প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাজেটের আকার চূড়ান্ত

ডেস্ক রিপোর্ট : ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ কোটি টাকার বাজেট চূড়ান্ত করা হয়েছে। যা মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। সোমবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্পদ কমিটির সভায় বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা শেষে বাজেটের এ আকার নির্ধারণ করা হয়েছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। চলতি মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের এ বাজেটকে নির্বাচনী বাজেট মনে করা হচ্ছে। এজন্য আয়-ব্যয়ে রাখা হয়েছে ভারসাম্য। গত কয়েক বছরের তুলনায় বাজেটের আকার বেড়েছে সামান্য। চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। সেই তুলনায় আগামী অর্থবছর বাড়ছে মাত্র ৬৮ হাজার কোটি টাকা। ৭ জুন জাতীয় সংসদে বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে শেষ বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী।

সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে অনুষ্ঠিত সম্পদ কমিটির সভায় অর্থমন্ত্রী ছাড়া বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীর এবং অর্থ সচিব মুসলিম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এজন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। (সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ছাড়া)। চলতি অর্থবছরের চেয়ে এডিপির আকার বাড়ছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। আর সংশোধিত এডিপির তুলনায় বাড়ছে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। সেই সঙ্গে আগামী অর্থবছর মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। পাশাপাশি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। এটি মোট জিডিপির ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বাড়ছে প্রায় ৫৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এটি রক্ষণশীল বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, নির্বাচনী বাজেট হওয়ায় সরকার কর বাড়িয়ে জনগণের ওপর বাড়তি কোনো চাপ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে না। এজন্য আগামী বাজেট হবে পুরোপুরি ভোটার তুষ্টির বাজেট। তবে নির্বাচনী বছর হওয়ায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, নানা কারণে নতুন বাজেট তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এটি হবে তার জীবনের শেষ বাজেট। নির্বাচন মাথায় রেখেই বাজেট তৈরি করতে হবে। সঙ্গত কারণে বাজেট অন্যবারের মতো হবে না। এতে অনেক ছাড় দেয়া হবে। নতুন কোনো করারোপ করা হবে না। রাজনৈতিক কারণে অনেক ক্ষেত্রে ছাড়া দিতে হবে।

চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। সেই তুলনায় আগামী অর্থবছর বাড়ছে ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটের প্রবৃদ্ধি জিডিপির ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি বছর যা ছিল ১৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এ ছাড়া আগামী অর্থবছর রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে তার প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এসব বিচেনায় দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনী বাজেট হওয়ায় আয়-ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।

সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের এডিপিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং তৃতীয় অবস্থানে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। এছাড়া পর্যায়ক্রমে গুরুত্ব পাওয়া আরও ৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ হচ্ছে- মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, জননিরাপত্তা বিভাগ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে. মুজেরি সোমবার যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন সামনে রেখেই করা হচ্ছে আগামী অর্থবছরের বাজেট। যেহেতু ডিসেম্বরের মধ্যে একটি নির্বাচন করার কথা, সেহেতু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও প্রভাবে বাজেটের আকার, বরাদ্দ এবং অর্থ ব্যয়- সব ক্ষেত্রেই নির্বাচনী চিন্তার প্রতিফলন পড়বে। তাছাড়া নির্বাচনী নানা অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে গেলে বড় আকারের বাজেট হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এর বাস্তবায়ন নিয়ে। কেননা অর্থবছরের প্রথম ৬ মাস নির্বাচনী অনিশ্চয়তা থাকবে। তাছাড়া নির্বাচন হওয়ার পরও যে সরকারই আসুক তাদের গুছিয়ে নিতে বিছুটা সময় লাগবে। ফলে এ বাজেটের কাক্সিক্ষত বাস্তবায়ন কঠিন ও দুরূহ হবে। তাছাড়া প্রথম ৬ মাসে বাজেট বাস্তবায়ন শুরু করাই সম্ভব হবে কিনা সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। কেননা এ সময়ে নেতারা নির্বাচন নিয়েই বেশি ব্যাস্ত থাকবেন।

সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এটি এ যাবৎ কালের সর্বোচ্চ রেকর্ড প্রবৃদ্ধি অর্জন। গত অর্থবছর চূড়ান্ত হিসাবে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। চলতি ও গত অর্থবছরের সাফল্যের ওপর ভর করে আগামী অর্থবছর প্রবৃদ্ধির এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মোস্তফা কে. মুজেরি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি সরকারি বাজেটের পাশাপাশি বড় অংশই নির্ভর করে বেসরকারি খাতের ওপর। কিন্তু নির্বাচনী বছরে সাধারণত বেসরকারি খাত বিনিয়োগ বা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় উদ্যোক্তারা এ সময় নতুন বিনিয়োগে উৎসাহী হন না। ফলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সূত্রমতে, আগামী বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক অর্থায়ন থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে এর সঙ্গে সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা যোগ হবে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। সে হিসাবে মোট এডিপির আকার দাঁড়াতে পারে ১ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা। যদিও সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চূড়ান্ত করা হয়নি। অপরদিকে চলতি অর্থবছর এডিপির আকার ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। সেখান থেকে মার্চে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ কমিয়ে মোট বরাদ্দ দেয়া হয় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৯৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে মূল এডিপি থেকে কমে যায় প্রায় ৬ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরের এডিপি তৈরিতে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও এসডিজির লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অগ্রাধিকার খাতগুলোতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, পরিবহন, ভৌত ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাত ও নারী উন্নয়নসহ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার বিষয়গুলো মাথায় রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে নতুন এডিপি তৈরির ক্ষেত্রে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও কাক্সিক্ষত সুফল প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের চেয়ে চলমান প্রকল্প সমাপ্ত করার দিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সূত্র : ‍যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ