প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যে যুদ্ধে ইরান একা নয়

রাশিদ রিয়াজ : ইরানের সঙ্গে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ৬ জাতি পারমাণবিক সমঝেতা চুক্তি থেকে সরে এসে যে অপকর্ম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করলেন তার জবাব দিতে শুরু করেছে সারাবিশ্ব। ইসরায়েল ও সৌদি জোটের মিত্ররা যখন ট্রাম্পকে এ অপকর্মে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে তখন জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রিটেন, চীন কিভাবে ইরানের সঙ্গে চুক্তি টিকিয়ে রাখা যায় তা নিয়ে ভাবছে। ৬০ দিন সময় বেঁধে দিয়ে ইরান বলছে স্বার্থ রক্ষার গ্যারান্টি পেলে দেশটি এখনো ওই চুক্তি মেনে চলতে পারে। অর্থাৎ চীন ও রাশিয়া ছাড়াও ইউরোপের সঙ্গে আরো একাট্টা হবার পথ ইরানকে করে দিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। চীনের সঙ্গে আলোচনা গঠনমূলক ও ইতিবাচক হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ। এরপর জারিফ ছুটছেন রাশিয়ায়। তার মানে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি প্রভাব ঠেকাতে সৌদি মিত্রদের কথা শুনতে যেয়ে অকার্যকর ও বিচ্ছিন্ন হওয়ার নমুনা দেখাতে শুরু করেছে মাত্র। সৌদি আরব ভেবেছিল প্রতিদিন ইরান যে ৮ লাখ ব্যারেল তেল বিক্রি করে এ বাজার হস্তগত হবে তার। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করায় ইউরোপিয় কোম্পানিগুলোকে ক্রসফায়ারে ফেলার চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে ইমপিচমেন্ট থেকে রক্ষা ও মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের কাছে আস্থা বাড়াতে ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যখন আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছেন তখন ইরান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তির ওপর চুক্তির বরখেলাপকারীর এক কালিমা এঁকে দিয়েছেন তিনি। যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপ বা অন্য মিত্রদের আস্থায় চিড় ধরিয়েছে চরমভাবে। ইরানকে এ চুক্তি মেনে চলার সীমাবদ্ধতা থেকে যুক্তরাষ্ট্র যেন নিজেই মুক্তি দিয়েছে।

তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন ও আরকানসাসের সিনেটর টম কটন মনে করছেন যত বেশি দ্বন্দ্বে উত্তীর্ণ হবে যুক্তরাষ্ট্র ততই ফায়দা লোটা যাবে। কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতি ও মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন, তার জ্বলন্ত উদাহরণ লেবানন ও ইরাকের নির্বাচনী ফলাফল। ২০১৫ সালে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় বিমান হামলা চালানো দাবি জানিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস’এ উপসম্পাদকীয় লিখেছিলেন জন বোল্টন। ২০১৬ সালে তিনি ইরানের সরকার পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন। ইরান ইরাকের চেয়ে বিশ্বে অনেক বেশি জনপ্রিয়, গ্রহণযোগ্য, সম্পদশালী, সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী। ২০০২ সালে ওয়াশিংটন পোস্টে মাইকেল ডড এক প্রতিবেদনে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম হোসেনকে যে রাসায়নিক অস্ত্র দেয়, ১৯৮৮ সাল থেকে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া ৮ বছরের যুদ্ধে মাস্টার্ড ও সারিন গ্যাসের হামলা চালানো হয় এবং তাতে ২০ হাজার ইরানি সেনা নিহত হয় এবং আরো ১ লাখ আহত হয়। বাস্তবতা হচ্ছে ইরাকের পুনর্গঠনে ইরান সমর্থিত মুক্তাদা জোট নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। ট্রাম্প চাইলেও মুহুর্মূহু ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ইরানের সেনাবাহিনী, মিত্র ও ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে অযৌক্তিকভাবে প্রতিশোধের ক্ষমতা নিয়ে দেশটি দখল করবেন সেই দিনের যে ইতি ঘটেছে সিরিয়া তার আরো একটি উদাহরণ।

বেসিক নিউক্লিয়ার সাইন্স সম্পর্কে যে দেশের প্রযুক্তি জ্ঞ্যান ও সমঝোতা রয়েছে সেখানে গায়ের জোরে বোমা মেরে যুদ্ধ ডেকে আনার যে অপরিসীম ক্ষয়ক্ষতি তা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রজম্মের পর প্রজন্ম বহনের ঝুঁকি নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র এমন সব অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে যা অপ্রয়োজনীয়। ফলে ইরাক যুদ্ধে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্ররা হ্যামিলনের বংশীবাদকের সুরের সঙ্গে ইঁদুরের মত পিছু নিয়েছে, এখন তা হবার নয় বরং পুরো মার্কিন নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জলবায়ু চুক্তি থেকে নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে ট্রাস্প নিজেকে শুধরানোর কথা বলেছিলেন। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করলেও তাতে সারাবিশ্বে কোনো সাড়া মেলেনি। বিশ্বে মার্কিন নেতৃত্বের এ দুর্বল দিক আগে কখনো দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্মার্ট ডিপ্লোমেসি’ কোনো কাজে আসছে না। মার্কিনীদের কথা শোনার মত অপরিহার্যতা আর কোনো দেশ অনুভব করছে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতা ছেড়ে চলে যাবার পর মার্কিন নেতৃত্বে যে কি পরিমাণ ধস নেমেছে তা হয়ত পুরোপুরি টের পাওয়া যাবে।

এখন বরং টের পাওয়া যাচ্ছে এ যুদ্ধে ইরান একা নয়। মোটামুটি ৩টি ফ্রন্টে যুদ্ধ চলছে। বাকযুদ্ধ, বাণিজ্য ও প্রক্সি ওয়্যার (ইয়েমেন ও সিরিয়ায়)। ইসরায়েলি ও মার্কিন মিডিয়া খোলাখুলিভাবে বলছে ইরানে রেজিম চেঞ্জ বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা। ৪০ বছর আগে এটি যত সহজ ছিল এখন তা অতটা সহজ নয়। ১৯৫৩ সালে ইরানে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক মোসাদ্দেক সরকারকে ক্যু করে সরাতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমওয়ান সিক্স টাকা ঢেলেছিল তা এখন ওপেন সিক্রেট। কিন্তু হট্টগোল পাকিয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করার এ বহুমাত্রিক যুদ্ধে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েল, সৌদি আরব, বাহরাইন, আমিরাত ছাড়া আর কেউ নেই। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে এক জরিপে অংশ নেয়া ৫৬ ভাগ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তিটি বজায় রাখা। এ জরিপে ১২’শ ৭৭ জন অংশ নেন যাদের মধ্যে ৪৯২ জন রেজিস্টার্ড রিপাবলিকান।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরমাণু সমঝোতা থেকে সরে আসার পর দেশটি এখন বিশ্বে একঘরে হওয়ার বিপদের মুখে রয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছেন, ইরানের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতা ইস্যুতে ট্রাম্পকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। মিসরে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ডেভিড গভরিন বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব ইসরায়েলের শত্রু নয়। বরং সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ইসরায়েলের পার্টনার। ইসরায়েল এধরনের সম্পর্ককে আরো জোরদার ও সম্প্রসারণ করবে যা ইরান ও দেশটির অনুপ্রাণিত রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখবে। গত মার্চে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে আমিরাত ও বাহরাইনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে গোপন বৈঠকও সারেন।

তার মানে জন বোল্টন ইরানের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধের রুপরেখা বাৎলে দিলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরানকে ৪০টি সুপার জেট দিতে যাচ্ছে রাশিয়া। এর আগে বোয়িং ও এয়ারবাস ইরানের কাছে বিমান বিক্রির চুক্তি করলেও ইউএস ট্রেজারি তাদের সে সার্টিফিকেট প্রত্যাহার করে নেয়। সিএনএন’কে জন বোল্টন বলছেন, ইউরোপের যে কোম্পানিগুলো ইরানের সাথে বাণিজ্য করছে সেগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ফক্স নিউজকে বলেছেন, ইরানের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার অর্থ কারো ওপর অবরোধ আরোপ নয় বরং তেহরানের সাথে নতুন একটি চুক্তির পথ খুঁজে পেতে চেষ্টা করা। আর সেলক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে যাচ্ছে। ফ্রান্স ও জার্মানি ইতিমধ্যে ইউরোপকে ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধের ব্যাপারে পাল্টা কৌশল নির্ধারণের আহবান জানিয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর এ্যাঙ্গেলা মেরকেল বলেছেন, ইউরোপের ভাগ্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রেখে আর দীর্ঘদিন আস্থায় থাকা যায় না। এর আগে ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান বলেছিলেন, বিশ্ব নেতৃত্ব ইউরোপকেই নিতে হবে। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়্যেপ এরদোগান টেলিফোনে মার্কিন আধিপত্য খতমের বিষয়টি নিয়ে শলাপরামর্শ করেছেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে চুক্তি থেকে সরে আসা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদন হওয়া ২২৩১ নম্বর প্রস্তাবের সরাসরি লঙ্ঘন। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিয়ান-ইয়েভস লি দ্রিয়াঁ বলেছেন, এই ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তাদের ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের অতিরাষ্ট্রিকতা অগ্রহণযোগ্য। এক্ষেত্রে ইউরোপের কোনো দেশ তাদের কোন ক্ষতি মেনে নেবে না।

এদিকে তেহরানের জুমার নামাজের খতিব আয়াতুল্লাহ আহমাদ খাতামি বলেছেন, ইরান কত কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করবে সে সম্পর্কে কোনো মতামতের ধার ধারবে না তার দেশ। ট্রাাম্প ইরানকে দুর্বল করতে চান এবং তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু আরব দেশ ইরানের শক্তিমত্তাকে সহ্য করতে পারছে না। ইসরায়েল উন্মাদনা দেখালে তেল আবিব ও হাইফাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হবে। সৌদি আরব, বাহরাইন ও আমিরাতকে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সহযোগী উল্লেখ করে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে গোলযোগ দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের আগে এই তিন দেশকে মরতে হবে।

অন্যদিকে নেতানিয়াহু বলেছেন, সিরিয়া থেকে তার দেশে হামলা করে ইরান ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করেছে। অন্তত ৪০০ পারমাণবিক বোমা হাতে রয়েছে নেতানিয়াহুর। দিন কয়েক আগে সিএনএন’র একজন সাংবাদিক তার কাছে স্যাটেলাইট সাক্ষাতকারে সরাসরি জানতে চান, পারমাণবিক বোমা তার হাতে আছে কি না, হ্যা অথবা না বোধক শব্দে উত্তর দিন। উত্তর দিতে না পেরে আমতা আমতা করে কিছুটা বিব্রতকার অবস্থায় পড়েন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে ইসরায়েলি মিডিয়ায় সিরিয়ায় একাধিক ইরানি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ছবি ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে বলেছেন, ইরানিদের তার দেশে রাখলে তা শুধু ধংস ডেকে আনবে। তাদের বের করে দিন। উভয়পক্ষে এধরনের বাকযুদ্ধের মধ্যে সিরিয়ায় আইএস জঙ্গি ও সরকার বিরোধিদের কাছ থেকে ইসরায়েলি অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে অথবা তারা তা জমা দিচ্ছেন।

বাস্তবতা হচ্ছে, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে যত সহজে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে ইরানে তা অসম্ভব। কারণ ইরান সাম্রাজ্যবাদীদের আধিপত্য মেনে না নিয়ে বিকল্প শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বাদশাহী শাসনে কেবলমাত্র পশ্চিমা শাসনের কাছে নতজানু হয়ে থাকেনি। প্রত্যক্ষ নির্বাচন ও জনগণের অংশগ্রহণে শাসন ব্যবস্থায় গোলমাল পাকিয়ে, জঙ্গি সৃষ্টি করে ভেঙ্গে ফেলা অত সহজ নয়। বরং স্বৈরাচারী দেশগুলোতে মার্কিন রেজিম চেঞ্জ ফর্মুলা সহজেই কাজ করে। এসব দেশের জনগণ রাজনৈতিক সচেতন হলেও বাকস্বাধীনতা না থাকায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রত্যক্ষ নির্বাচন বা শাসনযন্ত্রে তথা রাষ্ট্রযন্ত্রে কোনো অবদান রাখার সুযোগ পায় না। কার্যকর সংসদ তো দূরের কথা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তারা একাট্টা হয়ে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ