প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এই স্মৃতিছবি; সেই সস্তা রেডিও , মা, খুউব মনে পড়ছে তোমাকে

 

মাসুদ আলম বাবুল  : বাবার একটি রেডিও ছিলো। ন্যাশনাল প্যানাসনিক। আমরা চুরি করে সে রেডিও শুনতাম। অনুরোধের আসর ছিলো আমাদের প্রিয়। বাবা শুনতেন শুধু খবর। বিশেষ করে বিবিসি বাংলা। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বিবিসির খবর, তারপর এশার নামাজ, অতঃপর রাতের খাবার খেয়ে ঘুম। ফজরের আজান হলেই জেগে ওঠা, ফজরের নামাজ, এরপর সারাদিনের কাজ।
মা প্রতিদিন সকালে উঠে ফজরের নামাজ অন্তে গেরস্থালীর কাজের সাথে বাবাকে নাস্তা তৈরি করে দেয়া, দুপুর একটার মধ্যে বাবার মধ্যাহ্ন ভোজের ব্যবস্থা সহ সংসারের যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাজ।
বাবা এশার নামাজ পড়েই ঘুমিয়ে পড়তেন। মায়ের ঘুম ছিলো বাবার চেয়ে কম। অনেক রাত করে ঘুমানো ছিলো মা র অভ্যাস। আবার গভীর ঘুমের মধ্যেও মাকে জাগাতে একবারের বেশি ডাক দিতে হতোনা। এর একটি কারণও ছিলো-
বাবার কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে চট্রগ্রামে। বাবা কবে বাড়ি আসবেন তা জানানো হতো মাকে চিঠি লিখে। আর সেদিন সারারাত মা অধির অপেক্ষায় প্রহর গুনতেন কখন এসে বাবা দরজায় কড়া নাড়বেন। আর একটির বেশি ডাক যাতে দিতে না হয় তাই হয়তো নির্ঘুম রাত জাগা মায়ের। সারারাত হেরিকেনের ঢিবডিবে আলোয় আঁধারে মা আমাদের চোখে ঘুম পাড়াতেন আর প্রতীক্ষা করতেন বাবা কখন আসবেন। বাবাকে স্টিমার ঘাট থেকে রাতে প্রহরীর মতো এগিয়ে আনতেন আমার চাচাতো ভাই আবুল কালাম আজাদ। মা জেগে থাকতেন ভোররাত অবধি, একটি কড়া নাড়ার অপেক্ষায়। এই অপেক্ষাই মাকে নির্ঘুম বানিয়েছিলো। ধলপহরের আগেই রানারের মতো রাতের অাঁধার চিড়ে আমার চাচাতো ভাই জীবন্ত এক চিঠির মানুষকে পৌঁছে দিতেন তাঁর অংশভগিনীর কাছে। দু’একটি পৃষ্ঠায় যার সমাপ্তি হবার নয়।
মা বলেছিলেন, ওখান থেকেই তাঁর কম ঘুমানো বা ঘুমের মধ্যে একটি ডাক দিলেই জেগে ওঠার অভ্যেস।
মা ছিলেন অনিন্দ্য সুন্দরী, সুকন্ঠি ও সংগীত প্রিয়। রাতে বাবা ঘুমিয়ে পড়লে মা রেডিও অন করে গান শুনতেন, নাটক শুনতে পছন্দ করতেন মা। বাবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতো তাই বাবা রাতে রেডিওর ব্যাটারি খুলে রাখতেন। এ নিয়ে মায়ের অভিমানের অন্ত ছিলোনা।
আমি তখন বরিশালে থেকে লেখাপড়া আর রাজনীতি করি। রিটার্ড বাবার কাছ থেকে প্রতিমাসে একহাজার টাকা, একটা টিউশনি আর পত্রিকার প্রুফরিডারের কাজ করে যা হাতে আসতো তা দিয়ে বেশ চলে যেতো।
মা র চোখে রাতে ঘুম আসতোনা, আবদুল আলিম, নিনা হামিদ, অনুরোধের গান আর রেডিও নাটিকার প্রতীক্ষায়। বাবা মাকে অনেক সেধেছে কিন্তু মা র অভিমান ভাঙাতে পারেনি। রেডিওর ব্যটারি খুলে রাখা এটি ছিলো বাবার অমার্জনীয় অপরাধ। সারারাত বাবার প্রতিক্ষায় প্রহর গুনে জেগে থাকা মা এ সামান্য কষ্টকে সামাল দিতে পারেননি মা। বাবা কতো চেষ্টা করেছেন আমাদেরকে দিয়ে মাকে বোঝাতে, কিন্তু মা বলেছেন, তুই যেদিন টাকা কামাই করে রেডিও কিনতে পারবি সেদিন আমি রেডিও শুনবো।
বাবাতো বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, দয়েতসে ভেলে, রাশিয়া, রেডিও তেহরান ও রেডিও পিকিং শুনতেন। বেশি শুনতেন বিবিসি। তাই সর্ট ওয়েভের জন্যই তিনি থ্রি ব্যান্ড ব্যবহার করতেন।
মা শুনতেন বাংলাদেশ বেতার। আমি বরিশাল থেকে মায়ের জন্যে একটি মিডিয়াম ওয়েভ ব্যান্ডের রেডিও কিনে আনি। মা প্রথম আপত্তি করেছিলা। কারন আমিতো ছাত্র, বাবার টাকায়ই আমাকে চলতে হয়। কিন্তু মাকে যখন বললাম আমার টিউশনি আর পত্রিকায় কাজ করার রোজগারের টাকায় কেনা। মা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। মনে করেছেন বাবাই গোপনে আমাকে দিয়ে হয়তো এ কাজটি করিয়েছেন। অনেক কসম করে বোঝানোর পর মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলেন। আর বাবা দূরে বসে রেডিওটা কানের কাছে নিয়ে সর্টওয়েভ টিউনিং করছিলেন ও একটু একটু হাসছিলেন আর বলছিলেন কয়েকডজন ব্যটারি কিনে রেখে যাইস তোর মায়ের জন্যে।
আমার দেয়া সেই এক ব্যান্ডের রেডিওটা মা যক্ষের ধনের মতো বুকে আগলে রাখতেন। রান্নাঘর, কাঁথা ওয়ালমেট সেলাই, এই রেডিওই ছিলো তাঁর অনুসঙ্গি।
বাবা একবার দুষ্টুমি করে মায়ের কাছে রেডিওটা চেয়েছিলেন। মা বলেছিলেন, এটা কম দামের রেডিও আমার বেকার ছেলে কিনে দিয়েছে।
বাবা বলেছিলেন, ছেলে কি তোমার একার?
মা বলেছিলেন, প্রথমত আমার তারপর তোমার।
বাবা মানতে পারেননি, তিনি যুক্তি দেখালেন সন্তান পরিচিত হয় তাঁর বাবার নামে, মায়ের নাম কোথাও লাগেনা।
মা বললেন, সেদিন একটি নাটক শুনেছি, সেখানে বলেছে এরপর সন্তানের পরিচয়ে বাবার নামের পাশাপাশি মায়ের নামও থাকবে এবং ভবিষ্যতে মায়ের নাম থাকবে প্রথম তারপর বাবা।
বাবা বললেন, তারপরে একসময় বাবার নামটা আর কষ্ট করে কেউ লিখবে না এইতো! এই জন্যেই মেয়েলোকের রেডিও শোনা নিষেধ।
আজ ৩০ এপ্রিল। আমার প্রিয়তম মায়ের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। ২৯ এপ্রিল ২০১৪ সনে মা হঠাৎ স্ট্রোক করলে তাকে দ্রুত বরিশাল নিয়ে যাই। সে যাওয়াই তাঁর শেষ যাওয়া হলো। ঐদিনই ভোররাতে মানে ৩০ এপ্রিল ভোররাত ৩-২৫ এ শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। শুধুমাত্র প্রাইমারী শিক্ষায় শিক্ষিত একজন নারী, জীবন যার গ্রামে অথচ তিনি ছিলেন একজন ধার্মিক ও প্রগতি মনষ্ক মানুষ।
শুনেছি মা র বিয়ে হয়েছিলো ৮ বছর বয়সে। বাবা তখন বরগুনা জেলা স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের আপন দাদা ছিলোনা, বাবাকে লেখাপড়া করাতেন তাঁর পিতৃব্য শহীদ হাজী ঈমানউদ্দিন ডাক্তার। যিনি ‘৭১-এ পাক বাহিনীর গুলিতে শাহাদাৎ বরণ করেন। আমাদের সে দাদা-ই বাবার জন্যে মাকে আনেন সুন্দরী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে দেখে।
সে যুগে গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে আমাদের প্রত্যন্ত দক্ষিনাঞ্চলে লেখাপড়ার কোনো সুযোগ ছিলোনা। দু’একটি প্রাইমারি স্কুল ছিলো, তাও হাতে গোনা। বাবাকে লেখাপড়া শিখতে হয়েছে তাঁর এবং তাঁর চাচার অদম্য ইচ্ছায় প্রচন্ড বিরূপ পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধ বিগ্রহ করে। আর মা অনেক দূরে তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে প্রাইমারি পর্যন্ত পড়েছেন, শুধুমাত্র বাবার কাছে চিঠি লিখতে পারার
অনুকম্পায়। তাঁর এই সামান্য শিক্ষাটুকু পরবর্তীতে বাংলায় কোরান শরীফ পড়া, অজিফা, বিভিন্ন ইসলামি বই, বিষাদসিন্ধু সহ আমার পাঠ্যবই ও সহজ সংগৃহীত অনেক বইয়ের পাঠ গ্রহণ। স্কুল জীবনে যতোক্ষণ আমি পড়ার টেবিলে থাকতাম মা ততোক্ষণ কোনো সেলাইয়ের কাজ বা অন্য কোনো বই পড়তেন।
আমি মশার কামড় সহ্য করতে পারতাম না, তাই মা বাবাকে দিয়ে একটি বড় সাইজের মশারি আনালো বাজার থেকে। সে মশারির নিচের অংশে অতিরিক্ত কাপড় লাগিয়ে আমার টেবিল চেয়ার সমেত মশারি বসিয়ে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আমার একটি বদঅভ্যাস ছিলো, সে হলো বেশি রাত জাগা, আর সকালে ঘুমানো। বিকেলে স্কুল থেকে এসেই একটা টানা ঘুম, তারপর একটু সন্ধ্যার পর নদীর পারে, মাঠে ঘোরাঘুরির পর আটটা সাড়ে আটটার দিকে পড়তে বসা। সেখান থেকে রাত দেড়টা, দু’টো বা তারও বেশি বেজে যেতো। মা এই পুরো সময়টা আমার সঙ্গী হয়ে পাশের খাটিয়ায় মশারি না খাটিয়ে বসে বসে কাজ করতেন। মশারি খাটালে ঘুমিয়ে পড়বেন তাই হয়তো মশারি খাটাতেন না। সেই মানুষটি ঠিক সকালে উঠে ফজরের নামাজ পড়তেন, সকালের খাবার সহ প্রাত্যহিক কাজ গোছাতেন, শুধু ভাবতাম কি করে সম্ভব হতো!!
আমি প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতি করতাম, বাবা আমাকে বাঁধা দিতেন। চট্রগ্রাম থাকতে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী বাবার মাথাটা বিগড়ে দিয়েছিলেন। বাবা মনে করতেন আমি যা করছি তা জাহান্নামের পথ। মাকে বুঝিয়ে বলতাম, মা আমাকে বুঝতেন। আমার লেখা কবিতা মা খুঁটে খুঁটে পড়তেন। বাবা একদিন আমার হাতে পবিত্র কোরান শরীফ তুলে দিয়েছিলেন, আমি যাতে আর ঐ রাজনীতি না করি। মা হাত থেকে অতি দ্রুত কোরান শরীফ টেনে নিয়ে বললেন, মানুষের ভালো চাওয়া, উপকার চাওয়া, কখনোই জাহান্নামের পথ হতে পারেনা, তোমাকে এসব বলেছে কে? আমার ছেলেকে এভাবে তুমি অপরাধি করবেনা, ও কারো ক্ষতি করেনা।
সেই মা হারা চারটি বছর। একটুও ভালো লাগছেনা। মা, খুউব মনে পড়ছে তোমাকে। তুমি ভালো থাকো।
ডাক্তার প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ