প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আসনে আসনে দ্বন্দ্ব আওয়ামী লীগে

শুভ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আসনে আসনে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বেশির ভাগ আসনে এমপি বলয় ও আওয়ামী লীগ বলয় তৈরি হয়েছে। মনোনয়ন, দলীয় পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আধিপত্য বিস্তার ও বিভিন্ন উন্নয়নকাজের ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এতটাই প্রকট যে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও সঙ্ঘাত, মারামারি, হানাহানির ঘটনা ঘটছে। দলটির নেতারা মনে করেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জেতার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য মন্ত্রী-এমপিদের এলাকায় গিয়ে জনগণের সাথে মিশতে বলা হয়েছে। জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্যও তাগিদ রয়েছে। কিন্তু এতেও তেমন কোনো কাজে আসছে না। দেখা যায়, এলাকায় গিয়ে দুয়েকটা উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন করে ঢাকায় ফিরে আসেন অনেকেই। আবার অনেকেই আখের গোছাতে এবং নিজ দলের প্রতিপক্ষকে কিভাবে শায়েস্তা করা যায়- তা নিয়ে ব্যস্ত আছে। এমনকি অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন না করে নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়ারও অভিযোগ আছে কারো কারো বিরুদ্ধে। এরপরও হাইকমান্ড এসব বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবে এটি দ্রুত নিরসন করা সম্ভব না হলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, দেশব্যাপী অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত নিরসনে একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও আশানুরূপ সাড়া পায়নি দলটির হাইকমান্ড। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো আসনে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সঙ্ঘাত, মারামারি-সংঘর্ষ অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। আধিপত্য বিস্তারের খেলায় মেতে উঠেছে নেতাকর্মীরা। গত ১৬ এপ্রিল নোয়াখালী-৬ আসনের হাতিয়ায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বলি হয়েছে পঞ্চম শ্রেণীর মাদরাসা ছাত্র নিরব। নিহত নিরবের বাবা মিরাজ উদ্দিন ও চাচা আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদুল ইসলাম নান্টুও গুলিবিদ্ধ হন। আহত রাশেদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, স্থানীয় এমপি সমর্থিত সন্ত্রাসী ও একাধিক মামলার আসামি মহিউদ্দিন মুহিন, গুল আজাদ, আবু তাহের, মোশফিকুর রহমান জিল্লুর, জাহাঙ্গীরসহ ১৫-২০ জন পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় ওই সন্ত্রাসীরা আমার বাড়িতে ঢুকে গোলাগুলি করে। এর আগেও আয়েশা ফেরদৌস এমপি ও তার স্বামী মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে নেতাকর্মীদের হামলা-নির্যাতন এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের। এ আসনে গত চার বছরে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতাসহ আওয়ামী লীগের আটজন স্থানীয় নেতাকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চরকিং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ মহিউদ্দিন আহম্মদ জানান, এমপি ও তার স্বামীর অত্যাচারে নেতাকর্মীরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তাদের সব অপকর্মের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলা, পৌর ও সব ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ সব অঙ্গসংগঠন তার বিরুদ্ধে এখন প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে।
নড়াইল-১ আসন অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। ওই আসনের এমপি কবিরুল হক মুক্তির বিরুদ্ধে রয়েছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিস্তর অভিযোগ। ওই আসনে এমপি বনাম স্থানীয় আওয়ামী লীগ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোল্যা এমদাদ হোসেন, সদস্য অহিদুজ্জামান অহিদ, শামীম চেয়ারম্যান, কালিয়া পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান টুকু বিশ্বাসসহ শতাধিক নেতাকর্মী রাজধানী ঢাকার গুলিস্তানের একটি রেস্টুরেন্টে এমপির বিরুদ্ধে সমাবেশ করে জনমত গড়ে তোলেন। এ ছাড়াও গত জানুয়ারিতে কালিয়া উপজেলায় নানা অভিযোগ তুলে এমপির বিরুদ্ধে বড় সমাবেশ করেন তারা। দুর্নীতি, নিয়োগবাণিজ্য, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াসহ নানা অভিযোগ তুলে জেলা ও কালিয়া উপজেলার ত্যাগী নেতাকর্মীরা এমপির বিপক্ষে সংবাদ সম্মেলনও করেন। দলীয় প্রধানের কাছেও তারা অভিযোগ করেছেন একাধিকবার। ওই উপজেলায় প্রত্যেকটি দলীয় কর্মসূচি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পালন করেন নেতাকর্মীরা। এ প্রসঙ্গে নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য মো: অহিদুজ্জামান অহিদ বলেন, এমপি বরাবরই নেত্রীর কথা মানেননি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রীকে উপক্ষো করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচন করেছিল মুক্তি বিশ্বাস। গত পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোতে ১৪টি ইউনিয়নের প্রত্যেকটিতে নৌকার বিপক্ষে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিল এমপি। তিনি বলেন, এমপি হওয়ার পরই মুক্তি বিশ্বাস আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করেনি। স্কুলের পিয়ন নিয়োগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করছে। টিআর কাবিখাসহ উন্নয়নকাজের নামে দুর্নীতি করছে। এসব কারণে প্রকৃত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এখন এমপির ওপরে ুব্ধ হয়ে পড়েছে। তৃণমূলের কেউই আগামী নির্বাচনে তার মনোনয়ন চায় না।
এ দিকে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ১৭ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের ৩৪টি কমিটি রয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেক ইউনিয়নে দু’টি কমিটি কার্যকর। একটি কমিটি জেলা অনুমোদিত, আর অন্যটি স্থানীয় এমপির ‘পকেট’ কমিটি বলে অভিযোগ স্থানীয় নেতাকর্মীর। নাটোর-৪ আসনেও দ্বিধাবিভক্ত আওয়ামী লীগ। গত ১৫ অক্টোবর নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল কুদ্দুসকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে বয়কট করার ঘোষণা করেন। গত বছরের জুলাই মাসে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাতক্ষীরা-৩ আসনের এমপি ডা: আ ফ ম রুহুল হককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের এমপি এনামুল হকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ। গত ৯ জুলাই যশোরের মনিরামপুরে ছাত্রলীগ নেতারা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে যশোর-২ আসনের এমপি মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ আনেন। যশোর-৩ সদর আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন কাজী নাবিল আহমেদ। এবার মনোনয়ন চাচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলার চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার। দীর্ঘ দিন ধরে নির্বাচন কেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ কোন্দল চলছে ওই আসনে। গত সেপ্টেম্বর মাসে দিনাজপুর-১ আসনের এমপি মনোরঞ্জন শীলকে বয়কটের ঘোষণা দেন বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশের নেতারা।
রাজধানী ঢাকা-২ আসনে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এবং কেরাণীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শাহীন আহমেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে সব কর্মসূচি পালন করেন। ঢাকা-৪ আসনে ত্রিমুখী দ্বন্দ্বে রয়েছেন নেতারা। ওই আসনে সংরক্ষিত আসনের এমপি সানজিদা খানম, আওয়ামী লীগ সভাপতির সাবেক ব্যক্তিগত সমন্বয়কারী ড. আওলাদ হোসেন ও শ্যামপুর থানার সভাপতি তোফাজ্জল হোসেনে বিভক্ত হয়ে নেতাকর্মীরা মাঠে রয়েছেন। এ ছাড়াও অঞ্চল ভিত্তিক কিছু নেতা বিভক্ত হয়ে কাজ করছেন। ঢাকা-৫ আসনে নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের মধ্যে ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ও সাধারণ সম্পাদক হারুনর রশীদ মুন্না এবং ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমপি পুত্র মশিউর রহমান সজল পৃথকভাবে সভা-সমাবেশ করেন। স্থানীয়রা জানান, এরা কেউ কারো ছায়া মাড়ান না। দলীয় কর্মসূচিতে কোনো সমন্বয় নেই। যে যার মতো করে দলীয় কর্মসূচি পালন করেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আবদুস সবুর আসুদ মহাজোটের এমপি প্রার্থী হিসেবে ওই আসনে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন।
ঢাকা-৭ আসনেও একই অবস্থা। বর্তমান এমপি হাজী সেলিম, সাবেক এমপি ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কাউন্সিলর হুমায়ুন কবির এ আসনের প্রার্থী। গত নির্বাচনে ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হাজী সেলিম এমপি নির্বাচিত হন। সেই দ্বন্দ্ব এখনো রয়ে গেছে। এ ছাড়াও প্রত্যেক প্রার্থী তাদের নিজস্ব বলয় গড়ে তুলে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের সাথে জামাতা ঈশ্বরদী পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম আজাদের বিবাদ তুঙ্গে। ভূমিমন্ত্রীর বয়স হয়েছে। উত্তরাধিকার কে হবেন এ নিয়ে মন্ত্রীর ছেলে ও জামাতার দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে রূপ নিয়েছে একাধিকবার। এ জন্য মন্ত্রীর ছেলেকে কারাগারেও যেতে হয়েছে। ফরিদপুর-৪ আসনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহর বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে গত জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন। এরপর থেকেই তাদের মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্কে রূপ নিয়েছে। নরসিংদী-৫ আসনের এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু জেলার রাজনীতিতে দ্বন্দ্বের কারণে বেশ সমালোচিত। এখানেও আওয়ামী লীগের একাধিক গ্রুপ রয়েছে। গত নির্বাচনে কুমিল্লা-৬ আসনে আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার দলীয় মনোনয়ন পেয়ে জয়ী হলেও বিদ্রোহীয় প্রার্থী মাসুদ পারভেজের অবস্থান এখানে বেশ শক্ত। মাসুদ পারভেজের বাবা আফজল খানের সাথে বাহারের দ্বন্দ্ব অনেক পুরনো বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য ড. নূহ উল আলম লেনিন নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের বড় দলগুলোর মধ্যে প্রার্থী চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এ রকম প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে থাকে। আর এতে মনে হয় এই বুঝি দল ভেঙে গেল। কিন্তু আসলে তা নয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বলতে পারি, প্রার্থী চূড়ান্ত হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ সমস্যা আর থাকবে না। তখন সব নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধ হয়ে নৌকা মার্কার প্রার্থীকে জেতানোর জন্য কাজ করে। তবে দুয়েক জায়গা ব্যতিক্রম হয় না, তা বলব না। সে রকম কিছু হলে কেন্দ্র থেকে হস্তক্ষেপ করে সমাধান করা হয়।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমানে আসন কেন্দ্রিক আওয়ামী লীগের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব আছে এটি অব্যাহত থাকলে তেমন সমস্যা হবে না। তবে সমস্যা দুটো কারণে। প্রথমত অজনপ্রিয় প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার কারণে জনপ্রিয় প্রার্থী বাদ পড়লে। আর ওই আসনে বাদ পড়া জনপ্রিয় প্রার্থী যদি স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাহলে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাছাইয়ের যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হচ্ছে তা পদ্ধতিগত কিছু সমস্যা রয়েছে। এখানে প্রভাব খাটানোর সুযোগ রয়েছে। সূত্র : নয়াদিগন্ত

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত