প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রেলের পুকুর ভরাট করে প্লট বরাদ্দ দিচ্ছেন ইজারাদার

ডেস্ক রিপোর্ট : যশোর রেলওয়ে জংশনের ওভারব্রিজের কাছেই গ্রামীণফোন টাওয়ার। এর একপাশে রেল কোয়ার্টার, অন্যপাশে ৩৬ শতকের একটি জলাশয়। দীর্ঘদিন ধরে জলাশয়টি ব্যবহার হয় মাছ চাষের কাজে। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে জলাশয়টির সিংহভাগ। সেখানে আটটি টিনশেডের ঘরও নির্মাণ করা হয়েছে। কাজ চলছে আরও কয়েকটি ঘর তৈরির।

খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল, রেলওয়ের মালিকানাধীন পুকুরটি ইজারা নেওয়া হয়েছিল মাছ চাষের জন্য। কিন্তু এখন সেই পুকুর ভরাট করে ইজারাদার সাজ্জাদুল ইসলাম শান্ত প্লট আকারে ‘বরাদ্দ’ দিচ্ছেন। সেখানে তৈরি হচ্ছে ছোট ছোট ঘর। আর রেলওয়ের এই জমি ‘বরাদ্দ’ দিয়ে লাখ লাখ টাকা পকেটে ভরছেন শান্ত।

জলাশয়টির ঠিক পাশেই রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূসম্পত্তি বিভাগের কাচারি অফিস। সেখানে দাঁড়ালেই নজরে আসে জলাশয় ভরাটের চিত্র। এক বিঘারও বেশি আয়তনের জলাশয়টির অধিকাংশই মাটি ফেলে ভরাট ও ঘর নির্মাণ কাজ চললেও নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূসম্পত্তি বিভাগের ১৭ নম্বর কাচারি অফিসের আমিন (ভারপ্রাপ্ত) শামসুদ্দিন মিন্টু অবশ্য রেলওয়ে যশোরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সংশ্নিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও যশোর কোতোয়ালি থানা পুলিশকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন। তিনি জানান, রেলওয়ে জংশনের পাশের জলাশয়টিতে মাছ চাষের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদে ইজারা দেওয়া হয়েছে। মাছ চাষের নামে ইজারা নেওয়া হলেও সেটি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এ কারণে মাটি ভরাট বন্ধের জন্য আইনগত সহায়তা চেয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় আবেদন করা হয়েছে। থানায় করা আবেদনে বলা হয়েছে, সাজ্জাদুল ইসলাম শান্ত রিকশাভ্যানযোগে মাটি এনে অবৈধভাবে রেলওয়ের জলাশয় ভরাট করে বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করছেন। এটি রেলওয়ে আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

জলাশয় ভরাটের ব্যাপারে রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউনুস আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মাছ চাষের জন্য জলাশয় ইজারা নিয়ে মাটি ফেলে ভরাট করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এটি কোনোভাবেই করা যাবে না। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্নিষ্ট কাচারির কানুনগোকে ম্যানেজ করে জলাশয় ভরাট করে বিক্রি করছেন শান্ত। তবে ১৭ নম্বর কাচারির কানুনগো জিয়াউল হক এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জলাশয় ভরাটের ব্যাপারে আমরা থানায় এজাহার দিয়েছি। এর পাশাপাশি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাজ্জাদুল ইসলাম শান্ত বছরখানেক আগে রেলওয়ের কাছ থেকে মাছ চাষের জন্য জলাশয়টি ইজারা নেন। এরপর ভ্যানে করে মাটি এনে সেটি ভরাট করতে থাকেন। ভরাটের পর প্রতি শতক জমি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। শান্তর কাছ থেকে জমি ক্রয় করে সেখানে টিনের ঘর তৈরি করছেন ক্রেতারা। সংশ্নিষ্ট কাচারির কানুনগো জিয়াউল হক ইজারাদার শান্তকে সহযোগিতা করা এবং একইসঙ্গে নিজেকে দায়মুক্ত রাখার জন্য মামলা না করে সাধারণ ডায়েরি করেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। জিয়াউল হক অবশ্য ডায়েরি নয়, এজাহারই করেছেন বলে দাবি করলেও যশোর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল বাশারের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, রেলের জমি দখলের ব্যাপারে থানায় কোনো মামলা বা এজাহার হয়নি। সাধারণ ডায়েরি হয়ে থাকলেও বিষয়টি রেলের কেউ তাদের নজরে আনেননি এবং প্রতিদিন করা অনেক ডায়েরির মতো সেটি আড়াল পড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘রেলওয়ে যদি অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযানসহ আইনগত পদক্ষেপ নিতে চায়, পুলিশ অবশ্যই সব ধরনের ভূমিকা রাখবে।’

প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ীও কোনো পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা অপরাধ। আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি। কোনো ব্যক্তি এই বিধান লঙ্ঘন করলে আইনের ৮ ও ১২ ধারা অনুযায়ী পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (২০১০ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী যে কোনো ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ।

পরিবেশ অধিদপ্তর যশোর কার্যালয়ের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেছেন, এভাবে জলাশয় ভরাট করা যাবে না। তবে জলাশয়টি যেহেতু রেলওয়ের, জলাশয় ভরাট বন্ধে তাদেরই উদ্যোগী হতে হবে। এ ক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যদি পরিবেশ বিভাগের সহায়তা চায়, আমরা তাদের সঙ্গে থাকব।

অভিযোগের ব্যাপারে জানার জন্য কয়েক দফা ঘটনাস্থল এবং বাড়িতে গিয়েও সাজ্জাদুল ইসলাম শান্তকে পাওয়া গেল না। মাটি ভরাট করে তৈরি করা টিনের ঘরগুলোতে এখন পর্যন্ত দুটি পরিবার উঠেছে। তাদের কাছে এ নিয়ে কথা বলতে চাইলে তারা শুধু বলেন, ‘আমরা কিছু জানি না। শান্ত ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন।’ পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে শান্ত বলেন, ‘আমি মাছ চাষের জন্যই পুকুরটি বরাদ্দ নিয়েছি। কিন্তু বাস্তুহারা কিছু মানুষ এসে পুকুর ভরাট করে প্লট বানাতে শুরু করেছে।’ ইজারাদার হিসেবে পুকুরটি রক্ষার দায়িত্ব তার কি-না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘যশোরের বাইরে থাকায় আমি কিছু করতে পারছি না। ফিরেই রেলওয়েকে বিষয়টি অবহিত করে করণীয় নির্ধারণ করব।’

শহরের রায়পাড়া এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদুল ইসলাম শান্ত যশোরের মানুষের কাছে বিএনপি পারিবারের লোক হিসেবেই পরিচিত। বিএনপির রাজনীতিতে কখনও অগ্রভাগে তাকে দেখা না গেলেও তার ভাই তপন ও রিপন ছিলেন সক্রিয়। রাজনীতির পট পরিবর্তনের পর শান্ত আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেন। সখ্য গড়ে তোলেন দলটির রায়পাড়া-শংকরপুরকেন্দ্রিক ক্যাডারদের সঙ্গে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তাকে দেখা যায় সবসময়। সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত