প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কিসের সংশয়ে আরব দেশগুলো ?

লিহান লিমা: গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি আন্দোলনকারী বে-সামরিক নাগরিক, নারী ও শিশুদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার বৈঠক আহ্বান করে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো। এই সময় সৌদিআরব, মিশর, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি জানালেও এই ইস্যুতে কোন কঠোর অবস্থান ও পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় নি। তবে কাতার কঠোরভাবে এই হামলা এবং ইসরায়েলি দখলদারিত্বের নিন্দা জানায়।

সোমবার জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস উদ্বোধনের বিরুদ্ধে বৈধ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার সময় ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে ৫০জনের ও বেশি নিহত এবং ২ হাজার ৭০০ নাগরিক আহত হন।

                                                                                   বয়ে গিয়েছিল লাশের বন্যা

ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর গত এক দশক ধরে চলা এই নির্যাতনের নিন্দা জানায় আরব দেশগুলো। এই সময় কিছুদেশ ইরান আরব দেশগুলোকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে বলে উদ্বেগ ব্যক্ত করে। সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে সৌদিআরব ফিলিস্তিনি এবং তাদের আইনগত অধিকারের ওপর সমর্থন জানায়। তবে গত বছর ধরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বন্ধুত্বের খাতিরে ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধনটা পাকা করে নিয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানায়, সৌদি সমর্থিত যুক্তরাষ্ট্রের শান্তির প্রস্তাব পুরোপুরি ইসরায়েলি স্বার্থের পক্ষে।

                                                          এই হত্যাযজ্ঞ থেকে বাদ যায় নি কোমলমতি শিশুরা্ও

এর আগে মার্চে সপ্তাহব্যাপি গাজা বিক্ষোভের সময় ইসরায়েলি ইহুদি-আমেরিকান নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন সৌদি যুবরাজ। ওয়াশিংটন পোস্টকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার মন্তব্যে এক মুহুর্তের জন্য থমকে যায় বিশ্ব। তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনের শান্তি প্রস্তাব মেনে নেয়া উচিত, নয়তো বিক্ষোভ এবং নালিশ করা বন্ধ করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ রয়েছে। প্রত্যেকেরই নিজ ভূমিতে বসবাসের অধিকার আছে।

সোমবার জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাসের উদ্বোধনি অনুষ্ঠানে জ্যারেড কুশনার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো ইতোমধ্যে জেরুজালেমে তাদের দূতাবাস স্থানান্তরের প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে। ইসরায়েল, জর্ডান, মিশর, সৌদিআরবসহ অন্যান্য দেশের নেতারা তাদের দেশকে আধুনিকায়ন এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে কাজ করে যাচ্ছেন। একই স্বার্থ এবং একই হুমকি তারা মোকাবেলা করছে।’

গত সপ্তাহে ট্রাম্পের ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছে সৌদি আরব ও ইসরায়েল। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে শুধু সৌদি আরবই নয়, এগিয়ে এসেছে আরো বেশ কয়েকটি আরব দেশ। বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিদ বিন আহমেদ আল খলিফা টুইটে সিরিয়াতে ইরানের ওপর ইসরায়েলের হামলাকে সমর্থন করেছেন। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই ছোট্ট দেশটি ২০১১ সালে শিয়াদের উত্থান রাজতন্ত্রের জন্য বিপদ ডেকে এনেছিল। তখন থেকেই দেশটি ইরানকে হুমকি হিসেবে দেখছে। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি ও ইরানের সঙ্গে শত্রুতা সত্ত্বেও বাহরাইন ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ওপর এই হামলার নিন্দা জানায়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের ভূমিকার নিন্দা জানায়। দেশটির রাষ্ট্রায়াত্ত সংবাদ মাধ্যম গাল্ফ নিউজের সম্পাদকীয়তে বলা হয় ‘মি. প্রেসিডেন্ট আপনি শান্তির আশার শেষ আশাটুক্ওু নিভিয়ে ফেলেছেন’। আবুধাবীর ‘দ্য ন্যাশনাল’ পত্রিকার শিরোনামে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরকে ‘ঝড়’ বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে আমিরাতের নিন্দা সত্ত্বেও ইসরায়েলি ব্যবসায়ীরা আমিরাতের সঙ্গে কাজ করে যাচেছ। ইসরায়েলি জুডো তারকা আমিরাতের বার্ষিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সময় আবুধাবী ভিত্তিক আন্তর্জাতিক এনার্জি সংস্থা ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সম্প্রতি ইসরায়েলে অনুষ্ঠিত বাইসাইকেল রেস প্রতিযোগিতায় আমিরাত এবং বাহরাইন অংশগ্রহণ করে।

তবে আরবের পারস্য দেশগুলোর মধ্যে কাতার কঠোরভাবে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার নিন্দা জানায়। এই সহিংসতাকে কাতার ‘নৃশংস গণহত্যা এবং দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী কৃর্তক পরিকল্পিত হত্যাকান্ড’ বলে উল্লেখ করে। প্রসঙ্গত, গাজা উপত্যাকায় কাতারের নেতারা লাখ লাখ ডলার ব্যয় করছেন এবং সেখানে মানবিক সহায়তা দিচ্ছেন। কাতার কয়েক বছর ধরে হামাসের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। তবে ফিলিস্তিনিদের মানবিক সহায়তা দেয়ার সঙ্গে কাতার গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ইহুদিদের স্বাগত জানিয়েছে। এদের মধ্যে ছিলেন হার্ভাডের আইনে অধ্যাপক অ্যালেন দারশোইতজ। যদি পরে কাতারের আমিরকে ইসরায়েলি অ্যাথলেটদের টুর্নামেন্টে স্বাগত জানানোর জন্য প্রশংসা করে চিঠি লিখেন।

                                                                                          প্রতিবাদের ভাষা

তবে গত বছর মিশর, সৌদি আরব, আমিরাত এবং বাহরাইনের নিষেধাজ্ঞা কাতারকে হামাস ও ইসরায়েলের তিন বিরোধী দেশের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্কে জড়িয়েছে। ১৯৭৮ সালে প্রথম আরব দেশ হিসেবে মিশর ইসরায়েলের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে। তবে এই শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক সবসময়ই শীতল ছিল, কারণ সাধারণ মিশরীয়রা সাংস্কৃতিকভাবে ইসরায়েলকে বয়কট করে আসছে এবং প্রতিনিয়তই ফিলিস্তিনের পক্ষে র‌্যালি করছে। যদিও সম্প্রতি মিশর রাফাহ সীমান্ত উন্মুক্ত করে ইসরায়েলকে গাজা উপত্যকা অবরোধ করতে সহায়তা করেছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির অংশ হিসেবে এ বছর কায়রোতে দেশটির ৭০তম জন্মবার্ষির্কী উদ্বোধন করা হয়। তাই স্বার্থের খাতিরে ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর কূটনৈতিক সখ্যতার বলি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের আইনগত অধিকার সন্দেহাতীতই থেকে যাচ্ছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ