প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মুগদা-মাণ্ডায় পানির জন্য ছোটাছুটি

ডেস্ক রিপোর্ট : সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠেছেন মর্জিনা বেগম (২৫)। ঘুম থেকে উঠে মুখ ধোয়ার জন্য ওয়াশ রুমে যান। গিয়ে দেখেন পানির লাইনে কোনো পানি নেই। বাধ্য হয়ে দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটে যান পানির পাম্পে। সেখান থেকে এক জগ পানি আনেন তিনি। এরপর সেই পানি দিয়ে সাত বছরের বাচ্চা, স্বামী ও নিজের মুখ ধোয়ার কাজটি সারেন। পরে দোকান থেকে পানির বোতল কিনে নাশতা করেন। অন্যদিকে শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টা বাজলেও রান্না চড়াতে পারেননি। কারণ পানি নেই। আর সেই পানি কখন আসবে তাও জানেন না এই গৃহিণী।

মর্জিনা বেগম জানান, ঝিলপাড় এলাকার বাসিন্দারা গত এক সপ্তাহ ধরে ঠিকভাবে পানি পাচ্ছেন না। সকালে পাঁচ-দশ মিনিট পেলেও তাতে রান্নাবান্না আর গৃহস্থালীর অন্যান্য কাজ হলেও, গোসল হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অনেক গার্মেন্ট কর্মী তাদের কর্মস্থলে এবং বাকিরা খানিক দূরত্বের আত্মীয়স্বজনের বাসায় গিয়ে গোসলের কাজটি সারছেন বলেও জানান তিনি।

শুধু মাণ্ডা নয়, রাজধানীর দক্ষিণ মুগদা ব্যাংক কলোনি ও মুগদা এলাকাতেও চলছে পানির তীব্র সংকট। সম্প্রতি পানির সংকট এতটাই তীব্র আকার ধারণ করেছে যে, গৃহিণীরা তিন বেলার রান্না এক বেলাতেই সারছেন এবং সকাল-দুপুরের খাবার কেউ কেউ হোটেলেই সারছেন।

সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ওই এলাকার বাড়ির মালিকরা। পানি সংকটের কারণে অনেক ভাড়াটিয়া বাসা ছেড়ে অন্যত্র যাচ্ছেন। বিষয়টির সমাধানে ওয়াসাকে কয়েক দফা আবেদনও জানিয়েছেন এলাকাবাসী। কিন্তু এখনো কোনো সমাধান হয়নি। উল্টো ভোগান্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে। অথচ এ মহল্লার বাসিন্দারা প্রতি মাসে চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঢাকা ওয়াসাকে বিল পরিশোধ করছেন। কিন্তু বাস্তবে পানি সমস্যা দূর হচ্ছে না। সব মিলিয়ে ওই এলাকার মানুষ এখন চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন।

ওই তিন এলাকায় যে পানির সংকট চলছে তার বাস্তব চিত্র পাওয়া গেল চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে। দুপুর ১২টার দিকে কয়েকজন নারী-পুরুষ সারি দিয়ে লাইনের টেপ থেকে পানি নিচ্ছেন। জিজ্ঞেস করতেই গোলাম আলী নামের একজন বলে উঠলেন, ‘জানেন না, এই এ্যালাকায় পানি নাই! স্বাদে পানি লইয়া যাই!’

পানির অভাবে কেউ কেউ বৃষ্টির পানি কখন আসবে তার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। এমন একজন চম্পা বেগম। মাদরাসা রোডের ১০৪ নম্বরের বাসাটিতে প্রায় এক যুগ ধরে থাকেন তিনি। আগেও পানির সংকট হয়েছে কিন্তু সম্প্রতি এমন সংকট আর তিনি দেখেননি বলে জানান।

চম্পা বেগম জানান, দিনের কোনো এক সময় হঠাৎ করে পানি আসছে, আবার দুই-চার মিনিট থেকেই চলে যাচ্ছে। তা দিয়ে পারিবারিক কোনো কাজও সারানো যাচ্ছে না। ওয়াসার লাইনের পানির জন্য অপেক্ষা না করে তাই তারা কয়েক দিন থেকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখছেন। আর তা দিয়ে বিভিন্ন সময় রান্নার কাজটি সারছেন।

চম্পা বলেন, ‘আকাশটা ডাকলেই দোয়া করি, কখন পানি আসবে।’

চম্পার সঙ্গে থাকা প্রতিবেশী মাইমুনা আক্তার প্রিয়.কমকে বলেন, ‘দ্যাখেন পাশের দুইডা ঘর ফাঁকা হইয়া গ্যাছে। তারা পানি পায় না বইলা চইলা গ্যাছে। গ্যাস না থাকলে খাবার কিইনা আইনা খাওন যায়, কিন্তু পানি না থাকলে কি বাঁচন যায় কন?’

ফাল্গুনী ও নাসিমা বেগম নামের দুজন গৃহিণী এই প্রতিবেদককে কাছে পেয়েই ক্ষোভ ঝাড়লেন। ফাল্গুণী বলেন, ‘আপনারা লেখেন কিন্তু তাগো তো চামড়ায় কামড়ায় না। আমাগো ঘরে সাত দিন থাইক্যা যে পানি নাই, এইডা কার কাছে কমু! অথচ পানির বিল তো ঠিকই লইয়া যায়।’

নাসিমা বেগম জানান, পানির অভাবে তাদের এলাকাসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে রান্না থেকে শুরু করে গোসল, বাথরুম—কোনোটাই সময়মতো করতে পারছেন না। অনেকে অন্য এলাকায় গিয়ে পানি সংগ্রহ করছেন।

ওই এলাকার আব্দুল জলিল নামের এক বাড়িওয়ালা জানান, তারা (বাসার মালিকরা) পানির জন্য প্রতিদিন রাত জেগে থাকেন। কিন্তু ঠিকভাবে পানিও পান না। আবার পানির কারণে অনেক ভাড়াটিয়া চলে যাচ্ছেন। পানি না পেলেও প্রতি মাসে তাদের ঠিকই বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা।

তার কথার সত্যতা মিলল মাণ্ডা ব্রিজ থেকে এলাকার শেষ মাথার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে। দেখা যায়, কমবেশি প্রতিটি বাসার সামনে টু-লেট ঝোলানো।

শুধু রান্নাবান্নার কাজ নয়, পানির অভাবে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পালনও কঠিন হয়ে পড়েছে ওই এলাকাগুলোর মানুষজনের। সামনে রমজান, তাই বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় নামাজ আদায়কারী মুসল্লিরা কীভাবে ওজু করবেন, সে চিন্তা তাদের ভাবিয়ে তুলছে।

মুগদা, মাণ্ডা ও দক্ষিণ মুগদা এলাকায় প্রায় ৪৫টির মতো মসজিদ ও ১৫টির বেশি মাদরাসা রয়েছে। এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনেকে পানির কারণে ওজু করতেও পারছেন না বলে জানান রসুলবাগ জামে মসজিদ কমিটির সহ-সভাপতি ও শাহাবুদ্দিন-আছিয়া ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আহমেদুল কবির জাকির। তিনি আরও জানান, ঢাকা ওয়াসা মডস জোন-১-এর আওয়াতাধীন দক্ষিণ মুগদা ব্যাংক কলোনি ও মাণ্ডা এলাকার পাঁচ লাখ বাসিন্দার রান্না ও গোসল করা তো দূরের কথা, অনেকে ঠিকমতো ওজুর পানি পর্যন্ত পান না।

আহমেদুল কবির জাকির বলেন, ‘পানির এ সংকট দ্রুত দূর না হলে রমজান মাসের সময় ইফতারও তৈরি করতে পারবেন না অনেকে। বিশেষ করে মুসল্লিরা তারাবির নামাজের ওজু করতে পারবেন না।’

দক্ষিণ মুগদা ব্যাংক কলোনি এলাকার বাসিন্দা জেসমিন জানান, বেশ কিছুদিন থেকে এলাকায় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কোনোদিন সারা দিন একবারও পানি আসে না। ফলে এলাকায় পানির জন্য হাহাকার চলছে।

রড, সিমেন্টের দোকানি জামাল উদ্দিন জানান, মুগদা ও মাণ্ডা এলাকার ১, ৫, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে পানির তীব্র সংকট চলছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান কার্যালয়ের পেছনের গলি কদম আলী প্রজেক্টে এ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ ছাড়াও এলাকার পাঁচটি পাম্পের মধ্যে দুটিতে জেনারেটর নেই।

ওই এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানির সংকটে দক্ষিণ মুগদাপাড়া, মুগদা ব্যাংক কলোনির স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার কাছে পানি সংকটের সমাধান চেয়ে কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় এলাকার গ্রাহকরা বিক্ষোভও করেছেন। গরমের দাবদাহ যতই বাড়ছে, পানির চাহিদা ততই বাড়ছে। ফলে জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা।

পানির সংকট থেকে রেহাই পেতে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বরাবর এলাকাবাসী আবেদন জানালেও কোনো কাজ হয়নি। এ কারণে আবার ২২ এপ্রিল তারা মডস জোন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর সমস্যার সমাধান চেয়ে আবেদন করেছেন। আবেদনটিতে তারা জানিয়েছেন, মুগদা ব্যাংক কলোনি ও মাণ্ডা এলাকায় কিছু পানির লাইনের পাইপ সংকীর্ণ হওয়ার কারণে পানি আসছে না। আবার কোথাও কোথাও পানির পাইপগুলো উঁচু-নিচু থাকায় পানি ঠিকভাবে সরবরাহ হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে মডস জোন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শিহাবুর রহমান প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমরা তাদের বিষয়টি জেনেছি। কাজ চলছে। তবে এলাকাগুলোতে পানি কম পাওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই।তারপরও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।’

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সূত্র : প্রিয়.কম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত