প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কারও কাঁধে চড়া মানায় না

আনিস আলমগীর : র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যাওয়ার দাওয়াত পেয়েছিলাম। ঢাকার বাইরে থাকায় অনুষ্ঠানের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। ফেসবুক ফিড মনে করিয়ে দিলো র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের আনুষ্ঠানিকতা। শুধু মনে করা নয়, রীতিমত ঝড় বইছে আনুষ্ঠানিকতার ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে। ফেসবুকের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে আলোচনাটি। প্রেসক্লাবে গিয়েও সেই আলোচনার মধ্যে পড়লাম। কোনও অনুষ্ঠানে গেলে অতিথিদের অনেক কিছুই হাতে থাকে না, সে কথা ভেবে একটু সহজভাবে দেখতে চাইলাম বিষয়টা। কিন্তু আলোচনা পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম–সময় সবার সবকিছু সমানভাবে নেয় না।

র‌্যাবের বর্ষবরণ ১৪২৫ উপলক্ষে ২১ এপ্রিল দুপুরে সংস্থার সদর দফতরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গেলে সামন্ততান্ত্রিক কায়দায় ‘তাঞ্জাম’-এ চড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, পুলিশের আইজি জাবেদ পাটোয়ারী ও র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদকে মঞ্চে আনা হয়েছিল। তারা মানুষের কাঁধে চড়ে প্রাচীনকালের এই তাঞ্জামে বসে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গেলেন কেন–আপত্তি, সমালোচনা সেটা নিয়েই। কেউ কেউ অবশ্য এটাকে স্বাভাবিকভাবেও নিয়েছেন।

আমার মনে হয়েছে এর আগে কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান, স্থানীয় নেতা স্কুল ছাত্রছাত্রীদের বানানো মানবসেতুতে চড়ে যে অমানবিকতা দেখিয়েছেন, সবাই সেই স্মৃতি মনে করে বিতর্কে মন দিয়েছেন। সমালোচনা করছেন। যদিও এটি আর সেসব ঘটনা কোনোভাবেই এক নয়। সেখানে শিশুদের গায়ে উঠেছিল জনপ্রতিনিধিরা। আয়োজন করেছিল শিক্ষকরা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তাঞ্জামে চড়ার ব্যাখ্যা দিয়েছেন র‌্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান। তিনি বলেছেন, ‘বর্ষবরণের আয়োজনে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টির জন্য এখানে গ্রামবাংলার বিভিন্ন ঐতিহ্য আনা হয়েছিল। সাপ খেলা, বানর খেলা, পুতুল নাচ, ঢেঁকিতে ধান ভানা, মাটির তৈজসপত্র কীভাবে বানানো হয় তা উপস্থাপনসহ আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির অনেক কিছুই এখানে ছিল। অনুষ্ঠানে আসা পালকিওয়ালাদের অনুরোধেই ওনারা পালকিতে উঠেছিলেন। মাননীয় মন্ত্রী, আইজিপি ও র‌্যাব মহাপরিচালক তাদের খুশি করতেই পালকিতে উঠেছিলেন।’

মানুষের কাঁধে তাঞ্জামে চড়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুষ্ঠানে যেতে দেখে আমার উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইদি আমিনের কর্মকাণ্ডের কথা মনে পড়লো। উগান্ডা ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। ইদি আমিনেরাই উগান্ডাকে স্বাধীন করেছিল গত শতাব্দীর ছয় দশকে। ইদি আমিন উগান্ডার প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট হয়ে ইদি আমিনের শখ হয়েছিল তাঞ্জামে করে রাজধানী প্রদক্ষিণ করার। আর তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন এই তাঞ্জাম কাঁধে করে বয়ে নেবে ব্রিটিশেরা। ব্রিটিশেরা তা-ই করেছিলেন।

উগান্ডার পাশে আরেকটা রাষ্ট্র আছে–সেন্ট্রাল রিপাবলিক অব আফ্রিকা। এই রাষ্ট্রটা ছিল ফরাসিদের উপনিবেশ। এটাও স্বাধীন হয় গত শতাব্দীর ছয় দশকে। তার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বুকাশা। বুকাশার ইচ্ছা হলো সম্রাট হওয়ার এবং ইচ্ছানুসারে তিনি নিজেকে সেন্ট্রাল রিপাবলিক অব আফ্রিকার সম্রাট ঘোষণা করেছিলেন। রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান করেছিলেন খুবই ঘটা করে। বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানেরা ওই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত ছিলেন। কয়েকটি ছোট ছোট রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানরাও যোগদান করেছিলেন।

সম্রাট বুকাশা রাজপ্রাসাদ থেকে অনুষ্ঠানস্থলে এসেছিলেন তাঞ্জামে করে আর তাঞ্জাম কাঁধে করে বয়ে এনেছিলেন তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা। গত শতাব্দীর সাত দশকে এ নিয়ে বিশ্বে হাসির রোল পড়ে গিয়েছিল। এখন বিশ্বে ইদি আমিন আর সম্রাট বুকাশারাও নেই, হাসির খোরাকও ফুরিয়ে গেছে।

আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুবই সহজ সরল লোক। তৃণমূল থেকে উঠে এসেছেন। দীর্ঘ সময়ব্যাপী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে বহাল আছেন। প্রথমে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রণালয় পরিচালনার বিষয়ে সন্তুষ্ট হয়েছেন। যে কারণে পরবর্তী সময়ে তাকে কেবিনেট মিনিস্টারের পদমর্যাদা প্রদান করেছেন।

মানুষের বিকাশই মানুষের অস্তিত্ব। মানুষ তার অস্তিত্বের জন্য দায়ী স্বীয় কর্মকাণ্ডের যোগফল ব্যতীত সে আর কিছু নয়। আমরা সমাজের মধ্যে বাস করি। সুতরাং মানুষ যা পরিত্যাগ করেছে, সভ্যতা যা বাতিল করে দিয়েছে তাকে আমি বিলাস হিসেবে ভোগ করতে চাওয়া সমাজের সঙ্গে রসিকতা করা। সে রসিকতা সমাজ ভালো দৃষ্টিতে দেখে না। নিজের সমস্ত মহিমা এক ঘণ্টার অধঃপতনে বিনাশ হয়ে যেতে পারে।

গরিব দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চালানো খুবই কঠিন কাজ। কারণ, গরিব দেশে অপরাধ বেশি হয়ে থাকে। এখন লোকে বলে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনও বিলাসিতার দিকে মন না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখার বিষয়ে সচেষ্ট হওয়া উচিত।

ঢাকার রাস্তায় চলাচল ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। প্রতিদিন কোনও না কোনও দানব গাড়ি গায়ের ওপর উঠে যাচ্ছে। হাত পা নিয়ে নিচ্ছে। ভাঙাচোরা বাসগুলো ঘষে একটা অন্যের, বা অন্যান্য যানের চামড়া তুলে নিচ্ছে। কারণ, তার বাসের চামড়া উঠলে কী না উঠলে কী! এটা যদিও শুধু পুলিশের দায়িত্ব না তবুও শহরবাসী বিশ্বাস করে ট্রাফিক পুলিশ সচেষ্ট হলে যান চলাচল, পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আসবে।

ক্ষমতা থেকে চলে গেলে আমাদের নেতানেত্রীরা জেলে গিয়ে ভাবেন আবার ক্ষমতায় গেলে জেলকে আরও উন্নত করবেন, থানা হাজতকে ড্রয়িং রুম হিসেবে ট্রিট করবেন। কারণ, পুলিশ কাউকে ধরে আনলেই সে দোষী না, যতক্ষণ আদালত তাকে সাজা দিচ্ছে। তারা ভাবেন অকারণে ভদ্রলোককে হাতকড়া পরাবেন না, মিডিয়া ট্রায়ালে দেবেন না, দেশে একটাও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটবে না, পুলিশকে আরও মানবিক বানাবেন। আর পাসপোর্ট বানানো, ভেরিফিকেশন রিপোর্ট দেওয়াসহ মানুষের কল্যাণমুখী যেসব কাজ পুলিশের হাতে আছে তা আরও সহজ এবং ঘুষবিহীন করবো, পুলিশকে দলনিরপেক্ষ করবো। কিন্তু সরকার বদল হয়, যুগের পর যুগ এসবের পরিবর্তন হয় না।

অনেক বিশ্লেষক বলছেন, দেশের পরিস্থিতি খুবই খারাপের দিকে যাচ্ছে। কারণ, বিশ্লেষকেরা মনে করেন পরিস্থিতি গুমোট আকার ধারণ করে আছে, যেকোনও সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। কথাটাকে উড়িয়েও দেওয়া যাবে না। ক’দিন আগে ছাত্ররা কোটা সংস্কার নিয়ে কী অঘটনই না ঘটাতে চেষ্টা করলো। মুহূর্তের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবন লণ্ডভণ্ড করে দিলো।

যেকোনও বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারতো ওই সময়ে। গোয়েন্দারা আগে থেকে কতটা সচেতন ছিল জানি না–এত বড় কাণ্ড কী করে ঘটতে পারলো! আবার কিছু সংখ্যক রাজনীতিবিদ এ সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়টা লাশ ফেলার ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত। সুতরাং আগামী নির্বাচন পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র দফতরের ওপর দেশে শৃঙ্খলা রক্ষার বড় দায়িত্ব অর্পিত হয়ে বসে আছে। তাই এই দফতরের লোকদের রসিকতার পেছনে সময় নষ্ট না করে কায়োমনোবাক্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টায় নিজেদের নিয়োজিত রাখা দরকার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটা কথা মনে রাখা দরকার– আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছে। জেলে ৪ নেতা হত্যার বিচার করেছে, সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার হত্যা প্রচেষ্টার বিচার করেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে। যাদের ফাঁসি হয়েছে তারা বিরাট এক কায়েমী স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতো।

সুতরাং এ বিচারের ফলে এখন সেই কায়েমী স্বার্থ তার প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় আছে। তারা কোনও না কোনোভাবে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির প্রয়াস চালাবে। যদি স্বরাষ্ট্র দফতরের অমনোযোগিতার কারণে ওই কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহল সফল হয় তবে তারা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে। ১৯৬৫ সালে সুকর্নর পতনের পর ইন্দোনেশিয়ায় ৫ লাখ লোককে হত্যা করা হয়েছিল।

এখানে আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময়ব্যাপী ক্ষমতায় রয়েছে। সুতরাং এখন তারা প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতারও সম্মুখীন হবে যেহেতু এ বছরের শেষের দিকে সাধারণ নির্বাচন। এই বিরোধিতার মাত্রা হয়তো বেশিও হতে পারে। সুতরাং এখন মন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সুদ্ধাচার অবলম্বন করে চলতে হবে। নয়তো কিছু মানুষ, কিছু মিডিয়া বসে আছে তিলকে তাল বানিয়ে প্রচার করার জন্য। আওয়ামী লীগ দেশের প্রাচীন সংগঠন আর আওয়ামী লীগ এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে দেশে স্বাধীন করেছে। তার হাজার হাজার কর্মী রয়েছে। তারা যদি নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে লিপ্ত না হয়ে সংযতভাবে সংগঠনের শৃঙ্খলা রক্ষা করে চলতো তবে তাদের নিজেরও কল্যাণ হতো দেশেরও অসীম মঙ্গল হতো।

কিন্তু দুর্ভাগ্য, আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের শত্রু হয়ে মঙ্গলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই দলের নেতারা রাজনৈতিক শত্রুর চেয়েও দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বীকে শেষ করে দিতে বেশি তৎপর। আর সুযোগ পেলে নিজের পকেটের দিকেই খেয়াল রাখে অন্য ত্যাগী নেতাকর্মীর ত্যাগের কথা ভুলে যায়। ক্ষমতা হারানোর আগে অনেকে চিনেও না। অথচ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের মতো সব আওয়ামী লীগ কর্মী একতাবদ্ধ হয়ে কোনও কাজের উদ্যোগ নিলে তাদের সে প্রচেষ্টা সফল হয়, সফল হবেই। এখন তাদের নিজেদের মধ্যে সেই ঐক্যের প্রয়োজন। বাংলাট্রিবিউন

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত