প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আত্মবিনাশী বিশৃঙ্খলায় অকাতরে জীবন নাশ

আব্দুল হক : কাটা পড়া হাত খুঁজে না পেয়ে রাজীব জীবনের খোঁজ হারিয়ে ফেলেছেন। বেঁচে গেছেন জীবন্ত থাকার যন্ত্রণা থেকে! তার সৌভাগ্য! যে হৃদয় নামক আর একটি যুবকের হাত কাটা যাওয়ার খবর তাকে শুনতে হয়নি। আমাদের দুর্ভাগ্য যে প্রতিনিয়ত নির্মম হতাহতের খবরাখবর পড়তে হচ্ছে। বয়ে চলতে হচ্ছে নির্মমতার স্বাক্ষী হওয়ার বোঝা।

কী ভয়াবহ বাস্তবতা নৈমিত্তিকভাবে ঘটে চলছে! কার হাত গেল, কার পা গেল, কোথায় কোন পরিবার সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল- সবই গৌণ। এখন দিনশেষে মৃতের সংখ্যা হিসাব করা হয়। ঘটনা ঘটার পর কিছু দিন আবেগঘন আলোচনা হয়। নতুন এক অঘটনের পর পূর্বের ঘটনাও পরিত্যক্ত হয়ে যায়। বহতা নদী যেমন সব ভাসিয়ে নিয়ে যায় তেমনি তাড়াতাড়ি মুছে যায় পুরনো ক্ষত। সৃষ্টি হয় নতুন ক্ষত।

প্রতিনিয়ত ঘটে চলা মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে দেখে বেলা যায়, বয়স ফুরায়, জীবন যায় যায়। কিন্তু সড়ক-মহাসড়কে বিশৃঙ্খলারই অনিবার্য পরিণতি যে আত্মবিনাশী ঘটনা ঘটছে তা থেকে পরিত্রাণ নেই। অঙ্গহানী ও জীবনহানীর মতো অমানবিকতা সিস্টেমের ভুলের কারণে ঘটছে তা বস্তুত সমাজের সামগ্রিক বাস্তবতার অংশ। অমানবিক ও ভেঙ্গেপড়া কাঠামোর দোষেই মানব বিপর্যয়। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৬ এর তুলনায় দুর্ঘটনা ২০১৭ সালে বেড়েছে ১৫.৫ শতাংশ, নিহত ২২.২ শতাংশ এবং আহত ১.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ধরনের ভয়াবহ চিত্র শাসনের দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। আত্মবিনাশী বিশৃঙ্খল অবস্থান জন্য দায়ী প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সু-শাসনের অভাব।

সড়ক পরিবহন সেক্টরে এড়ড়ফ এড়াবৎহধহপব এর ঘাটতি সড়কেই দৃশ্যমান। রাজধানীতে একই রুটে বহু কোম্পানির বাস চলাচল করে। সড়কে যাত্রী তোলার নির্ধারিত জায়গা নেই। প্রতিটি মোড়েই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় বাসগুলো। বাম পাশের লেনের দখল পেতে অপেক্ষমান বাসকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় পরের বাস। ঢাকায় চলাচলরত বাসের একটিরও দু’পাশের রঙ অক্ষত নেই। পারস্পারিক ধাক্কাধাক্কিই এর মূল কারণ। বাসের চেহারাই অন্য বাসের সঙ্গে রেষারেষির সাক্ষী। যাত্রী পাওয়ার জন্যই এ রেষারেষি। ট্রিপ বাড়াতে তারা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামে। যানজটের কারণে বাসগুলো নির্ধারিতসংখ্যক ট্রিপ দিতে পারছে না। যখন রাস্তা ফাঁকা পান, তখন জোরে চালিয়ে পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। বহু বাসের জীর্ন দশা, গ্লাস ভাঙ্গা, হেডলাইট নেই, লক্করঝক্কর প্রকৃতির। এ বাসগুলো সবার সামনে চলতে পারে কিন্তু নিয়মিতভাবে ট্যাক্স প্রদানকারী, হালনাগাদ রেজিস্ট্রেশনকৃত প্রাইভেট কারের সামান্য ত্রুটি পেলেই আর রক্ষা নেই। বিভিন্ন রকমের জরিমানার সম্মুখিন হতে হয়।

জাতি হিসেবে আমরা যে চূড়ান্ত পর্যায়ের বিশৃঙ্খল তা আমাদের প্রতিটি কর্মকান্ডের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। কোন জাতির সভ্যতার বহিঃপ্রকাশ পায় এর জীবনাচরণ দ্বারা। রাস্তাঘাটে চলাচল, বিবেচনাবোধ, শিষ্টতা, ভদ্রতা, অপরকে অগ্রাধিকার দেয়া ইত্যাদি সভ্যতার অনুষঙ্গ। কিন্তু সড়ক পরিবহন সেক্টরে যে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করতে তা সভ্যতার সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাস্তায় বের হলেই বিপদ। যে আইন মান্য করে চলছে সে হচ্ছে নিগৃত। অপরাধীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। সড়কে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করায় শিশুর সামনে মা পিষ্ট হচ্ছে চাকার তলে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীর হস্ত ছেদ, অথবা গার্মেন্টস কর্মীর অঙ্গহানী ঘটনা নিত্যনৈত্তিকভাবে ঘটছে। মন্ত্রী থেকে শুরু করে সকলেই একে নারকীয় হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন, কিন্তু কিছুতে কিছু হচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারী দেয়া হচ্ছে, পত্রিকাগুলো হেড লাইন করছে। অপরদিকে নিয়মনীতির তোয়াক্কা ছাড়াই গাড়ি বেপরোয়া আচরণ করছে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের দাপটে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায় না। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের সুপারিশ ও পরামর্শ দেয়া হলেও কেউ তা মানছে না।

গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির সাথেসাথে দক্ষ চালক তৈরি না করা, ফিটনেস বিহীন গাড়ি চলতে দেয়া, গাড়ির বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ না করা, উপযুক্ততার ভিত্তিতে লাইসেন্স প্রদান না করা, ট্রাফিক সিগন্যাল এবং আইন মানতে বাধ্য না করা, দখলমুক্ত করে ফুটপাতকে জনগণের চলাচলের উপযোগী না করা এবং এ সকল বিষয় কঠোরভাবে তদারকি না করার কারণে ওভারটেকিং, ফুটপাত দখল, ওভারস্পিড, ওভারলোড, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার, মাদকসেবন করে যানবাহন চালানো ও ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি রাস্তায় চলাচল করার সুযোগ পাচ্ছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা মূলত চালকের দ্বারা সংঘঠিত হলেও কিন্তু চালক একা এর জন্য দায়ী নয়। বিদ্যমান সিস্টেমও এর জন্য দায়ী।

একজন চালক সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির শিক্ষা, প্রশিক্ষন, মানবিক ও দায়িত্ববোধ কতটুকু তা বিবেচনায় নেয়া হয় না। আমাদের দেশের বেশির ভাগ চালক লেখাপড়া জানে না। ফলে তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্বের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় না। একজন চালককে বুঝতে হবে তার ওপর নির্ভর করছে সমস্ত যাত্রীর জীবন। এর সাথে যাত্রীদের পরিবারের, চালকের পরিবারের সদস্যদের জীবন ও জীবিকা জড়িত রয়েছে। তাদের রোড সাইন সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। চালক যদি অন্যমনস্ক অবস্থায় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায় তখনই ঘটে ভয়ানক দুর্ঘটনা। চালককে পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে এবং সুস্থ মনে গাড়ি চালাতে হবে। এ ধরণের দায়িত্ব বোধের জাগরণ না হলে এ ধরনের ঘটনা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাবে। মানুষের জীবন অমূল্য সম্পদ। চালকদের মধ্যে মানুষের প্রতি, জীবনের প্রতি, পরিবার পরিজনের প্রতি ভালাবাসার অনুভূতি সৃষ্টি করা গেলে তারা দায়িত্ববান হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, সে দিকে কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। কঠোর আইনের প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি মানবিক আচরণ সমৃদ্ধ দক্ষ চালক তৈরি করাও জরুরি।

৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ অতিরিক্ত গতি। বেশির ভাগ চালকই গাড়ি দ্রুত চালানোকে মুন্সিয়ানা হিসেবে বিবেচনা করেন। প্রকৃতপক্ষে অভিজ্ঞ চালকের লক্ষ্য হতে হবে নিরাপদ ও নির্বিঘেœ যাত্রী পরিবহন করা। ডিজিটাল বাংলাদেশের উন্নয়নের মাহেন্দ্রক্ষণে সব যানবাহনকে স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং সিস্টেমের আওতায় আনলে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। পরিকল্পনাকারীদের দিয়ে সার্বিক রুট-এর পুনঃবিন্যাস করতে হবে। নগর পরিবহনের ক্ষেত্রে রাজধানীকে কয়েকটি ‘হাব’ এ ভাগ করা। ‘হাব’গুলো পর্যন্ত দূরপাল্লা বাস আসতে পারবে কিন্তু নগরীর অভ্যন্তরে ঢুকতে পারবে না। ড্রাইভারদের গাড়ি চালনা এবং মানবিক আচরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ পূর্বক সহজে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। রুট অনুযায়ী বাসের ডাটাবেস থাকতে হবে, চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রত্যেকের বীমা ব্যবস্থা থাকতে হবে। সড়ক থেকে ফিটনেস বিহীন গাড়ি ও অযোগ্য ড্রাইভারদের তুলে নিতে হবে। আইনকে যুগপোযোগি করে কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সড়কপথে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হলে দুর্ঘটনার হার কমে আসবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

জাতির নিরাপত্তার স্বার্থেই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাই বিরাট জরুরি। আমরা স্বজনহারা কোন ব্যক্তির আহাজারিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হোক তা চাই না। নিরাপদে পথ চলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ