প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যবসা হারাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক : আশির দশকের শুরু পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতের শতভাগ নিয়ন্ত্রণ ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের হাতে। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বেসরকারি ব্যাংকের কাছে ব্যবসা হারাতে থাকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। এখনো ব্যাংকিং খাতের ২৫-৩০ শতাংশ ব্যবসা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বৈদেশিক বাণিজ্যে (আমদানি-রফতানি) মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে এসব ব্যাংকের অংশগ্রহণ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অর্থায়নে দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। ২০১৭ সালে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানি হয়েছে ৮৩ শতাংশ পণ্য। আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমে হয়েছে ৫ শতাংশ। অথচ ২০১১ সালেও রফতানির ১৮ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমে, ৭১ শতাংশ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে এবং বাকিটা বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল।

গতকাল রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম অডিটোরিয়ামে ‘ট্রেড সার্ভিসেস অপারেশনস অব ব্যাংকস’ শীর্ষক বার্ষিক পর্যালোচনা কর্মশালায় গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।

প্রতিবেদনে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, চার কৌশলে দেশ থেকে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটছে। কৌশলগুলো হলো—পণ্য ও সেবায় ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিং, আমদানি-রফতানিতে বহুমাত্রিক ইনভয়েসিং, পণ্য ও সেবা সম্পর্কে মিথ্যা বর্ণনা এবং শিপমেন্টের ক্ষেত্রেও ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং। অর্থ পাচারের বড় অংশ হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা তাদের বক্তব্যে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে এটি রোধে করণীয় সম্পর্কে নানা পরামর্শ দেন।

বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধূরীর সভাপতিত্বে কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এবং বিআইবিএম নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান। কর্মশালার উদ্বোধন করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ট্রেড সার্ভিসের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি দেশে ট্রেড সার্ভিসের ক্ষেত্রে আলাদা রেগুলেশন রয়েছে। এক্ষেত্রে আমরাও নতুন গাইডলাইন করতে যাচ্ছি।

বর্তমানে ব্যবসাভিত্তিক অর্থ পাচার বাড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, অর্থ পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কাজ করছে। গত বছর থেকে ব্যাংকের সব কর্মকর্তাকে মানি লন্ডারিং বিষয়ে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। এ সময় এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের সবকিছু যাচাই-বাছাই করতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বিআইবিএমের মুজাফফর আহমেদ চেয়ার প্রফেসর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা বলেন, অর্থ পাচার বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেও অর্থ পাচার ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশকেও অর্থ পাচারের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে অর্থ পাচার কমিয়ে আনতে হবে।

তিনি বলেন, টাকা পাচার ঠেকাতে আইন-কানুন এবং বিধির কোনো ঘাটতি নেই। অভাব শুধু সততার। এ কারণে বড় অংকের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

এলসি গ্যারান্টি ও ফি কমানোর জন্য বাংলাদেশকে ভিয়েনা কনভেনশনের সদস্য হওয়ার পরামর্শ দেন পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী। তিনি বলেন, আমাদের বেশিরভাগ রফতানি হয় ইউরোপ ও আমেরিকায়। ভিয়েনা কনভেনশনের সদস্য হলে এসব ফি কমবে এবং এলসির গ্যারান্টি নিশ্চিত হবে। বিশ্বের ৮৯টি দেশ ভিয়েনা কনভেনশনের সদস্য বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি বলেন, এটি খুবই আশঙ্কার বিষয়, ৮০ শতাংশ অর্থ পাচারই ব্যাংকের মাধ্যমে হয়। শুধু অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সমস্যায় আছে। এ সমস্যা সমাধানে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, ঋণের সুদহার কমানোর কথা বলা হচ্ছে। ঋণের সুদহার কমালে আমানতের সুদহারও কমবে। তবে আমানতের সুদহার কখনো মূল্যস্ফীতির নিচে নামানো যাবে না। ব্যাংক মালিকরা নানা ইস্যু নিয়ে সরকারের কাছে যান। কিন্তু খেলাপি ঋণ আদায়ের ব্যাপারে তাদের উদ্যোগ কী? খেলাপি ঋণ আদায়ে এবং মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে তারা কি সরকারের কাছে সাহায্য চেয়েছেন?

অর্থ পাচার বন্ধে এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেটের কমিশনার ড. মঈনুল খান। তিনি বলেন, অর্থ পাচারের ৮০ শতাংশই ট্রেডের মাধ্যমে হচ্ছে। বর্তমানে এটা প্রতিরোধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার বন্ধ করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তারা জড়িত হয়ে পড়েন। ব্যাংকগুলোকে অর্থ পাচারের কৌশল তদারকি করতে হবে। এক্ষেত্রে কাস্টমসের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সমন্বয় দরকার।

তিনি জানান, ৬৩৪টি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে কাস্টমস। এই এসআরও ব্যাংকগুলো সংগ্রহ করতে পারে। তাহলে এলসি করার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে।

এইচএসবিসি ব্যাংকের কান্ট্রি হেড অব গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসিভ্যাবলস ফিন্যান্স মোহাম্মদ শহিদুজ্জামান বলেন, অর্থ পাচার রোধে প্রথমে ব্যাংককেই ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাংক তার দায়িত্ব পালন করলেই অর্থ পাচার কমে আসবে।

কর্মশালায় ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিস থেকে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির, বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের দুই মহাব্যবস্থাপক মো. হাবিবুর রহমান ও মো. নুরুল আমীনসহ শীর্ষ কর্মকর্তা। মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির বলেন, বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যেমন বেড়েছে, একে ঘিরে জটিলতা এবং আর্থিক অপরাধও বাড়ছে, যা এখন ব্যাংকিং খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যাংক কর্মীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।

বিআইবিএমের অধ্যাপক এবং পরিচালক (ট্রেনিং) ড. শাহ মো. আহসান হাবীবের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল কর্মশালায় গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানের ইন্টারনেট পার্টনার আমরা নেটওয়ার্কস লিমিটেড।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব পণ্য আমদানিতে কম শুল্ক দিতে হয়, বিশেষ করে মূলধনি যন্ত্রাংশ, শিল্পের কাঁচামাল এবং খুচরা যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে বেশি মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাচার করা হয়। আবার সরকারি প্রণোদনা পেতে রফতানি পণ্যে বেশি মূল্য দেখানো হয়, যা বৈদেশিক বাণিজ্যের পাওনা পরিশোধে অসামঞ্জস্যতার বিষয়টি প্রমাণ করছে। তবে অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং শুল্ক বিভাগের যৌথ উদ্যোগে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম অর্থ পাচার প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। সূত্র : বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত