প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অ-সংক্রামক রোগে অসহায় কোটি মানুষ

ডেস্ক রিপোর্ট : জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পুরম্নষ ওয়ার্ডের ফ্লোরে কাতরাচ্ছেন সুধীর চন্দ্র শীল (৬০)। হার্টের সমস্যা নিয়ে ১ এপ্রিল চাঁদপুরের মতলব থেকে এই হাসপাতালে এসেছেন তিনি। পেশায় সেলুনকর্মী।
সম্পদ বলতে তিন কাঠা বসতভিটা। পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়ে চিকিৎসা নিতে এখানে এসেছেন সুধীর। সঙ্গে এসেছেন স্ত্রী গীতা রাণী শীল ও ছেলে অধীর চন্দ্র শীল। এরই মধ্যে বিভিন্ন পরীক্ষা ও থাকা-খাওয়ার পেছনেই ২০ হাজার টাকা শেষ হয়ে গেছে।

ডাক্তার প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন, হার্টে ছিদ্র। সুস্থ হতে লাগবে এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা। দ্রম্নত সময়ে অপারেশন করতে হবে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে হার্টের বাইপাস সার্জারি করাতে হবে। একথা শুনে মাথায় হাত স্ত্রী গিতা রাণী শীলের। এত টাকা এক সঙ্গে সংগ্রহ করার সামর্থ্য নেই।
শুধু গীতা রাণী শীলের স্বামী অধীর শুধু নন, তার মতো হাজারও মানুষ ভুগছেন এসব রোগে। স্বল্প আয়ের পরিবারের পক্ষে চিকিৎসা নেয়া কঠিন।
শুধু জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নয়, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনেও হতদরিদ্রদের ভিড়। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে কাগজপত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছেন কবির আহমেদ (৩৮)। গুলশান-২ নম্বরে তিনি গার্ডের কাজ করতেন। স্ত্রী রহিমা, সন্ত্মান ইমরান হোসেন, কামরম্নল হোসেন ও কামরম্নননেসাকে নিয়ে কড়াইল বস্ত্মিতে বসবাস করেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছর আগে ভোলার লালমোহন থেকে ঢাকায় এসেছে এই পরিবার।
কড়াইল বস্ত্মিতে দুই হাজার টাকা ঘর ভাড়া, সঙ্গে প্রতি মাসে সংসারের খরচ আরও চার হাজার টাকা। এখন কবির আহমেদের স্ত্রী রহিমা বাসাবাড়িতে বুয়ার কাজ করেন। ব্যয়বহুল রোগ নিয়ে বিপাকে কবির।
কবির আহমেদের তথ্য অনুসারে কড়াইল বস্ত্মিতে সরেজমিন ঘুরে এ রকম অনেক রোগী দেখা গেছে। কড়াইল বস্ত্মির সামছুন নাহার (৩৫) কিডনি রোগে আক্রান্ত্ম। প্রায় পাঁচ বছর ধরে ডানপাশের কিডনিতে সমস্যা। বর্তমানে এই কিডনি প্রায় অকেজো। বাঁ-পাশের কিডনিও ভালো কাজ করে না। গুলশানে জনৈক শহিদুল হোসেনের বাসায় প্রায় ১৫ বছর ধরে বুয়ার কাজ করেন। সেই শহিদুল একবার অ্যাপোলো হাসপাতালে সামছুন নাহারকে চিকিৎসা করিয়েছিলেন। প্রায় বছর দেড় হলো মারা গেছেন শহিদুল। এখন সামছুন নাহারের পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই।
স্বামী হোসেন আলী কোনো রকম রিকশা চালিয়ে সংসারের ভার সামাল দিচ্ছেন। গরিব স্বামীর পক্ষে কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয় বলে কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান সামছুন নাহার। সামছুন নাহারের জন্মস্থান কিশোরগঞ্জের নিকলীতে।
সামছুন নাহার বলেন, ‘দুইটা কিটনি (কিডনি) নষ্ট। একন ট্যাকার অভাবে ওষুধ কিনতে পারি না। তিন মাস পরপর পরীক্ষা করতে বলে। এখন তো ওষুধই খাইতে পারি না পরীক্ষা করবো ক্যামনে। ডান সাইডের কিটনিটা এক্কেবারে শুকাই গ্যাছে গা, বাম সাইডেরটা কোনো রকম আছে। এখন মরণ ছাড়া উপায় নাই।’
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এসব রোগে আক্রান্ত্ম ব্যক্তিদের ডায়াবেটিস ছিল। নিয়মিত ধূমপান করতেন, পানে জর্দাও খেতেন অনেকে।

অ-সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের উপায়
ধূমপান অথবা তামাক পরিহার করা। সপ্তাহের অধিকাংশ দিন আধ ঘণ্টার করে হাঁটা ও হালকা ব্যায়াম করলে এই রোগে উপকার মিলবে। স্বাস্থ্যকর ও পরিমিত খাবার হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষা দেবে। অ-সংক্রামক রোগ থেকে মুক্তি পেতে চর্বি ও লবণযুক্ত খাবার কম খাওয়া এবং বেশি করে সবজি, ফল, দানাদার শস্য, কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া জরম্নরি। কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরম্নরি।
নিয়মিত শরীরচর্চার অনেক উপকার রয়েছে ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে এটি ওজন কমাবে, রক্তে শর্করার পরিমাণ কমিয়ে আনবে, আর ইনসুলিনের সক্রিয়তাকে বাড়িয়ে রক্তে শর্করার পরিমাণ মাত্রার মধ্যে রাখবে।
এই বিষয়ে কার্ডিওলজি (হৃদরোগ) বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডাক্তার নজরম্নল ইসলাম বলেন, ‘আগে সংক্রামক রোগ নিয়ে ভয় করতাম। কিন্তু এখন অ-সংক্রামক রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্ত চাপ, ইউরিক এসিড, গ্যাসট্রিক, কিডনিরোগ, হৃদরোগ, ক্যান্সার, হাঁপানি ও আর্থরাইটিস্‌ ভয়ের কারণ। তবে মনে রাখতে হবে অ-সংক্রামক রোগে আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করি। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও একটু সচেতন হলে এসব রোগের ঝুঁকি থেকে মুক্তি পেতে পারি। ধূমপান ও জাঙ্ক ফুড থেকে দূরে থাকতে হবে। আমরা মডার্ন হয়ে গেছি, গাড়িতে চলতে অভ্যস্ত্ম হয়ে গেছি। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট পায়ে হাঁটতে হবে। সুগার ও কোলেস্টেরল লেবেল কমিয়ে আনতে হবে। প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করাও জরম্নরি। এই কাজগুলো করলে অ-সংক্রামক রোগ থেকে পরিত্রাণ মিলবে বলে আমি মনে করি।’
অ-সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা করছে আইসিডিডিআরবির (ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়ারিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশ)। আইসিডিডিআরবি সূত্র জানায়, এগুলোকে অ-সংক্রামক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হৃদযন্ত্রের রোগ, ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুসের রোগ এবং ডায়াবেটিস। বাংলাদেশে প্রায় ৬১ শতাংশের অধিক অ-সংক্রামক রোগে মারা যায়। এদের বড় একটা অংশ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারে আক্রান্ত্ম।
আইসিডিডিআরবি সূত্র জানায়, দশে ৫০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছেন। আর উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন একে কোটি ২০ লাখ মানুষ। দেশে ১০ থেকে ১১ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত্ম পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ৯৪ শতাংশই কমপক্ষে একটি অ-সংক্রামক রোগের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন পুষ্টিবিজ্ঞানী ও আইসিডিডিআরবির গবেষক সোহানা শফিক।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিভিন্ন রোগের কারণে মারা যাওয়াদের মধ্যে ৬০ শতাংশই মারা যাচ্ছেন অ-সংক্রামক রোগে। আগে কমিউনিকেবল (সংক্রামক) রোগে বেশি মানুষ মারা যেতেন। এখন বেশি মানুষ মারা যান নন-কমিউনিকেবল বা অ-সংক্রামক রোগে। উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে এই রোগ বেশি বলে আগে আমাদের ধারণা ছিল। কিন্তু গবেষণা করে দেখেছি, নগরায়নের ফলে দরিদ্র মানুষের মধ্যে নন-কমিউনিকেবল রোগ বাড়ছে। খাবারে প্রচুর লবণ খাওয়া ও পরিমিত শাক-সবজি ও ফলমূল না খাওয়ার কারণে দরিদ্রদের দেহে বাড়ছে এই রোগ। এদের খাবারে বৈচিত্র্য থাকে না, ফলে শুধু ভাত খেয়ে পেট ভরতে হয়, এতে কার্বোহাইড্রেডের পরিমাণ বাড়ে। বাড়ে নানা রোগ। ফলে নন-কমিউনিকেবল রোগ এসব পরিবারকে আর্থিকভাবে ধ্বংস করে দেয়। সবাইকে এখনই সচেতন হতে হবে। নিয়মিত শাক-সবজি ও ফলমূল খেতে হবে। নিয়মিত হাঁটাচলাসহ ধূমপান ও তামাক ছাড়তে হবে। তবেই আমরা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ থেকে রক্ষা পাব।’
সরকার ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, কলেরা, কালাজ্বর, কুষ্ঠ, গুটিবসন্ত্ম, গোদ রোগ, দাদ, ডেঙ্গুজ্বর, ধনুষ্টঙ্কার ও যক্ষ্ণার মতো রোগ বা সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার বিনামূল্যে এসব রোগের চিকিৎসাও দিচ্ছে। অথচ অ-সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সংক্রামক রোগ নিরাময়ে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়া হলেও অ-সংক্রামক রোগে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না।
এই বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) সানিয়া তহমিনা বলেন, সরকার সংক্রামক রোগ নির্ণয়ে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, কলেরা, কালাজ্বর, কুষ্ঠ, গুটিবসন্ত্ম, গোদ রোগ, ডেঙ্গুজ্বর, দাদ ও ধনুষ্টঙ্কার নিয়ন্ত্রণে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিচ্ছে। তবে অ-সংক্রামক রোগ নির্ণয় ও বিনামূল্যে চিকিৎসার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে তার জানা নেই।
অ-সংক্রামক রোগের বিষয়ে সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরম্নলস্নাহ চৌধুরী বলেন, অ-সংক্রামক রোগে গরিব-ধনি সবাই অসহায়। সরকারকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। গরিব মানুষকে ভর্তুকি দিয়ে এনসিডির (নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ) চিকিৎসা দিতে হবে। সবার জন্য ওষুধের দাম কমাতে হবে। ওষুধের ক্ষেত্রে ভর্তুকিও বাড়াতে হবে। এটা না করলে সাধারণ মানুষ অ-সংক্রামক রোগের কাছে আত্মসমর্পণ করবে, জীবন নীরবে বিলিয়ে দেবে। বাংলা নিউজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত