প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নতুন হাওয়া সৌদি পালে

ডেস্ক রিপোর্ট : সৌদি আরব নিয়ে যারা ভবিষ্যতে ইতিহাস লিখবেনÑ তাদের জন্য অবশ্যই ২০১৮ সাল নিয়ে পৃথক অধ্যায় রচনা করতে হবে। কারণ এ বছরই দেশটিতে বেশ কিছু অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। সৌদির ভেতর-বাইরে পট পরিবর্তন হয়েছে।
বলা ভালো, এ বছরই সৌদি পালে নতুন হাওয়া লেগেছে। কিন্তু কেন এই আকস্মিক পরিবর্তন? কী এমন হলো যেÑ ‘কট্টরপন্থি’ সৌদি আরব হঠাৎ করেই ‘উদারনীতি’ পদক্ষেপ গ্রহণ করা শুরু করল।
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়Ñ সৌদি আরবের ক্যাফেগুলোতে পুরুষ-সঙ্গী ছাড়া কোনো নারী একা বসে চা বা কফি পান করতে পারতেন না। পুরুষ সঙ্গী ছাড়া কোথাও বেড়াতে যাওয়া ছিল রীতিমতো চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। সক্ষমতা থাকলেও সৌদি নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি ছিল আকাশ-কুসুম ভাবনা। ইচ্ছে বা প্রয়োজন থাকলেও নারীরা স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে পারত না। আর নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য সিনেমা ছিল একেবারে নিষিদ্ধ। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা হলোÑ এসব কড়াকড়ি এখন সৌদি সমাজের ‘অতীত কাহিনি’!
বর্তমানে দেশটির নারীরা বেশ কিছু অধিকার পেয়েছে। নারীরা চাইলে নিজেরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারছে। তারা গাড়ি চালানোর অনুমতি পেয়েছে। নারীদের ড্রাইভিং শেখানোর জন্য ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানও দাঁড়িয়ে গেছে। চোখ কপালে ওঠার মতো ব্যাপার হলোÑ সৌদি আরবে এখন চলছে হলিউডের জনপ্রিয় সিনেমাগুলো। কয়েক দশক বন্ধ থাকার পর এ বছরই সিনেমা হল চালুর অনুমতি দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। হলগুলোতে রয়েছে আধুনিক সব প্রযুক্তি। ইতোমধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানির সঙ্গে ‘ফোর-ডি’ সিনেমা দেখানোর জন্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ১৮ এপ্রিল হলিউড-খ্যাত ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ সৌদি দর্শকরা উপভোগ করেছে। ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, আগামী ৫ বছরে ১৫টি শহরে অন্তত ৪০টি সিনেমা হল চালু হবে। এ জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় সিনেমা হল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘আমেরিকান মুভি ক্লাকিসক’-এর সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। সম্প্রতি সপ্তাহব্যাপী শেষ হয়ে গেল পশ্চিমা স্টাইলে ফ্যাশনশো। ফ্যাশনশো চলাকালে সেখানে অনেক নারীর উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। চালু হয়েছে আধুনিক নাট্যশালাও। এই তো গত বুধবার সৌদি বাদশাহ দেশটির সবচেয়ে বড় বিনোদনকেন্দ্রের কাজের উদ্বোধন করেছেন; যেখানে থাকবে বিনোদনের জন্য সব অত্যাধুনিক আয়োজন। সব মিলিয়ে সৌদি আরবে যে আমূল পরিবর্তন হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এবার আসা যাক, এসব পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত কারণ কী? এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম ‘কোয়ার্টজ’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য, ভেতরে ভেতরে তরুণ সমাজ যে নিদারুণ ‘বিনোদন ক্ষুধায়’ ভুগছিল তা সৌদি কর্তৃপক্ষের অজানা ছিল না। আর দেশটির তরুণ প্রজন্মের সদস্যসংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। বর্তমানে দেশটিতে ৩২ মিলিয়ন লোকের বয়স ৩০-এর নিচে। কাজেই জনসংখ্যার এই বড় অংশকে এড়িয়ে দেশটির অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়াটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। মাত্র দুই বছর আগের অর্থাৎ ২০১৪ সালে দেশটির সরকারের পরিসংখ্যান বলছে, তরুণদের একটি বড় অংশ প্রতিসপ্তাহে দুবাই বা বাহরাইনে গিয়ে সিনেমা দেখে। এতে সৌদি আরব বছরে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বঞ্চিত হয় যা দেশটির জিডিপি ৫%-এর কাছাকাছি। সৌদি সরকার এই ‘ঘরের টাকাকে’ আর বাইরে যেতে দিতে রাজি না। আবার অন্য আরেকটি বড় কারণ হলোÑ সৌদি আরব তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। চলমান পরিবর্তনের জন্য এ দুটি কারণকে বড় করে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
কিন্তু কথা হলো, অপরিহার্য হলেই যে কোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে না। তার জন্য চাই দেশের সক্ষম ও সাহসী নেতৃত্ব। সৌদি আরবে সেই প্রয়োজন মেটাতে পেরেছেন যুবরাজ মুহম্মদ বিন সালমান। এই সালমানই হলো এতসব পরিবর্তনের নেপথ্যের নায়ক। যদিও এ জন্য তাকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। নিতে হয়েছে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ। বলা হয়ে থাকে, তার নির্দেশেই কয়েক ডজন সৌদি শীর্ষ কর্মকর্তাকে বন্দি করা হয়। এর পর ‘মুচলেকা’ দিয়ে তাদের মুক্তি দেওয়া হলেও তাদের ক্ষমতা হরণ করা হয়। দেশকে বদলে দিতে সালমান হাতে নিয়েছেন ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় দেশকে ভিন্ন পথে নিয়ে যেতে চান তিনি। যে পথে আরও বেশি করে পশ্চিমা বিশ্বের স্বীকৃতি মিলবে। তবে এসব পরিবর্তন সৌদি সমাজের কট্টর অংশ কীভাবে গ্রহণ করে সেটাও বিবেচনার বিষয়। এতসব পরিবর্তনের ফলে মুসলিম বিশ্বে সৌদি ইমেজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেÑ সেটাও নিশ্চয়ই সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাবনার বাইরে নয়। সে কারণেই হয়তোÑ নাট্যশালায় রাখা হয়েছে নামাজের স্থানও। সৌদি মুফতিরা এখন বলছেন, নারীদের বোরকার মতো পোশাক পরিধানের বাধ্যবাধকতা নেই। এ ছাড়া সৌদি কর্তৃপক্ষও নানাভাবে বলার চেষ্টা করছে, দেশের মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন কিছু তারা করবে না। তার পরও পরিবর্তিত মূল্যবোধের সঙ্গে বিদ্যমান মূল্যবোধ কতটা পরিবর্তিত হতে পারে সেটাই দেখার বিষয়। সূত্র : আমাদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ