প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নতুন সংকটে বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক : সংকট পিছু ছাড়ছে না বিএনপির। দলটি এখন ভেতরে-বাইরে নানা সংকটে জর্জরিত। একটি মোকাবেলা করার আগেই আরেকটি সংকটের মুখে পড়ছে তারা। এ মুহূর্তে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করাই মূল লক্ষ্য। সে লক্ষ্য অর্জনে লন্ডনে অবস্থানরত দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানে’র দায়িত্ব পালন করছেন। তবে বাংলাদেশের ‘নাগরিকত্ব’ ছেড়ে দিয়ে দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা দেওয়ায় তার দলের নেতৃত্ব দেওয়ার এখতিয়ার নিয়েই ‘প্রশ্ন’ তুলেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে ডা. জোবায়দা রহমানের শিগগির দেশে আসা এবং আগামী নির্বাচনে প্রচারে অংশ নেওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্বামী তারেক রহমানের সঙ্গে তার ও মেয়ে জাইমা রহমানের পাসপোর্টও বাংলাদেশ দূতাবাসে জমা দেওয়ায় তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে নতুন জটিলতার আশঙ্কা করছেন অনেকে।

এ পরিস্থিতিতে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পরিবার থেকে ‘যোগ্য’ কোনো সদস্যের আপাতত বিএনপির ‘কাণ্ডারি’র ভূমিকা পালন করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তাদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মামলার বেড়াজালে খালেদা জিয়ার শিগগির কারামুক্তি নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। দলের শীর্ষ দুই নেতার পাশাপাশি ডা. জোবায়দার অনুপস্থিতিতে কে ধরবেন বিএনপির হাল? এ নিয়েই এখন বিএনপির ভেতর-বাইরে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। সবারই প্রশ্ন- তাহলে কি ‘শীর্ষ নেতৃত্ব’ নিয়ে সংকটে পড়েছে বিএনপি।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, সাজাপ্রাপ্ত এবং দেশের নাগরিকত্ব ছেড়ে দিলে কেউ আর দলের নেতৃত্ব দিতে পারেন না। লন্ডনে বসে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়া বা দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কোনো এখতিয়ার তারেক রহমানের নেই।

তবে আওয়ামী লীগ নেতাদের এসব বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছেন বিএনপি নেতারা। তাদের ভাষায়, তারেক রহমান জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক আছেন এবং থাকবেন। দলের নেতৃত্ব দিতেও কোনো অসুবিধা নেই।

খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারারুদ্ধ হলে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব পালন করছেন। তবে মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের বক্তব্য-বিবৃতি গণমাধ্যমে প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছেন দেশের উচ্চ আদালত। আদালতের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে টেলিকনফারেন্সে দেওয়া বক্তব্য এবং প্রায় প্রতিদিন দলীয় প্যাডে দেওয়া বিবৃতিগুলো প্রকাশ থেকে বিরত রয়েছে দেশের গণমাধ্যম। এ অবস্থার মধ্যে নতুন করে পাসপোর্ট বিতর্কে তারেক রহমানের নেতৃত্ব ঘিরে সংকট ঘনীভূত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

পাল্টাপাল্টি বিতর্ক :বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, দলে নতুন কোনো সংকট বা চ্যালেঞ্জ নেই, এমনকি নেতৃত্ব সংকটও নেই। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শিগগির জামিনে মুক্তি পাবেন। তার আগ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সমন্বিত সিদ্ধান্তে দল পরিচালিত হচ্ছে এবং হবে। সাময়িকভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে পাসপোর্ট জমা দিলে জন্মসূত্রে পাওয়া কারও নাগরিকত্ব চলে যায় না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, সময় হলে তারেক রহমান বীরের বেশে দেশে আসবেন। আইন মেনে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে তিনি যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। নাগরিকত্ব ছাড়ার প্রশ্নই আসে না। পাসপোর্ট জমা দেওয়ার সঙ্গে নাগরিকত্বের কোনো সম্পর্ক নেই, তা পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও স্বীকার করেছেন। এ নিয়ে বিএনপি চিন্তিত নয়।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডন গিয়ে এখন রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন। এতদিন স্বীকার করেননি, এখন বিএনপি নেতাদের কথায়ই সেটি ফাঁস হয়ে গেছে। বিএনপি এখন পরিপূর্ণ মিথ্যাবাদী দলে পরিণত হয়েছে।

একই সঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফও বলেছেন, তারেক রহমানের জন্ম পাকিস্তানের করাচিতে। কাজেই মির্জা ফখরুল তারেককে বাংলাদেশের নাগরিক বলে যে দাবি করেছেন, তা মিথ্যাচার।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, তারেক রহমান এই মুহূর্তে বাংলাদেশের নাগরিক নন।

বিশেষজ্ঞ ও বিশ্নেষকরা যা বলেন :বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ গতকাল বলেন, বিএনপিতে কোনো নেতৃত্ব সংকট আছে বলে তিনি মনে করেন না। খালেদা জিয়ার কাছ থেকে কিছুদিন পরপর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরামর্শ নিয়ে আসছেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী দলের জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দল পরিচালনা করছেন। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলে যে সমস্যা হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। বরং দল আগের চেয়ে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ আছে।

বিশিষ্ট আইনজীবী সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্‌দীন মালিক সমকালকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারেক রহমানের পাসপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এমন নয় যে, তিনি নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন। পাসপোর্ট নেই এমন লোকের সংখ্যাই তো বেশি। পাসপোর্ট সম্পর্কে যে কথা উঠেছে সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই তারেক রহমানের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেওয়া হতে পারে।

তারেকের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন :পাসপোর্ট জমা দেওয়ার মাধ্যমে নাগরিকত্ব ছেড়ে দেওয়ার দাবি ওঠায় লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এবার তারেক রহমানের নির্বাসিত জীবন বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্নেষকরা।

পাসপোর্ট বিতর্ককে কেন্দ্র করে তারেক রহমানকে নিয়ে রাজনীতিতে বেশ বিতর্ক চলছে এখন। এ বিতর্ক যখন তুঙ্গে তখন বিএনপির তরফ থেকে প্রথমবারের মতো স্বীকার করা হলো, আরও পাঁচ বছর আগেই তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে সেখানে বসবাস করছেন। অবশ্য এতদিন বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থান করছেন। কৌশলগত কারণে এতদিন বিষয়টি প্রকাশ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, রাজনৈতিক আশ্রয় থাকার বিষয়টি দলের জন্য কোনো চ্যালেঞ্জ নয়। তারেক রহমান অনেক আগেই রাজনীতিতে জড়িয়েছেন। দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। দেশের বহু নামকরা রাজনীতিক নির্বাসনে ছিলেন। রাজনীতিবিদদের নির্বাসন নতুন কিছু নয়।

তবে নাম প্রকাশ না করে দলের কয়েকজন নেতা সমকালকে জানান, নানা প্রতিকূলতার মধ্যে থাকায় আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বিএনপি নানামুখী বিকল্প সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখছে। প্রথমে তারা খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং প্রচারে নামাকেই মুখ্য হিসেবে রেখেছে। দ্বিতীয়ত, খালেদা জিয়া কারামুক্ত না হলে তারেক রহমানই লন্ডন থেকে নেতৃত্ব দেবেন। তৃতীয়ত, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান মাঠে এসে দলের ও নির্বাচনী প্রচারে নেতৃত্ব দিতে না পারলে অন্তত ডা. জোবায়দা রহমান দেশে এসে দলের হাল ধরবেন- এমন প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু ডা. জোবায়দা রহমানের পাসপোর্টও দূতাবাসে জমা দেওয়ায় তার দেশে ফেরা খুব সহজ হবে না বলেও মনে করেন তারা। বিএনপি নেতারা সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। সময় হলে তারেক রহমান ও ডা. জোবায়দা রহমানের পাসপোর্ট পাওয়া এবং দেশে এসে দলের নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন হবে না বলে তাদের বিশ্বাস।

২৩ এপ্রিল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিজের পাসপোর্ট জমা দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানান। পরে দেশে ফিরে তিনি যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তারেকের জমা দেওয়া পাসপোর্টের ফটোকপি ও একটি চিঠির ফটোকপি গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। প্রথমে বিএনপির পক্ষ থেকে তারেকের জমাকৃত পাসপোর্ট দেখানোর চ্যালেঞ্জ দেওয়া হলেও পরে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য পাসপোর্ট জমা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত