প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সন্তানদের কেন কাওমী মাদ্রাসায় দিচ্ছেন অভিভাবকরা!

ডেস্ক রিপোট:  ঢাকার বেশ কিছু মাদ্রাসা ঘুরে দেখা গেল এসব জায়গায় ছাত্র-ছাত্রীরা এসেছেন মূলত পরিবারের ইচ্ছায়। তবে সাথে-সাথে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ইচ্ছাও ছিল কিছুটা। সে কথাই বলছিলেন একজন অভিভাবক শহিদুল্লাহ ভুঁইয়া তার চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে এক ছেলে ফ্যাশন ডিজাইনার, এক মেয়ে ডাক্তার এবং আরেক মেয়ে স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন। ছোট ছেলে তিনি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি চাই যে আমার একটা ছেলে হাফেজ হোক। আমি একজন হাফেজের বাপ হতে পারবো। তাছাড়া আমার ছেলে ইসলামের খেদমত করতে পারবে। এটাই হলো উদ্দেশ্য।” তবে বাংলাদেশের সমাজে অনেকেই আছেন যারা মনে করেন, তাঁর তিনটি সন্তান হলে একজনকে মাদ্রাসায় দেবেন।

মাদ্রাসা ছাত্রী শিফা আক্তার ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা মাধ্যমে পড়াশুনার পর কওমী মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছেন।  আক্তার বলেন, ” আমার আব্বু আগে স্কুল টিচার ছিলেন। তারপর ইসলামের দিকে ধাবিত হয়ে মাদ্রাসার শিক্ষকতায় যোগ দিলেন। আমার আব্বু চাইতেছিলেন যে আমি মাদ্রাসায় পড়বো। আর আমারও ইচ্ছা ছিল মাদ্রাসায় পড়ার।” এসব মাদ্রাসায় এতিম কিংবা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আধিক্য যেমন আছে তেমনি সমাজে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানরাও আছে, যারা চাইলে নিজের সন্তানকে ব্যয়বহুল শিক্ষা দিতে পারেন। অন্যদিকে সমাজে আরেকটি অংশ আছে যারা সাধারণ শিক্ষার খরচ বহর করতে পারেন না। ফলে কওমী মাদ্রাসা হয়ে উঠে তাদের জন্য একটি ভরসার জায়গা। তবে উভয় ক্ষেত্রেই ধর্মীয় প্রভাব একটি বড় কারণ হিসেবেই দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের চিন্তাধারা উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত- সবার মাঝেই দেখা যায় বলে উল্লেখ করেন রাশেদা চৌধুরী।

তিনি আরো বলেন, মূল ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা ধীরে-ধীরে ব্যয়বহুল হয়ে যাচ্ছে পরিবারগুলোর জন্য। প্রাথমিক শিক্ষায় সরকার ব্যয় করার পরেও ছাত্র-ছাত্রীদের পেছনে বহু টাকা ব্যয় করতে হয় অভিভাবকদের।”আমরা গবেষণায় দেখেছি, প্রাথমিক শিক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর পেছনে সরকার যে টাকা ব্যয় করে, তার দ্বিগুণ কখনো-কখনো তিনগুণ ব্যয় করতে হয় পরিবারগুলোকে। যেখানে মাদ্রাসাগুলোতে, বিশেষ করে কওমী মাদ্রাসাগুলোতে, কোন ধরনের ব্যয় বহন করতে হয় না। বিশেষ করে বিত্তহীন বা নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো পছন্দ করেন বা বেছে নেন। বাধ্য হয়ে বলা যেতে পারে,”বলছিলেন রাশেদা কে চৌধুরী। কওমী মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার সুযোগ পায়। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষই তাদের থাকা-খাওয়া এবং পড়াশোনার খরচ বহন করে।অনেক মাদ্রাসা আছে যেখানে নির্ধারিত কোন বেতন নেই। শিক্ষার্থীদের আর্থিক সচ্ছলতার উপর নির্ভর করে বেতন নেয়া হয়।

কওমী মাদ্রাসার সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোর্ড বেফাকের হিসেব অনুযায়ী ২০১৩ সালে বিভিন্ন শ্রেণিতে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা যেখানে প্রায় ৫৫ হাজার ছিল, ২০১৮ সালে সেটি দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু বেশ কয়েকটি মাদ্রাসা ঘুরে দেখা গেল, অর্থের উৎস সম্পর্কে এসব মাদ্রাসা পরিচালনাকারীরা একই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। ইসলাম বিষয়ক লেখক এবং গবেষক মাওলানা শরিফ মোহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের সবগুলো কওমী মাদ্রাসা সমাজের ভেতর থেকে অনুদান নিয়ে পরিচালিত হয়। “জুম্মার নামাজে অংশগ্রহণ করে এমন কোন ধার্মিক মুসলমান আপনি পাবেন না যার কওমী মাদ্রাসায় ১০ টাকার অংশগ্রহণ নেই। ১০ টাকা থেকে এক কোটি টাকা অনুদান দেবার মতো মানুষ এ সমাজে আছে,” বলছিলেন শরীফ মোহাম্মদ।

যে কোন শিক্ষা ব্যবসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কর্মসংস্থান কোথায় হবে। কিন্তু কওমী মাদ্রাসায় যারা পড়াশুনা করছেন, তারা কর্মসংস্থানের বিষয়টি নিয়েও তাঁরা খুব একটা চিন্তিত নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মনে করেন, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ যেসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আছে সেখানেই তাদের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। অন্যতম একটি বড় মাদ্রাসা জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামী আরজাবাদ-এর ছাত্র আজিজুর রহমান। তিনি ইসলামি উচ্চতর আইন গবেষণা শেষ করেছেন। তাঁর পড়াশুনা প্রায় শেষের দিকে। তিনি বলছিলেন, পড়াশুনা শেষ করে কর্মসংস্থানের বিষয়ে তার কী ভাবনা” শিক্ষকতাকে আমরা সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান মনে করি। সেই সাথে ইমামতি এবং আরো অনেক জায়গা আছে যেখানে আমরা কাজ করতে পারি,” বলছিলেন আজিজুর রহমান।

তবে কওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা কর্মসংস্থান নিয়ে তেমন একটা চিন্তিত নয়। বিভিন্ন মাদ্রাসা ঘুরে সে ধারণাই পাওয়া গেল। তাঁরা মনে করেন, ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের অনেক সুযোগ আছে। ইসলাম বিষয়ক লেখক এবং গবেষক মাওলানা শরীফ মোহাম্মদও মনে করেন, দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের স্বীকৃতি দিলেও অধিকাংশ কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ভিন্ন কোন-কর্মসংস্থান বেছে নেবে না। তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্রের জন্য সরকারি স্বীকৃতিকে বিশাল কোন প্রাপ্তি হিসেবে মনে করেন না কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা।আগে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সরকারিভাবে শিক্ষাপ্রাপ্ত হিসেবে বিবেচনা করা হতো না। সরকারি স্বীকৃতির মাধ্যমে সে জায়গা থেকে উত্তরণ ঘটেছে বলে মনে করেন মাওলানা শরিফ মোহাম্মদ।

২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স-এর সমান মর্যাদা দিয়ে ঘোষণা দিলেন, মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা ব্যাপক সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন।কথা ছিল স্বীকৃতির পর থেকে সবগুলো কওমী মাদ্রাসা একটি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা নেবে। কারণ বর্তমানে কওমী মাদ্রাসাগুলোর ছয়টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবং সেখানে সরকারি কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।   সূত্র: বিবিসি

 

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত