প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধুর ডায়েরী

মঞ্জুরুল আলম পান্না : জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী কোটা ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার সরাসরি কোনো ঘোষণা না দিলেও কোটা বাতিলের পক্ষেই তিনি অভিমত দেন। তার বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী এবং চাকরিপ্রার্থীরা আন্দোলন স্থগতি করে। স্বস্তির নিঃশ্বাস এলো সবার মাঝে। আবেগে আপ্লুত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীতে আখ্যা দিলো ‘মাদার অব এডুকেশন’। কিন্তু এ সম্পর্কিত কোনো প্রজ্ঞাপন সরকারিভাবে জারি না হওয়ায় অনেকে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন এই বলে যে, আন্দোলনে ভাটা সৃষ্টি করতেই সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীর ওই অস্পষ্ট মন্তব্য। সত্যি সত্যিই দেখা গেল দ্রুত একের পর এক দৃশ্যপট বদলাতে লাগল।

সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সম্পর্কিত বার্তা আগেই সম্ভবত ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের কাছে পৌঁছানোর পরপরই মুখ রক্ষায় তারা সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করল- কোটা সংস্কার আন্দোলনে তাদের সমর্থন আগে থেকেই রয়েছে। যদিও সেই আন্দোলনে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের মারমুখী ভূমিকা সবাই প্রত্যক্ষ করেছে। আবার প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর তারা আবার জেগে উঠল আপন মহিমায়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্রীদের নির্যাতনকারী দল, হল এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত ছাত্রলীগ নেত্রী এশাকে বরণ করে নেওয়া হলো ফুলের মালায়। শুধু তাই নয়, এবার স্বয়ং প্রাধ্যক্ষ আন্দোলনে সম্পৃক্ত সুফিয়া কামাল হলের আবাসিক ছাত্রীদের খুঁজে খুঁজে গভীর রাতে বের করে দিতে লাগলেন। যে পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে থেকে এই আন্দোলনের সৃষ্টি তা মোটুমুটি এখন দখলে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের। আন্দোলনের তিন নেতাকে গোয়েন্দা পুলিশ তোলে নিয়ে গেলো আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য, কারোর বাবাকেও শাসানো হলো থানায় নিয়ে, ভয়-ভীতি দেখানো হলো কারও কারোর অভিভাবককে। সরকারি দলের নেতারা প্রচার শুরু করতে লাগলেন- ওই আন্দোলন ছিল বিএনপি-জামায়াতের সরকার পতনের ষড়যন্ত্র।

খুব স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে আন্দোলন স্থগিতের পর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে এই ধরণের হিংসাত্মক আচরণ কেন? আওয়ামী লীগের মতো পোড় খাওয়া একটি ঐতিহ্যবাহী দলের কাছ থেকে এ ধরণের আচরণ কোনোভাবেই কী আমরা আশা করতে পারি? বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার মতো একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ মহান সংসদে দাঁড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তে কোনোপ্রকার ছল-চাতুরীর আশ্রয় নেবেন বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। তিনি ছাত্রদের যৌক্তিক দাবিতে সাড়া দিয়ে যদি এখন বলেন যে বাতিল নয়, কোটা ব্যবস্থা আসলে সংস্কার করা হবে, তাতেও তিনি দেশবাসীর সাধুবাদ পাবেন নিঃসন্দেহে। কারণ আন্দোলনকারীদের দাবি তো বাতিলের পক্ষে নয়। জনপ্রশাসন বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অভিমতও তেমনটাই।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আন্দোলনে ভাটা সৃষ্টি করে সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা বেশ খোশ মেজাজে রয়েছেন। তবে মনে রাখতে হবে এখন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষক সমাজও রাজপথে নামতে শুরু করেছেন। পৃথিবীর কোনো যৌক্তিক এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন কখনো বৃথা যায়নি।

ইদানিং অনেক বিষয়েই ঘুরে ফিরে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র সব লেখা চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে। ১৯৪৯ সালে লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। মুসলিম লীগ সরকার বিরোধীদের ওপর চলছে নির্যাতনের স্টীম রোলার। বঙ্গবন্ধু তার ডায়েরীতে লিখছেন ‘কোন বিরুদ্ধ দল পাকিস্তানে না থাকায় সরকার গণতন্ত্রের পথ ছেড়ে একনায়কত্বের দিকে চলছিল। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান সর্বময় ক্ষমতার মালিক হলেন। তিনি কোন সমালোচনাই সহ্য করতে পারছিলেন না। (…) তখনকার দিনে আমরা কোন সভা বা শোভাযাত্রা করতে গেলে একদল গু-া ভাড়া করে আমাদের মারপিট করা হতো এবং সভা ভাঙার চেষ্টা করা হতো। (…) আশ্চর্যের বিষয় সরকারি দল প্রকাশ্যে গু-াদের সাহায্য করত এবং প্রশ্রয় দিত। মাঝে মাঝে জগন্নাথ কলেজ, মিটফোর্ড ও মেডিকেল স্কুলের ছাত্ররা শোভাযাত্রা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওয়ানা করলেই হঠাৎ আক্রমণ করে মারপিট করত। মুসলিম লীগ নেতারা একটা ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করতে চেষ্টা করছিল যাতে কেউ সরকারের সমালোচনা করতে না পারে। মুসলিম লীগ নেতারা বুঝতে পারছিলেন না, যে পন্থা তারা অবলম্বন করছিলেন সেই পন্থাই তাদের উপর একদিন ফিরে আসতে বাধ্য। ওনারা ভেবেছিলেন গু-া দিয়ে মারপিট করেই জনমত দাবাতে পারবেন। এ পন্থা যে কোনদিন সফল হয় নাই, আর হতে পারে না- এ শিক্ষা তারা ইতিহাস পড়ে শিখতে চেষ্টা করেন নাই।’ লেখক:সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত