প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যৌন নির্যাতনের শিকার নারীর পাশে কেউ নেই!

নিজস্ব প্রতিবেদক : সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের ভেতরে সারি সারি বাসের পেছনে খোলা স্থানে ১৮ বছরের মেয়েটির ওড়না টেনে ধরে বাসে তোলার চেষ্টা চলছে। একপর্যায়ে মেয়েটি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে পালাতে সক্ষম হন এবং অন্য এক পথচারীর সহযোগিতায় কুমিল্লা যাওয়ার বাসে ওঠেন। গত বুধবার রাতের ঘটনা এটি। মেয়েটি পুলিশের কাছে না গিয়ে ভয়ে দ্রুত টার্মিনাল এলাকা ত্যাগ করেন বলে জানা যায়। এদিকে মোহাম্মদপুরে ফুটপাত দিয়ে সন্ধ্যায় হেঁটে যাচ্ছিলেন এক বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী। হঠাৎ চার যুবক পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওড়না টেনে নেয় এবং মেয়েটির গায়ে চিমটি কেটে শিস দিতে দিতে চলে যায়। মেয়েটি বাসায় গিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া ভিডিওচিত্রসহ ফেসবুকে সংযুক্ত করে তীব্র প্রতিবাদ জানান। মেয়েটির প্রশ্ন, রাস্তায় এত মানুষ, কেউ তার প্রতিবাদ পর্যন্ত কেন করল না।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ডিএমপিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলামোটরের পর গত দেড় মাসে শুধু রাজধানীতেই বাসে, সড়কে ও মার্কেটে আরো অন্তত ২৩টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বাড্ডার ঘটনায় তিনজন ও নিউ মার্কেটের ঘটনায় চারজন আসামি গ্রেপ্তার হয়। আরো কিছু ঘটনায় তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ। তবে বেশির ভাগ ঘটনায় বখাটে ধরা পড়েনি।

গত ৭ মার্চ রাজধানীর বাংলামোটরে এক কলেজছাত্রী অনেক মানুষের ভিড়ে যৌন হয়রানির শিকার হন। ওই ঘটনায় রাজধানীর রমনা থানায় মামলা করা হলেও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল শনিবার বলেন, ওই ছাত্রীর বর্ণনা অনুযায়ী কমপক্ষে ১০ জন বখাটে তাঁকে উত্ত্যক্ত করে। ওই কলেজছাত্রীকে ‘যৌন হয়রানি’ ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে মন্তব্য করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে। কালের কণ্ঠ

তদন্তসংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, এখন যৌন নিপীড়নের ঘটনার প্রতিবাদ করতে ফেসবুক বেছে নিয়েছে নারীরা। বিশেষ করে তরুণী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই প্রবণতা বাড়ছে। এটা আগে তেমন একটা ছিল না। তবে যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত ঘটনায় ফেসবুকের সব তথ্য সত্য নয়।

‘বাসভর্তি মানুষ। আমি তাদের বলি নাই আপনারা লোকটাকে মারুন, পেটান। আমি শুধু চেয়েছিলাম মানুষগুলো লোকটাকে বলুক সে অন্যায় করছে। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য। বাসভর্তি অমানুষ ছিল। অপদার্থ ব্যক্তিত্বহীন কতগুলো যাত্রী ছিল। গুগল থেকে কোতোয়ালি থানার ওসির নাম্বার বের করে ফোন দেই। এরপর অপরাধীরা ধরা পড়ে।’ ঘটনাটি ময়মনসিংহের এবং হয়রানির কথাগুলো মেয়েটি ফেসবুকে শেয়ার করেছিলেন। ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার ওসি মো. মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘ফোন পাওয়ার পর তাত্ক্ষণিকভাবে আমি ব্যবস্থা নেই। ওই বখাটে এবং দুই সহযোগীসহ চালককে আটক করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

শুধু ফেসবুক নয়, নারীরা পথেও নামছেন প্রতিবাদ করতে। হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে গত শুক্রবার রাজধানীর শ্যামলীতে কানিজ ফাতেমা নামের এক শিক্ষার্থী প্রতিবাদ করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাতে আমার এ উদ্যোগ।’ কয়েক দিন আগে উত্তরা এলাকায়ও একা একজন নারী রাস্তায় দাঁড়িয়ে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করেছেন।

গত বুধবার রাতে ঠিকানা পরিবহনের একটি বাসে আসাদগেট থেকে আজিমপুর যাওয়ার পথে যৌন হয়রানির শিকার হন এক তরুণী। সঙ্গে তাঁর মা-ও ছিলেন। মেয়েটির অভিযোগ, তিনি এ ঘটনায় সাহায্য চাইলে একজন কনস্টেবল বলেন, ‘এ রকম ছোটখাটো হয়রানি হয়েই থাকে।’ জানা গেছে, দুই বখাটে যারা তরুণীটিকে হয়রানি করছিল তারা ‘স্যরি’ বলে পার পেয়ে গেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. সালাউদ্দিন আজিমপুরের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, পুলিশ তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে বখাটেদের শাস্তি দিয়েছে।

গত ২১ এপ্রিল বাড্ডা এলাকা থেকে আসার সময় তুরাগ পরিবহনের একটি বাসে হয়রানির শিকার হন উত্তরা ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রী। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পুলিশ বাসের চালক রোমান, সহকারী নয়ন ও মনিরকে গ্রেপ্তার করেছে। গত ১৯ এপ্রিল রাজধানীর বাসাবোর বুদ্ধমন্দির এলাকায় লাব্বাইক বাসে দুই শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির শিকার হয়ে ট্রাফিক পুলিশকে জানালে তিনি কোনো সহযোগিতা করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।

একইভাবে সম্প্রতি লালমাটিয়া মহিলা কলেজের এক ছাত্রী মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার একটি মার্কেটে ওড়না কিনতে গিয়ে যৌন হয়রানির শিকার হন। মেয়েটি পরে ফেসবুকে লিখেন, ‘চোখে পানি চলে আসে, চারপাশে এত মানুষ, তবু কোথাও যেন কেউ নাই!’ পরে মেয়েটি মিরপুর থানা পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মিরপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মামুন ও ওসি নজরুল ইসলামের সহযোগিতায় মতিন মুন্সি নামের ওই অভিযুক্ত ধরা পড়ে। এরপর সে থানায় মেয়েটির পা ধরে ভুল স্বীকার করে। মিরপুর থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ওই ছাত্রীর কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পরপরই ব্যবস্থা নেই। তবে এ ধরনের ঘটনায় অভিযোগ পাওয়া পাত্রই অর্থাৎ তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হয়। এতে যেমন এ ধরনের অপরাধ কমবে, তেমনি সমাজে খারাপ লোকের তৎপরতা কমবে।’ কালের কণ্ঠ

এভাবে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো তরুণী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। তবে সব ঘটনায় থানায় মামলা করা হয় না। আবার জিডি যদি কেউ করেও অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত হয় না। বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে উঠে এসেছে, গণপরিবহনে যাতায়াত করে এমন ৯৪ শতাংশ নারীই যৌন হয়রানির শিকার হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যৌন হয়রানির অনেক অভিযোগের তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এ ধরনের কয়েক শ অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। বছর তিনেক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় পহেলা বৈশাখে নারী নিপীড়নের ঘটনায় জড়িত আট বখাটের সাতজনকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, আগে চলন্ত বাসে যেসব নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোতে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কিছু দিন আগে টাঙ্গাইলে রুপা হত্যার ঘটনায় একটি মাইলফলক রায় এসেছে। কিন্তু অনেক নির্যাতনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত রায় হয়নি। তিনি বলেন, রাজধানীর কুড়িলে মাইক্রোবাসে গারো কিশোরী ধর্ষণের বিচার এখনো শেষ করা সম্ভব হয়নি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত