প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাস চাপায় পা হারা রোজিনার মৃত্যু সেপ্টিসেমিয়া ও কিডনি জটিলতার প্রভাবে

রিকু আমির : ঢাকার বনানীতে বাস চাপায় পা হারানোর নয়দিনের প্রান্তে গৃহকর্মী রোজিনা মৃত্যু হয় সেপ্টিসেমিয়া এবং দুর্ঘটনা থেকে সৃষ্ট কিডনি জটিলতার প্রভাবে।
রোববার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের হায়ার ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) তে জিটিভির এডিটর ইন চিফ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার এই গৃহকর্মীকে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। ময়না তদন্ত ছাড়াই এদিন তার মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামে নিয়ে যান বাবা ও স্বজনরা।
২০ এপ্রিল দুর্ঘটনার পর রোজিনাকে নেয়া হয়েছিল ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে। সেখানে অপারেশন করে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ তার ডান পা কেটে ফেলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু ক্ষতস্থানে সেপ্টিসেমিয়া বিস্তার লাভ করায় আবার অপারেশন করে আরও কিছু অংশ কেটে ফেলা হয়, কাটা অংশ উরুর খুব কাছে পৌঁছেছিল। তারপরও অবস্থার অবনতি ঘটলে ২৫ এপ্রিল রেফার্ড করা হয় ঢামেক হাসপাতালে।
‘কলেজ ছাত্র রাজীবের মাথায় গুরুতর আঘাত ছিল, যেটা তাকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে। কিন্তু রোজিনার এমন আঘাত ছিল না, তারপরও কেন তার মৃত্যু?’ এমন প্রশ্ন করা হয় রোজিনার চিকিৎসায় গঠিত নয় সদস্যের মেডিকেল বোর্ড সদস্য এবং শেখ হাসিনা ন্যাশনাল বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা অধ্যাপক সামন্ত লাল সেনের কাছে।
রোববার দুপুরে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, রোজিনার সেপ্টিসেমিয়া হয়ে যায়। রক্ত সংক্রমিত হয়, যা খুব দ্রুত তার সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে। এটাই তার মৃত্যুর কারণ বলে মনে করেন তিনি।
ওই একই প্রশ্নে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক আবদুল গণি রোববার বিকালে এ প্রতিবেদককে বলেন, খুব মারাত্মক অবস্থায় রোজিনাকে পঙ্গু হাসপাতালে আনা হয়। প্রথম অপারেশনের পরদিনই তার জ্বর আসে। এটা খারাপ লক্ষণ। এর মাধ্যমে বোঝা গিয়েছিল, তার মধ্যে সেপ্টিসেমিয়া গ্রো করতে শুরু করে। এরপর বোঝা যায়, তার কিডনিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই নেতিবাচকতার ফলে রেফার্ডের আগের দিন ২৪ ঘণ্টায় মাত্র দুইশ সিজি এবং রেফার্ডের দিক সকালে মাত্র ৭০০ সিজি মূত্র নির্গত হয় তার দেহ থেকে। এরপরপরই তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে রেফার্ড করা হয়। এছাড়া তার ফুসফুসেও সমস্যা দেখা দেয়, শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
আরেকটি প্রশ্নে তিনি বলেন, তার ক্ষতিগ্রস্থ পায়ের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, ছেঁড়া কাপড়ের অংশ ঝুলছে। তার হাড় আলাদা হয়েছিল এবং হাঁটুর উপরে মাংশপেশী মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। ইনফেকশন এড়াতে অপারেশনের পর ক্ষতস্থানে খুব ঘনঘন ড্রেসিং করা হতো। তারপরও মেয়েটার এই অবস্থা হলো।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থোপেডিক্স বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক কৃষ্ণ প্রিয় দাশকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সাধারণত এইসব রোগীদের মৃত্যুর অন্যতম একটি কারণ ইনফেকশন, সেপ্টিসেমিয়া। এছাড়া দুর্ঘটনা থেকে সৃষ্ট হতে পারে কিডনি, ফুসফুসের সমস্যা। এ থেকেও মৃত্যু ঘটতে পারে।
রোজিনার জন্য আরও ভাল চিকিৎসা নিশ্চিত করা যেত কি-না এমন প্রশ্নে সামন্ত লাল সেন বলেন, দেশের যতো সেরা হাসপাতালেই নেয়া হোক না কেন, তারা যে পথে চিকিৎসা করতেন, আমরাও সে পথে হেঁটেছি। বিদেশে নিলেও একই পথে হাঁটা হতো, শুধু পরিবেশটা আমাদের চেয়ে ভাল হতো।
একই প্রশ্নে অধ্যাপক আবদুল গণি বলেন, এমন রোগী তো আমাদের হাসপাতালে বহু আসছে-যাচ্ছে। তারা প্রাণে বেঁচে যাচ্ছেন। কিন্তু এই মেয়েটার এমন হলো। তার ব্যাপারে আমরা বেশ যতœশীল ছিলাম। অপারেশনের পর তার কিডনির যে সমস্যা দেখা দেয়, সেটা টের পাওয়ার পরপরই ঢাকা মেডিকেলে রেফার করা হয়। একটু সময়ও উৎক্ষেপণ করা হয়নি। যদি আমাদের এখানে কিডনি বিশেষজ্ঞ থাকত, তাহলে রেফার্ড করা হতো না। তাকে যে অবস্থায় পঙ্গু হাসপাতালে আনা হয়েছিল, সে অবস্থায় বিদেশে নেয়া কীভাবে সম্ভব? প্রস্তুতি নিতে নিতেই তো অবস্থা খারাপ হয়ে যেত।
বেশ দুঃখ প্রকাশ করে অধ্যাপক আবদুল গণি বলেন, ভেবেছিলাম আজ (গতকাল রোববার) ছুটির দিনে ডা. সেনকে কল করে মেয়েটার খবর নেব, প্রয়োজনে দেখতে যাব। বাট তার মৃত্যুতে আই এম ভেরি শকড্।
দুঃখ প্রকাশ করে অধ্যাপক সামন্ত লাল সেন বলেন, আজকের দিনে আমার মোবাইলের প্রথম কল ছিল রোজিনার মৃত্যু সংবাদ। আমি বেশ মর্মাহত। কতো মৃত্যুপথযাত্রীকে আমরা সুস্থ্য করেছি। কিন্তু এই মেয়েটার জন্য কিছু করতে পারলাম না, সময় পেলাম না।
রোজিনার বাবার নাম রসুল মিয়া ও মা রাবেয়া বেগম। আট বছর আগে জীবনের প্রথম গৃহকর্মী হিসেবে রোজিনা কাজ শুরু করেন সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার বাসায়। রসুল-রাবেয়া দম্পত্তির ৬ মেয়ে ও ২ ছেলের মধ্যে রোজিনা দ্বিতীয়।
বাবা-মা ও পাঁচ ভাইবোনের অন্নবস্ত্রের উৎস ছিলেন রোজিনা।
ঢাকায় দুই বাসের রেষারেষিতে হাতহারা কলেজ ছাত্র রাজীবের পর ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার ঘোষগাওয়ের মেয়ে রোজিনার মৃত্যু এরই মধ্যে বেশ আলোচিত হয়ে উঠেছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ