কৃষির জন্য ভর্তুীকি বাড়াতে হবে এবং ভর্তুকির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি পণ্যের লাভজনক মূল্য সুনিশ্চিতকরণের জন্য জাতীয় কৃষিপণ্য মূল্য কমিশন গঠন করতে হবে। ক্ষতিকর বিদেশী বীজ আমদানি বন্ধ, বিটি বেগুন, গোল্ডেন রাইচসহ বিতর্কিত জিএমও কৃষি প্রবর্তন বন্ধ করতে হবে। কৃষি জমি অকৃষি খাতে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বীজের সার্বভৌমত্ব অর্জনে বিএডিসি কে আরো শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে। দেশীয় উন্নত জাতের বীজ সংরক্ষণ করতে হবে। কৃষককে বাঁচাতে নদী ভাংগন প্রতিরোধ এবং ভাংগনে ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসন করতে হবে। তৃণমুল কৃষক-ভূমিহীনদের চাহিদা ও দাবি বিশ্লেষণ করে অংশগ্রহনমূলক কৃষি বাজেট তৈরী করতে হবে। কৃষিতে নারী শ্রমিকের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম-মজুরীর ব্যবস্থার জন্য আইন তৈরী ও বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণকে বিবেচনায় রেখে কৃষকদের জন্য শস্যবীমা চালু করতে হবে। জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে মোট বাজেটের ১০ ভাগ বরাদ্দ দিতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ২০ভাগ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যক্ষ কর নির্ভর বাজেট প্রণয়ন করতে হবে, করের বিপরীতে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

কর্পোরেটসহ সকল কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়াসহ বহুজাতিক কোম্পানীর কর রেয়াত সুবিধার পুনঃমূল্যায়ন করতে হবে। কৃষকদেরকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রবর্তন ও কৃষকের ব্যাংক একাউন্ট খোলার ব্যবস্থা ফের করতে হবে। অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠির ডাটা ব্যাংক তৈরীর জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। চরাঞ্চলের মানুষের জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে তা যথাযথ ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচনের জন্য অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহীতা নিশ্চিত ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। সপ্তম পশ্চমবার্ষিকী পরিকল্পনায় জীবনচক্র ভিত্তিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর কার্যকর করতে হবে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাজেটে খাতভিত্তিক বিশেষ বরাদ্দ রাখাসহ বৈষম্যরোধে সমতাপূণ প্রবৃদ্ধির নীতি গ্রহন করতে হবে। কৃষকেরা যাতে ভেজাল বীজ, সার ক্রয়ে প্রতারিত না হয় তার জন্য কৃষি আদালত গঠন এবং বয়স্ক কৃষকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে।

বাংলাদেশ বৈশি^ক অর্থনীতির প্রান্তসীমায় অবস্থান করেও বর্তমানে অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধির পথে অগ্রসরমান একটি দেশ। সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের বিবিএস হিসাব অনুযায়ী ছিল ৭.২৮ শতাংশ। একই তথ্যসূত্রে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে ৩৭.৬ মিলিয়ন মানুষ দরিদ্রসীমার নীচে বসবাস করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক অগ্রগতি স্বত্তে¡ও সমাজে বিদ্যমান জীবনযাত্রার বৈষম্যক্রম ঊর্ধ্বমুখী। আয় ও সম্পদ বাড়ছে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের। কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের আয় ও জীবনমান কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বলা হচ্ছে দারিদ্র্যের হাস হ্রাস, শিক্ষার হার বৃদ্ধিসহ বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ১৬১০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে অসমতা বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্যের বিস্তার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়া, গণঅধিকার খর্বিত হওয়া, সাম্প্রদায়িক জঙ্গীর বিকাশ, বেকারত্ব ও মাদকের ছোবলসহ মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত, মৌলিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত লক্ষ লক্ষ মানুষ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, নানাবিধ প্রতিকুলতার ফলে সবার মাঝে নিরাপত্তাহীনতা বাসা বেঁধেছে। আস্থাহীনতার কারণে লুটেরা পুঁজিপতিরা নিজ দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে অর্থ পাচার করছে। বাংলাদেশ এলডিসি দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হলে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। স্বল্প সুদের যেমন ঋণ পাওয়া যাবে না তেমনি এলডিসি হিসেবে প্রাপ্ত বাণিজ্য সুবিধাও কমে যাবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য এখনই এ বছরের বাজেট পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। এডিবি বাস্তবায়নে বরাবরের মতো এবারও ব্যাকফুটে সরকার। চলতি অর্থবছরে প্রথম ৯ মাসে এডিবি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে মূল বাজেট ছিল ৪ লক্ষ ২৬৬ কোটি টাকা। আর চলতি ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট মূল বাজেট থেকে কমে হতে পারে ৫ লক্ষ কোটি টাকা। আগামী অর্থ বছরের বাজেটে রোহিঙ্গাদের আলাদা বরাদ্দের আশা করে কেন অর্থমন্ত্রী ? অত্যাবশ্যকীয় খাত বিশেষত: কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সকল ক্ষেত্রে বাজেট বৃদ্ধি ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যরের ও সেবাখাতের ভ্যাট হার কমিয়ে করের বিপরীতে সেবার মান উন্নত করার দাবি জানাচ্ছি। টেকসই কৃষি ও সবুজ প্রবৃদ্ধি, কৃষি উপকরণের যথাযথ ব্যবহার, শস্য এলাকীকরণ ও ভূমি ব্যবহার, পানি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, কৃষির বহুমুখীকরণ, উন্নত কৃষি চর্চা প্রচলন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, ভ্যালু চেইন এসকল বিষয়গুলোতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।

বর্তমান সরকারের কৃষি বিষয়ক নীতিগুলোর মধ্যে সমন্বয়, লিখিত নীতিগুলো তার প্রস্তাবিত কৌশল, কর্মসূচিগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং প্রস্তাবিত কৃষি কর্মসূচিগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন কৃষিতে বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে বৃদ্ধি করতে হবে। শুরুতে মহাজোট সরকার কৃষিখাতে বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম বাজেট বরাদ্দ করলেও ক্রমেই সে অবস্থান থেকে তারা পিছু হটেছে, যা অনাকাঙ্খিত-অগ্রহণযোগ্য-অযৌক্তিক। কৃষি খাতে বিনিয়োগ বরাদ্দ ও ভর্তুকী বৃদ্ধি অবশ্যই বাড়াতে হবে। কৃষকের বিশেষ করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে কৃষি সমবায় ও সংগঠন প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। অপরাপর উন্নত ও অগ্রসর উন্নয়নশীল দেশের মতো কৃষিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা ব্যাপকভাবে বাড়াতেই হবে। সংবিধানের ১৬ ধারায় নির্দেশিত ‘কৃষি বিপ্লবের বিকাশ’ নিশ্চিত করতে সামগ্রিক কৃষি ও ভূমি সংস্কার প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষিনির্ভও শিল্পের প্রভাব এবং তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন সত্তে¡ও এখনো দেশের প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষ কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে কৃষি জমি অনবরতভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত