প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঢাকায় মামলা বাড়ছে, ফিরছে না শৃঙ্খলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক কয়েকটি দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সড়কের বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে সমালোচনার ঝড় বইছে। সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ সেলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে এক হাজার ৭৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার ৮৪১ জনের প্রাণহানি ও পাঁচ হাজার ৪৭৭ জন আহত হন। আহতের মধ্যে ২৮৮ জন সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রতি মাসে রাজধানীর রাস্তায় ট্রাফিক-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বাড়ছে। তবে দুর্ঘটনা রোধে এর কোনো কার্যত প্রভাব পড়ছে না। নিজেদের তৎপরতা জাহির করতে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বেশি বেশি মামলা নথিভুক্ত করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ কোনো উদ্যোগ বা পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. সারওয়ার জাহান বলেন, শুধু মামলা করে ট্রাফিক শৃঙ্খলা আনা যায় না। দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয় করা দরকার। এরপর তা নিরসনে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। রাজধানীতে বাসের জন্য এত রুটের অনুমতি দেওয়া কতটা যৌক্তিক তাও চিন্তা করা দরকার।

মামলা বাড়ছে, পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না :চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে রাজধানীতে ট্রাফিক আইন অমান্য করায় ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৩৪টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে ৭৫ হাজার ৯১১টি মামলা হয়েছে। এই তিন মাসে ভিডিও মামলা হয়েছে ২৩ হাজার ৫২৩টি। রাজধানীর ট্রাফিক বিভাগ চারটি ইউনিটে বিভক্ত। তা হলো- উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম। চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীতে উল্টো পথে যানবাহন চলাচলের কারণে মামলা হয়েছে ৬ হাজার ৯৬৮টি। ফেব্রুয়ারিতে মামলার সংখ্যা ৫ হাজার ৭৮৭টি এবং মার্চে মামলা হয়েছে ৭ হাজার ৬৭০টি। তিন মাসে সড়কে জরিমানা আদায় হয়েছে ১৩ কোটি ৮৩ লাখ ৯ হাজার ১৩৬ টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ মামলা হয়েছে পূর্ব বিভাগে।

তিন মাসে ৬৩ হাজার ৮১২টি মামলা দায়ের হওয়ায় এই ইউনিটকে সেরা বিভাগের পুরস্কারও দেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, এই সময়ে পশ্চিম বিভাগে মামলা হয়েছে ৬০ হাজার ৭১৪টি, উত্তর বিভাগের মামলার সংখ্যা ৬২ হাজার ৯৫২ এবং দক্ষিণ বিভাগের মামলা ৪০ হাজার ২৫৬টি। সমকাল

সংশ্নিষ্টরা জানান, কোনো থানায় চুরি-ছিনতাইয়ের মামলা বেশি হলে পুলিশের গাফিলতি হিসেবে তা বিবেচিত হয়। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশের ক্ষেত্রে ‘ভালো-মন্দ’ ইউনিট নির্ধারণ করা হয় মামলার সংখ্যার ভিত্তিতে। তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি মামলা দায়েরের প্রবণতা কাজ করে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাই এভাবে শ্রেষ্ঠত্ব বিবেচনার প্রক্রিয়াটি সর্বক্ষেত্রে সঠিক না হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলেও মন্তব্য করেন তারা।

মোটরসাইকেল সংক্রান্ত মামলা সবচেয়ে বেশি :পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকায় রাস্তায় মোটরসাইকেল নিয়ে আইন অমান্যের ঘটনায় মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শুধু মোটরসাইকেল সংক্রান্ত ঘটনায় মামলা হয়েছে ২১ হাজার ৩১৪টি। এ সময় মোটরসাইকেল আটক হয়েছে ২৫৮টি। ফেব্রুয়ারিতে মামলার সংখ্যা ১৯ হাজার ৫৫৩টি এবং জব্দ হয়েছে ১৪৫টি মোটরসাইকেল। মার্চে মোটরসাইকেল সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৩১ হাজার ৩৩৯টি। জব্দ করা হয়েছে ৩৯৯টি। পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে ভিডিও মামলার ওপর তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। যদি কোনো নাগরিক রাস্তায় আইন অমান্য করেন তাহলে ভিডিওচিত্রে সেই দৃশ্য ধারণ করে মামলা দায়েরের তথ্যসহ সংশ্নিষ্ট ব্যক্তির ঠিকানায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন পুলিশ।

চালক ও সহকারীদের নিয়ে কর্মসূচি :গত কয়েক সপ্তাহে ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চালকের খামখেয়ালি ও আইন অমান্য করার প্রবণতাকে দায়ী করছেন নগরবাসী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মীর রেজাউল আলম  জানান, সড়কের নৈরাজ্য দমনে চালক ও তাদের সহকারীদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা বাড়াতে প্রতি মাসে বিভিন্ন টার্মিনালে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মামলার সংখ্যার ভিত্তিতে পুলিশ বাহিনীর কোনো ইউনিটকে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। এ ক্ষেত্রে আরও অনেক মানদণ্ড বিবেচনায় রাখা হয়। তাই নিজেদের কর্মকাণ্ড জাহির করার জন্য বেশি বেশি মামলা দায়ের করা হয় এমন অভিযোগ সঠিক নয়।

ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ জানান, চালক ও সহকারীদের আইন অমান্য করার সংস্কৃতি পাল্টাতে একাধিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে সভা করে তাদের এ ব্যাপারে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। এরপরও কেউ আইন অমান্য করলে মামলা হবে। তবে মামলা করে রাতারাতি পরিস্থিতি পাল্টানো যাবে না বলেও মন্তব্য করেন এনায়েত উল্লাহ।

ট্রাফিকের উত্তর বিভাগের ডিসি প্রবীর কুমার রায় বলেন, চালক ও তাদের সহকারীদের নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। প্রতি ব্যাচে ৩০ জনকে এ কর্মশালায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কর্মশালায় আইন মানার ব্যাপারে প্রেরণামূলক বক্তব্য দেওয়া হবে।

সাত চ্যালেঞ্জ :ট্রাফিক পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, আগামীতে তাদের সাত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে ট্রাফিক পুলিশের ত্রৈমাসিক সভায় এসব এ নিয়ে আলোচনা করেন তারা। চ্যালেঞ্জগুলো হলো- বর্ষায় জলাবদ্ধতা থেকে শুরু করে যানজট মোকাবেলা, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের কারণে আশপাশ এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা, রাজপথ হকার ও ফুটপাতমুক্ত রাখা, রোজায় রাজধানীতে যানজট সহনীয় রাখা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ