প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নারীদের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বাধা কোথায়

ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পুরুষের অংশগ্রহণ সক্রিয় হলেও নারীদের ক্ষেত্রে তেমনটা নয়। মাঠে ঘাটে সংবাদ সংগ্রহের চ্যালেঞ্জিং পেশায় সাহস নিয়ে এলেও নানা বাধার মুখে কেউ কেউ টিকতে পারেননি।

নারী সাংবাদিকদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও ১৯৮৭ সালের বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটের (পিআইবি) এক জরিপ বলছে, ঢাকায় ২৪১টি পত্রিকায় কর্মরত পুরুষ সাংবাদিক ছিল ৯০০ জন। এর বিপরীতে নারী সাংবাদিক ছিল মাত্র ৩৪ জন। শতকরা হিসাবে ঢাকায় তখন নারী সাংবাদিকের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ।

তিন দশক পরে ২০১৮ সালে সংবাদ মাধ্যমের সংখ্যা ৩ হাজার ২৬৩টিতে দাঁড়িয়েছে বলে জাতীয় সংসদে দেওয়া সরকারের তথ্য।

ঢাকা সাব এডিটরস কাউন্সিল ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির তালিকা অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ঢাকায় পুরুষ সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৩২ জনে (৮৭ শতাংশ); নারী সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়ে ৩১০ (১৩ শতাংশ) জনে উন্নীত হয়েছে।

এদেশে নারীরা সাংবাদিকতায় আসা শুরু করেন পঞ্চাশের দশকে। তখনকার সময়ের নামকরা নারী সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন লায়লা সামাদ, রাজিয়া খান আমিন, ফয়েজা হক, মাফরুহা চৌধুরী ও নাসিমুন আরা হক। সাত দশকেও সংবাদমাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ লক্ষ্যণীয়ভাবে বাড়েনি।

সাংবাদিকতা পেশায় নারীর অপ্রতুল অংশগ্রহণের পেছনে নারীবান্ধব কর্মক্ষেত্রের অভাব, পরিবারের চাপ, মাতৃত্ব ও সন্তান লালনপালন, বেতন-ভাতা ও কর্মে লিঙ্গ বৈষম্য ও যৌন হয়রানির মতো বেশ কিছু কারণ রয়েছে বলে অনলাইন পোর্টাল বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

এবিষয়ে জানতে চাইলে জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ফেরদৌসী সুলতানা বলেন, সাংবাদিকতা পেশাটা সরকারের অধীনে নয় এবং সুযোগ-সুবিধা কম বলে এই পেশা থেকে নারীদের ঝরে পড়ার হার বেশি।
সংবাদ সংস্থা ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশের সম্পাদক মাহফুজুর রহমান বলেন, “মেয়েরা সাংবাদিকতায় আসতে চায় না। কারণ তারা এই পেশাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে এবং বাইরে দৌড়াদৌড়ি করার চেয়ে ডেস্কে কাজ করতে পছন্দ করে।”

সাংবাদিকতায় মেয়েরা বেশিদিন টিকে থাকতে না পারার পেছনে ‘অসংবেদনশীল’ কর্মক্ষেত্রকে দায়ী করলেন একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিবেদক ফারজানা রূপা।

‘বার্তাকক্ষের চরিত্রটাই নারীবান্ধব নয়’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বার্তাকক্ষ মানে হলো ২৪ ঘণ্টা। আমি আজ সকাল ৮টায় অফিসে এসেছি, সারাদিন কাজ করেছি, আমি রাত দেড়টা-দুইটায় বাসায় যাব।”

এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের জন্য ‘ডে কেয়ার সেন্টার’, ‘ফ্রেশ হওয়ার জন্য রুম’, ‘ভাল টয়লেট এবং বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা থাকা নারী সাংবাদিকদের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এগুলোর কিছুই কোনো বার্তাকক্ষেই নেই বলে আক্ষেপ ঝরল ফারজানার কণ্ঠে।

বাংলাদেশ শ্রম আইনের অষ্টম অধ্যায়ের ৯৪/(১) ধারায় বলা হয়েছে, “সাধারণতঃ চল্লিশ বা ততোধিক মহিলা শ্রমিক নিয়োজিত আছেন এরূপ প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে তাহাদের ছয় বৎসরের কম বয়সী শিশু সন্তানগণের ব্যবহারের জন্য এক বা একাধিক উপযুক্ত কক্ষের ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ করিতে হইবে।”

এবিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের প্রধান বার্তা সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান বলেন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীর সংখ্যা কম থাকায় শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র গুরুত্ব পায়নি।

এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মানসুরা হোসাইন বলেন, “ডে কেয়ার সেন্টার কেবল নারীর জন্য হবে কেন? বাবাও তার কর্মক্ষেত্রের ডে কেয়ার সেন্টারে রাখতে পারেন বাচ্চাকে; এবং দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারেন।”

বৈষম্যপূর্ণ কর্মক্ষেত্র

কর্মক্ষেত্রে নারী সাংবাদিকদের বিভিন্ন ধরনের ‘বৈষম্যমূলক’ আচরণের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন জনকণ্ঠের সাবেক সাংবাদিক নাসিমুন আরা হক।

তিনি বলেন, “মেয়েদের ভুলগুলো অনেক বড় করে দেখা হয় এবং অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা অনেকক্ষেত্রেই ছেলেদের সাথে করা হয় না।”

অনেক সংবাদপত্রেই সরকারের নির্ধারিত বেতনকাঠামো (ওয়েজবোর্ড) অনুযায়ী বেতন দেয় না, যেক্ষেত্রে নারী সাংবাদিকরা বেশি বৈষম্যের শিকার হন বলে নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুনের অভিযোগ।

‘আর্টিকেল ১৯’ এর একটি গবেষণা অনুযায়ী, নারী সাংবাদিকরা কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং সেন্সরশিপের শিকার হন। ৬৫ শতাংশ নারী সাংবাদিক প্রতিবেদন তৈরি এবং প্রকাশে বাধার সম্মুখীন হন।

একই বিটে কাজ করার পরেও বড় কিছু ঘটলে বা বড় ইভেন্ট থাকলে সেখানে পুরুষ সহকর্মীকে পাঠানো হয় বলে অনুসন্ধানকালে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন।

তবে এই অভিযোগ খ-ন করে জাহিদ নেওয়াজ খান বলেন, “মেয়ে হিসেবে নয় বরং দক্ষতার উপর ভিত্তি করেই কাজ দেওয়া হয়।”

তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাস্তবে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় নারী সহকর্মীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করতে হয় বলে মন্তব্য করেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সুমন মাহবুব।

আমাদের সময়ের ফিচার এডিটর শান্তা মারিয়া বলেন, বার্তাকক্ষ পুরুষরাই ‘আধিপত্যশীল’; সিদ্ধান্তগ্রহণকারী পর্যায়ে নারীর সংখ্যা খুব কম।
“বিভিন্ন গণমাধ্যমে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী পর্যায় ও উচ্চপদে আছেন এমন নারীর সংখ্যা অন্তত ৩০ জন। তবে এই সংখ্যাটা আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন।”
মাতৃত্ব ও পারিবারের দায়িত্ব

অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদকদের ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত থাকতে হয়। দীর্ঘদিন অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকতা করেছেন দৈনিক সমকালের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক নাহিদ তন্ময়। সম্পাদকের আপত্তির পরও নাহিদ ওই বিটে কাজ নিয়েছিলেন। কিন্তু মা হওয়ার পরে তিনি পছন্দের ওই বিট পরিবর্তন করে চলে যান অন্য বিটে।

“অফিসকে আর আগের মত কাজ দিতে পারছি না। স্বামী ঢাকার বাইরে থাকায় সন্তানের জন্য তটস্থ থাকতে হয়, যখন তখন বেরিয়ে পড়তে পারি না সংবাদের সন্ধানে। তাই ওই গুরুত্বপূর্ণ বিট ছেড়ে দিতে হয়েছে,” বলেন নাহিদ।

মাতৃত্বকালীন ছুটি চাওয়ায় এক পত্রিকার এক নারী সাংবাদিককে চাকরি হারাতে হয়েছে বলে জানান নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা।
তিনি বলেন, “একজন বিখ্যাত সাংবাদিকের মেয়ে, সে ম্যাটারনিটি লিভ চেয়েছে, তাকে অন্য কী বলে টার্মিনেট করে দিয়েছে। তারপর সে অন্য পেশায় চলে গেছে, এগুলো অনেক আছে।”

বেসরকারি টেলিভিশন নিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রধান বার্তা সম্পাদক শাহনাজ মুন্নী বলেন, সাংবাদিকতায় টিকে থাকার জন্য দক্ষতা বাড়ানো, পরিশ্রম করার সাথে সাথে অফিস ও পরিবারের সাপোর্টটাও মেয়েদের জরুরি।

“কারণ মেয়েদের অনেক স্পেশ্যাল নিড থাকে। আর ঘড়ি ধরে সাংবাদিকতা করা যায় না, এটা পরিবার অনেক সময় বুঝতে চায় না। অন্যান্য চাকরিতে যেমন ৯টা-৫টা অফিস, পরিবার বলে, এটা এমন নয় কেন? ছেড়ে দাও।”

পরিবহন সমস্যা

যে নারীরা সংবাদ সংগ্রহের কাজ করেন, তাদের মধ্যে টেলিভিশনের কর্মীরা বাদে বাকিরা কেউই পরিবহন সুবিধা পান না। ফলে যাতায়াতের সময় গণপরিবহনে নানান রকম হয়রানির শিকার হয়েও অনেকে সাংবাদিকতায় নিরুৎসাহিত হন।

নাসিমুন আরা বলেন, “আমি মনে করি সব নারী সাংবাদিকদের তখনও, এখনও প্রপার ট্রান্সপোর্ট নাই, এটা একটা সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটির ব্যাপার। এটা নিয়ে আমরা অনেক বলেছি, অনেক আন্দোলন করেছি, আমরা এটার সমাধান করতে পারি নাই।”

চ্যানেল আইতে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছেন মিথিলা হাবিবা নাজনীন। তিনি বলেন, একজন পুরুষ যখন সংবাদ সংগ্রহ করতে যান তখন একটা জটলার মধ্যে ভিড় ঠেলে প্রবেশ করাটা যতটা সহজ হয়, একজন নারীর জন্য ততটা হয় না।

“অনেক সময় ইচ্ছে করে আরো বেশি জটলা তৈরির চেষ্টা করে, একটু হয়রানি করার চেষ্টা করে, কিংবা অনেকসময় বাজে টোন শুনতে হয়। ”

যৌন হয়রানি

ফারজানা রূপা বলেন, বার্তাকক্ষে যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে সব ধরনের বৈষম্যপূর্ণ ঘটনার শিকার হতে হয় নারীদের।

আর্টিকেল নাইনটিন’র একটি গবেষণায় বলা হয়, ৪০ শতাংশ নারী সংবাদকর্মী যৌন নিপীড়নের শিকার হন এবং তারা নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিবাদ করেননি চাকরি হারানোর ভয়ে।

তবে কোথাও কোথাও অভিযোগ করলে প্রতিকারও পাওয়া যায়। এরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল গতবছর একটি ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদ মাধ্যমের অফিসে। লিফটে করে নামার সময় খুবই স্বল্পপরিচিত এক পুরুষ কলিগের অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শ টের পান এক নারী সাংবাদিক। অভিযোগ করার পরে সেই সহকর্মীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

কিন্তু অনেকেই ভয়ে এসব হয়রানির কথা প্রকাশ করেন না জানিয়ে নাসিমুন আরা ভুক্তভোগী নারী সাংবাদিকের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের একটি ঘটনা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “মেয়েটির বস একদিন বলছেন, আজ অফিস শেষে আমার বাসায় এসো, তোমার ভাবি নেই। ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বোঝার পরেও বসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে টিকে থাকতে পারবে না ভেবে মেয়েটি চাকরি ছেড়ে দিল।”

যৌন নিপীড়ন বন্ধে ২০০৯ সালের ১৫ মে হাইকোর্টের প্রণীত নীতিমালায় দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানির বিষয়ে বাধ্যতামূলকভাবে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট অভিযোগ কেন্দ্র গঠন করাসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো সংবাদ মাধ্যমেই যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ সেল বা কমিটি নেই।

প্রথম আলোর মানসুরা বলেন, “আমাদের অফিসে যৌন হয়রানি বন্ধের একটা কমিটি থাকলেও হাই কোর্টের রুল অনুযায়ী যেভাবে থাকার কথা সেভাবে নেই। ”

যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ সেল বা কমিটি না থাকার কারণ জানতে চাইলে জাহিদ নেওয়াজ বলেন, “এধরনের ঘটনা ঘটে না, অথবা ঘটলেও তারা (নারীরা) বলে না, ফলে কমিটি করার প্রয়োজন পড়েনি।” সূত্র : বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ