প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজশাহী অঞ্চলে ছদ্মবেশে তৎপর জঙ্গিরা

ডেস্ক রিপোর্ট : আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কোণঠাসা হয়ে পড়া জঙ্গিরা এখন সরাসরি হামলার শক্তি হারিয়েছে। তবে তাদের তৎপরতা কমেনি। এখনও তারা ছদ্মবেশে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। রাজশাহী অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া জঙ্গিরা এখন দোকানদার-হকার, মিস্ত্রী, বাস-ট্রাকচালকের সহকারী সেজে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়া ঠেকাতে বাইরের লোকদের দলে না টেনে নানা ছদ্মবেশ নিয়ে থাকা জঙ্গিরা নিজেদের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবকেই এখন জঙ্গিবাদী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করছে। গ্রেফতার জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল মাসের ২৬ তারিখ পর্যন্ত রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলায় অভিযান চালিয়ে ৩৫ জন জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৫। এদের মধ্যে জেএমবি, আনসার আল ইসলাম ও হিজবুত তাওহিদের সদস্যরা রয়েছে।

গত ২৬ এপ্রিল রাজশাহীর চারঘাট থেকে বিদেশি পিস্তল ও জিহাদি বইসহ লোকমান হাকিম নামের এক জঙ্গিকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তার কাছ থেকে তিন রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশি পিস্তল ও দুইটি জিহাদি বই উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব জানায়, ২০০২ সালে জেএমবিতে যোগদান করে রাজশাহী নগরীর বেলকুপুর থানার মাহেন্দ্রা গ্রামের আলিম উদ্দিনের ছেলে লোকমান হাকিম। এরপর থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনটির একজন আঞ্চলিক নেতার অধীনে সে দলীয় সভা আয়োজন, উগ্রবাদী বই বিতরণ, ইয়ানতের টাকা আদায়, জিহাদি দাওয়াত ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া শুরু করে।

পরবর্তী সময়ে সে রাজশাহী জেলার পবা এলাকার জেএমবি নেতা মোজাম্মেল হক ওরফে মোজার বাড়িতে দলীয় সভায় অংশগ্রহণ করে। ওই সভা থেকে মোজাসহ সংগঠনের ১২ সদস্যকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও লোকমান হাকিম ও আরও কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপর থেকে লোকমান হাকিম টিউবওয়েলের মিস্ত্রির ছদ্মবেশে সহযোগী সদস্যদের নিয়ে সংগঠনের কাজে বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত শুরু করে। ছদ্মবেশে সে সংগঠনের পক্ষ থেকে ইসলামি দাওয়াত দেওয়াসহ জেএমবির নতুন সদস্য সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে।

র‌্যাব জানায়, নগরীর মতিহারের জোকাবিলে লোকমান হাকিম শারীরিক ও অস্ত্র চালানো প্রশিক্ষণ নেয় বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। শুধু লোকমান নয়, এর আগে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিরাও জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, ছদ্মবেশ নিয়ে এখন তারা তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, নতুন সদস্য সংগ্রহ, তাদের জঙ্গিবাদী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া ইত্যাদি কাজের পাশাপাশি রাজশাহী অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জঙ্গিরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক পরে ছিনতাই-ডাকাতিও করছে। এর লক্ষ্য, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সুনাম নষ্ট করা।

র‌্যাব জানায়, একদল জঙ্গি এখন নিজেদের পরিবারের সদস্যদের জঙ্গি মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করছে। এরপর আত্মীয়-স্বজনদের মধ্য থেকে নতুন সদস্য সংগ্রহ করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।

গত ১৮ এপ্রিল রাজশাহী নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা ও গোদাগাড়ী উপজেলার ছয়ঘাটি থেকে ছয় নারীসহ একই পরিবারের সাত জেএমবি সদস্যকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এর মধ্যে হাসান আলী নামের জেএমবির তালিকাভুক্ত এক সদস্য রয়েছে, যার গোদাগাড়ীর বেণীপুর ‘জঙ্গি’ হামলার সঙ্গে সম্পৃক্তরা রয়েছে। গ্রেফতার হওয়া বাকি ছয় জন হলো– হাসান আলীর স্ত্রী শেফালী খাতুন (৩৫), তার দুই মেয়ে ফারিহা খাতুন কনা (১৭) ও হানুফা খাতুন (১৯) এবং তার ভাই মৃত রেজাউল করিমের তিন মেয়ে ফারজানা আক্তার সুইটি (১৭), রাজিয়া সুলতানা তিশা (২২) ও রোজিনা সুলতানা কলি (২৫)।

সাত জঙ্গিকে গ্রেফতারের পর রাজশাহীর পুলিশ সুপার মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘গ্রেফতার জঙ্গিরা বিভিন্ন সময় হামলার পরিকল্পনা করেছে বলে স্বীকার করেছে। এজন্য তারা জেএমবির অন্য সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হয়ে গোপনে বৈঠকও করেছে বলে জানিয়েছে।’
ছয় নারীসহ সাতজনকে গ্রেফতার প্রসঙ্গে রাজশাহী জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক আতাউর রহমান বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কঠোর নজরদারি ও অভিযানের কারণে জঙ্গিরা প্রকাশ্যে তাদের তৎপরতা চালাতে পারছে না। তবে জঙ্গিদের একটা অংশ ছদ্মবেশে তৎপর রয়েছে। আরও একটা অংশ নিজের পরিবারের সদস্য, বন্ধু-বান্ধবীদের জঙ্গি মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করছে।’

তিনি আরও জানান, ছদ্মবেশে তৎপর জঙ্গিদের ধরতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি আরও কঠোর করা হয়েছে। একইসঙ্গে আগের মামলার তদন্ত সর্তকতার সঙ্গে করা হচ্ছে।

রাজশাহী অঞ্চলে জঙ্গিদের কার্যক্রম নিয়ে র্যাব-৫ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মাহাবুবর রহমান বলেন, ‘তাদের তৎপরতা আগে যেমন ছিল, এখনও তেমন রয়েছে। তবে তাদের তৎপরতার ধরনটা চেঞ্জ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অনেক জঙ্গি মারা যাওয়ায় তাদের সক্ষমতা কমে গেছে। এতে তারা এখন ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম বাদ দিয়ে ছদ্মবেশে সদস্য সংগ্রহ, ফান্ড কালেশন, অস্ত্রের ট্রেনিংয়ের মতো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন,‘সম্প্রতি তারা রহমান জুট মিলের সাড়ে ১৭ লাখ টাকা ও গরু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৪৪ লাখ টাকা ডিবি ও র‌্যাবের পোশাক পরে ডাকাতি করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জঙ্গিদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। তাদের ধরার কাজে সাধারণ মানুষও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করছে।’

রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার (সদর) ইফতেখায়ের আলম বলেন,‘শহরের মানুষ এখন অনেক সচেতন। তাই জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িতরা এখন গ্রামের দিকে নজর দিচ্ছে। শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন পড়া-মহল্লায় জঙ্গিবাদবিরোধী সমাবেশের আয়োজন করছে পুলিশ। এতে পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব অনেকটা কমে আসায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য সহজেই পুলিশ পাচ্ছে।

আবার নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ বক্স দেওয়া আছে। যেখানে যে কেউ গোপনে তথ্য দিচ্ছে। তাদের নাম-পরিচয় আমরা গোপন রাখছি। প্রয়োজনে কেউ নিরাপত্তা চাইলে তাকে সেটাও দেওয়া হচ্ছে। এতে জঙ্গিরা তাদের তৎপরতার ধরনে পরিবর্তন এনেছে। আমরা তাদের ব্যাপারে পুরোপুরি সর্তক রয়েছি। শহরে জঙ্গি গ্রেফতার কম হলেও গোয়েন্দা নজরদারি আগের মতো অব্যাহত রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন,‘সম্প্রতি নারীদের বেশি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে জঙ্গিরা।

একজন নারীকে প্রভাবিত করা হলে ওই পরিবারের বাকি সদস্যদের প্রভাবিত করা সহজ। একইসঙ্গে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত গরিব পরিবারের যুবক-তরুণদের দলে টানার চেষ্টা করছে জঙ্গিরা। প্রমাণ পেলেই জঙ্গিদের গ্রেফতার করে আইনের আশ্রয়ে নিয়ে আসছি আমরা।’ সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত