প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নারায়ণগঞ্জে মহাশ্মশানের জলাধার দখল

মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের কবরস্থানের পাশেই হিন্দুদের মহাশ্মশান- বহুকাল ধরে নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদাহরণ হয়ে রয়েছে। সম্প্রীতির এই শহরেই মহাশ্মশানের জলাধার ভরাট করে দখলের অভিযোগ উঠেছে। নগরের মাসদাইরে অবস্থিত ৩০০ বছরের পুরনো এই মহাশ্মশানটির উত্তর পাশে অবস্থিত জলাধারটি রাতের আঁধারে বালু দিয়ে ভরাট করছেন মনির হোসেন নামে এক ব্যক্তি। মনির হোসেন স্থানীয় প্রভাবশালী এক সাংসদ ও এক পরিবহন নেতার নাম ভাঙিয়ে দখল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই জমিটি নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা ১১ বছর ধরে পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের কাছে ধরনা দিয়েও কোনো সুরাহা করতে পারেননি। এই সুযোগে মনির হোসেন জলাধারটির বেশিরভাগ অংশই ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করে ফেলেছেন। সর্বশেষ গত রোববার জেলা প্রশাসনের পক্ষে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা তাসলিমা বেগম হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে এক বছর আগেই ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে যেতে প্রশাসনের পুরো এক বছর লেগে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের

কালক্ষেপণের কারণেই দখলদার ব্যক্তিটি জলাধারের বেশিরভাগ অংশ ভরাট করে ফেলেছেন।

ওই জমিটির বিষয়ে হিন্দু সম্প্রদায় এবং অভিযুক্ত দখলদার মনির হোসেনের কাছ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা জানান, জলাধারটি বহুকাল আগে থেকেই শ্মশানের কাজে অর্থাৎ লাশ দাহ করার পরবর্তী ক্রিয়াকর্মে ব্যবহূত হয়ে আসছে। মনির হোসেনের দাবি, তিনি দুই দশক আগে তিনজনের কাছ থেকে ৬২ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন, যার ১০ থেকে ১২ শতাংশ জমি রয়েছে ওই জলাধারে। তিনি তার কেনা সম্পত্তি ভরাট করছেন।

নারায়ণগঞ্জ পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি ও মহাশ্মশান কমিটির সহসভাপতি শংকর সাহা অভিযোগ করে বলেন, ৩০০ বছরের পুরনো এ মহাশ্মশান। এখানে নারায়ণগঞ্জ ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মরদেহ দাহ করা হয়। এর জন্য শ্মশানের যজ্ঞের জন্য পাশেই রয়েছে দীর্ঘদিনের পুরনো এই জলাশয়। দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী মহল দখল করতে করতে জলাশয়টি প্রায় ভরাট করে ফেলেছে। এখন যেটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটুকুও রাতের আঁধারে ভরাট করা শুরু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শ্মশানটি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রিত। সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর মাধ্যমে জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ সেলিম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানকেও এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই দখল বন্ধ হচ্ছে না। তবে শ্মশানের জলাশয় সরকারিভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য এবং এর আশপাশে যদি কারও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকেই থাকে সেই জায়গা সরকারিভাবে অধিগ্রহণ করে শ্মশান কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিতে সিটি করপোরেশন থেকে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে এও বলা হয়েছে যে, যদি ওই সম্পত্তি ব্যক্তিগত কারও হয়, তবে তার জন্য জমি কেনার টাকা সিটি করপোরেশন বহন করবে।

শংকর সাহা আরও জানান, যার বিরুদ্ধে জলাধারটি দখলের অভিযোগ উঠেছে তাকেসহ আমাদের হিন্দু নেতাদের বেশ কয়েকবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে দলিলের নম্বর চাইলে তিনি তা জানাতে পারেননি। ওই ব্যক্তি কার কাছ থেকে কীভাবে এ জলাধারটি ক্রয় করেছেন তারও সঠিক কোনো তথ্য-উপাত্ত দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ জমির মালিকানার চেইন ঠিক নেই। তাছাড়া ভূমি অফিসের রেকর্ডে এটি এখনও জলাধার হিসেবেই রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের আগেই তিনজন জেলা প্রশাসক বদলি হয়েছেন। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, গত রোববার জেলা প্রশাসনের পক্ষে যে কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে এসেছেন, সেটি এক বছর আগের সিদ্ধান্ত। কিন্তু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতেই তাদের সময় লাগল এক বছর। তাহলে বাকি কাজ করতে কতদিন লাগবে। এ থেকে বোঝা যায়, জলাধারটি রক্ষায় প্রশাসনের গাফিলতি রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ মহাশ্মশান কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুজন সাহা বলেন, ‘শ্মশানের এ জলাশয় দখল হয়ে গেলে এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের শবদাহ বন্ধ হয়ে যাবে। যার ফলে এ এলাকার দুই থেকে আড়াই লাখ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ভোগান্তিতে পড়বে। বিষয়টি নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিক্ষুব্ধ এই মানুষগুলো রাস্তায় নেমে এলে নারায়ণগঞ্জে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। আমরা চাই না সে ধরনের কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক। এখনও পর্যন্ত জেলা প্রশাসক আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন এ জায়গা শ্মশানের জন্য সরকারিভাবেই বুঝিয়ে দেবেন।

অভিযোগের ব্যাপারে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে মনির হোসেন বলেন, তিনি হাবিবুল্লাহ, বিষু মিয়া এবং আমেনা বিবির ওয়ারিশদের কাছ থেকে মোট ৬২ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন। তার কেনা জমির মধ্যে ১০ থেকে ১২ শতাংশ জলাধারে রয়েছে। দুই বছর ধরে তিনি তার কেনা সম্পত্তি ভরাট করছেন। বিলুপ্ত পৌরসভা আমলে ২০০৭ সালে এ জমি নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে তখন পৌর কর্তৃপক্ষ সমস্যা সমাধানে বসে। ২০০৯ সাল পর্যন্ত টানা অনেক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শ্মশানটি পৌরসভার অধীনে থাকলেও এ শ্মশানের জমির মালিকানার কোনো কাগজপত্র তাদের কাছে ছিল না। ফলে পৌর আমলে দু’বার এবং সিটি করপোরেশন আমলে আরও দু’বার মোট চারবার এ জমির মাপজোখ হয়। কিন্তু কখনও শ্মশানের জমি আমার ক্রয়কৃত জমির মধ্যে রয়েছে এটি প্রমাণিত হয়নি। যে কারণে বর্তমান সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ শ্মশানকে জমি কিনে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে জেলা প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছে। সিটি করপোরেশনের এ চিঠি থেকেই প্রমাণ হয় জমির মালিকানা শ্মশানের নয়।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, মহাশ্মশানের এ জলাশয়ের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি জটিলতা চলে আসছিল। জটিলতা নিরসনে সিটি করপোরেশন থেকে জেলা প্রশাসককে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি জলাশয়ের জমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন হয় তাহলে সেটি যেন জেলা প্রশাসন অধিগ্রহণের ব্যবস্থা করে এবং এজন্য অধিগ্রহণকৃত জমি কেনার টাকার ব্যবস্থা করবে সিটি করপোরেশন। এখন বিষয়টি জেলা প্রশাসনের ওপর নির্ভর করছে। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জসিম উদ্দিন হায়দার বলেন, জলাশয়ের মালিকানা কার সেটি যাচাই-বাছাই করতে জেলা প্রশাসনের ভূমি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনিসহ কানুনগো এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দাখিলের পর আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নেব।

নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি অফিসের কানুনগো সেলিম মিয়া বলেন, ‘আমরা গত রোববার বিকেলে ওই জলাশয় পরিদর্শন করেছি। অধিগ্রহণ করার জন্য আমরা প্রতিবেদন জমা দেব। যাতে খুব সহজে ও দ্রুত এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।’ সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত