প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রতিদিন গিলে খাচ্ছে দেড় হাজার মে. বিদ্যুৎ

ডেস্ক রিপোর্ট : অবৈধ ও নিুমানের ব্যাটারিতে সয়লাব রাজধানীসহ সারা দেশ। এসব ব্যাটারি প্রতিদিন গিলে খাচ্ছে এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ঢাকাসহ অধিকাংশ জেলা শহর, মফস্বল ও গ্রামগুলোতে রিকশা ও ভ্যানগাড়ির বিকল্প হিসেবে অবাধে চলছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন অপারেটরদের টাওয়ার, আইপিএসসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে নিু মানের এসব ব্যাটারি। এগুলো বিদ্যুতের সাহায্যে চার্জ দেয়া ছাড়াও অবৈধ বৈদ্যুতিক লাইন ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে এসব ব্যাটারি। এমনকি গ্যাসভিত্তিক মূল্যবান ক্যাপটিভ পাওয়ারের বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও তৈরি হচ্ছে এসব ব্যাটারি। এ অবস্থায় সরকার শিগগিরই এসব অবৈধ ব্যাটারি তৈরির কারখানা বন্ধ ও চার্জার লাইন বিচ্ছিন্ন করার অভিযান শুরু করবে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডসহ (আরইবি) সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো এ অভিযান পরিচালনা করবে। পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ও আশপাশের জেলা, কেরানীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নরসিংদী ও খুলনা জেলায় সবচেয়ে বেশি অবৈধ ব্যাটারি তৈরির কারখানা রয়েছে। বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে সারা দেশে অন্তত ২৫টি বড় ব্যাটারির কারখানা আছে যেগুলোর কোনো রকম সরকারি অনুমোদন নেই।

বাংলাদেশ ইজিবাইক আমদানি ও সরবরাহকারী ব্যবসায়ী সমিতির দেয়া তথ্যানুযায়ী বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে এখন প্রায় ১০ লাখ ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান চলাচল করছে। এসব যানবাহন চার্জ দিতে দৈনিক প্রায় এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। সাধারণত একটি ইজিবাইকের জন্য চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি প্রয়োজন। প্রতি সেট ব্যাটারি চার্জের জন্য গড়ে ৮০০ থেকে ১১০০ ওয়াট হিসেবে পাঁচ থেকে ছয় ইউনিট (দিনে বা রাতে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা) বিদ্যুৎ খরচ হয়। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ধরে ১০ লাখ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশায় প্রতিদিন সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। শুধু ঢাকাতেই এখন তিন-চার লাখ ইজিবাইক চলছে। ঢাকার মধ্যে উত্তরা, ধানমণ্ডি, মিরপুর, খিলক্ষেত, মুগদা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, আদাবর, চটবাড়ি বেড়িবাঁধ, কামরাঙ্গীরচর ও ডেমরায় এসবের চলাচল বেশি দেখা যায়।

জানা গেছে, অধিকাংশ চালকই নামকাওয়াস্তে অর্থের বিনিময়ে অবৈধ বৈদ্যুতিক লাইন থেকে ব্যাটারি চার্জ করিয়ে নিচ্ছেন। জানা গেছে, ঢাকার বাইরে বগুড়ার বিভিন্ন জেলা-উপজেলাগুলোতে ইজিবাইক চালকরা যে গ্যারেজে গাড়িগুলো রাখছেন সে জায়গাতেই রাতভর একটি গাড়ির শুধু চার্জের জন্য গ্যারেজ মালিককে মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে দিচ্ছেন। ঢাকার যাত্রাবাড়ী, গোড়ান, খিলক্ষেত, মাণ্ডা, সায়েদাবাদ, সবুজবাগ, খিলগাঁও, চিটাগাং রোড, শনিরআখড়ায় কয়েক হাজার গ্যারেজ থেকে অবৈধ বৈদ্যুতিক লাইন থেকে এসব ব্যাটারি চার্জ দেয়া হচ্ছে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের জেলা-উপজেলাগুলোতেও অবাধে চলছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক। আর এগুলোর চালকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জেলার শতাধিক গ্যারেজের অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন থেকে ব্যাটারিগুলো চার্জ দিচ্ছেন। কুমিল্লা শহরে এই যানগুলো চার্জ দেয়ার জন্য আছে আলাদা দোকান। সেখানে নিয়ম ভঙ্গ করে বিদ্যুতের অপচয় করে ব্যাটারিগুলোতে চার্জ দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ শহরে এই বাইকগুলো চার্জের জন্য আলাদা করে ঘর তৈরি করা হয়েছে। সেখানে অবৈধভাবে ইজিবাইকে চার্জ দেয়া হচ্ছে। এক একটি ঘরে একসঙ্গে ১০টি করে ইজিবাইকে একটানা ৮ ঘণ্টা করে চার্জ দেয়া হচ্ছে। এ জন্য তাদের খরচ হচ্ছে ১৫০ টাকা। মিরপুর বেড়িবাঁধের এক ইজিবাইক চালক সুরুজ মিয়া বলেন, প্রতিদিন ছয় ইউনিট করে মাসে তার গাড়িতে ১৮০ ইউনিট বিদু্যুৎ খরচ হয়।

সূত্র জানায়, একসময় চীন থেকে এ ধরনের ব্যাটারি আমদানি করা হতো। এতে সরকার প্রতি বছর চার হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পেত। এক পর্যায়ে দেশে শুরু হয় ব্যাটারি উৎপাদন। প্রাথমিকভাবে ভলভো, হ্যামকো, গ্যাস্টন, রহিম আফরোজসহ কয়েকটি দেশীয় কোম্পানি উন্নত মানের ব্যাটারি তৈরি শুরু করে। কিন্তু দিন দিন ব্যাটারির চাহিদা বাড়তে থাকায় দেশি-বিদেশি একটি সিন্ডিকেট ঢাকার আশপাশ-কেরানীগঞ্জ, সাভার, ময়মনসিংহ, নরসিংদী ও খুলনায় ছোটবড় শত শত অবৈধ ব্যাটারি তৈরির কারখানা গড়ে তোলে। এসব কারখানা থেকে বছরে ৬ থেকে ৮ লাখ ব্যাটারি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাটারি নিুমানের হওয়ায় গড়ে ৩ থেকে ৪ মাসের বেশি সময় এগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এতে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। পাশাপাশি মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে পরিবেশ। ব্যাটারিতে ব্যবহৃত অ্যাসিড, লেড (সিসা), পিপি, সেপারেটর, টিব্যুলার ব্যাগ পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পরিবেশ আইন অনুযায়ী ব্যাটারি কারখানাগুলো লাল শ্রেণীভুক্ত। এ কারণে ব্যাটারির কারখানা স্থাপনের জন্য পরিবেশের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। কিন্তু অধিকাংশ কারখানার কোনো ধরনের পরিবেশ ছাড়পত্র নেই।

নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, তাদের এলাকায় দুই শতাধিক অবৈধ ব্যাটারি তৈরির কারখানা রয়েছে। অধিকাংশ কারখানার মালিক কোরিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক। ভিজিট ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসে এসব বিদেশি ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে এসব নিুমানের ব্যাটারি তৈরি করছে। এসব ব্যাটারির গায়ে কোন দেশে তৈরি হচ্ছে তা লেখা থাকছে না। চায়নিজ ভাষায় স্টিকার লাগিয়ে এগুলো বাজারজাত করা হয়। বিক্রেতারা এগুলো বিদেশি বলে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছে। বিএসটিআইয়ের অনুমোদনের ধার ধারছে না এরা। ব্যাটারি তৈরিতে অ্যাসিড দরকার। কিন্তু এসব অ্যাসিড ক্রয়, ব্যবহার ও মজুদের জন্য কোনো লাইসেন্সও নেই।

সম্প্রতি নরসিংদীর একটি স্পিনিং মিলের গ্যাসভিক্তিক ক্যাপটিভ বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ থেকে ‘লিড অ্যাসিড ব্যাটারি’ নামের একটি ব্যাটারি প্রস্তুতকারক কোম্পানির নাম উঠে এসেছে গোয়েন্দা অনুসন্ধানে। বিদ্যুৎ বিভাগকে দেয়া এক গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘জিয়াংশু জিনডিং স্টোরেজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গত এক বছর ধরে স্থানীয় জে.জে মোবারক আলী স্পিনিং মিল থেকে বিদ্যুৎ লাইন নিয়ে ব্যাটারি উৎপাদন করছে। এতে স্পিনিং মিলের মালিক পাচ্ছেন মাসে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। জানা গেছে, গ্যাসভিত্তিক ক্যাপটিভ বিদ্যুতের অনুমোদন নিয়ে এই স্পিনিং মিলের মালিক স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের অবৈধ ব্যবসা করছেন। এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জায়গার মালিক মাধবদী পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. ইলিয়াস জানান, কারখানা থেকে প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার লিড অ্যাসিড ব্যাটারি উৎপাদন হয়।

কারখানার কর্মকর্তা মাহিদুল জানান, প্রতি মাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা বিল আসে। এখন ব্যাটারির অর্ডার কম, তাই বিল কম আসছে। সূত্র : যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত