প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুশাসনের অভাবেই সড়কে এই বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য?

আশিক রহমান : বাস চালকদের রেষারেষিতে হাত হারানো তিতুমীর কলেজছাত্র রাজীব হোসেন প্রাণ হারিয়েছে। খুব সম্প্রতি গৃহপরিচারিকা রোজিনা হারিয়েছে পা, সে এখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। একইদিন বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন এক নারী । রোববার বগুড়ায় ট্রাকের ধাক্কায় হাত হারিয়েছে এক শিশু। ওইদিন কক্সবাজারে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় পা হারিয়েছেন এক রিকশাচালক। গতকাল সোমবার পল্টনে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে এক বাস চালক নিহত হয়েছেন, আহত অনেকেই। সড়কের এ চিত্র এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। বাস, কোস্টার ও ট্রাক চালকদের বেপরোয়া আচরণ সাধারণের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। ভয় ও আতঙ্ক এখন তাদের নিত্যসঙ্গী, কখন আবার বাসের চাকায় পিষ্ট হতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুশাসনের অভাবেই পরিবহন সেক্টরে এই নৈরাজ্য, আরও রয়েছে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, চাঁদাবাজী, ঘুষ ও আইন না মানার প্রবণতার কারণেই। সড়কে কেন এমন নরক যন্ত্রণা, এর সমাধানসূত্র-ইবা কী। জানতে চাইলে নগরবিশেষজ্ঞ স্থপতি অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের জাতীয় জীবনের প্রায় সর্বক্ষেত্রে সুশাসনের তীব্র অভাব রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ সবখানেই এ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিবহন সেক্টরে সবচেয়ে মারাত্বক অবস্থা বিরাজ করছে। সুশাসন বলে কিছু নেই। আইন-কানুন মানার, মানাবার কোনো রকমের উদ্যোগ নেই। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত উদাসীন। বাস কোম্পানি, বাস মালিক, চালক, হেলপার এরা প্রায় সবাই অশিক্ষিত বটে। এবং নিজের ভালোটাও বোঝে না। অসচেতন, আইন-কানুন মানতে উৎসাহী নয়। মানানোও হয় না। কোনো চাপও তাদের উপর নেই। রাজনৈতিক শক্তি ও প্রশাসন অত্যন্ত দুর্বল। যে কারণে সড়কে এ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। মানুষও যথেষ্ট সচেতন নয়। অনেক সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হয়। কিন্তু পরিবহনের ক্ষেত্রে যদি আইনশৃঙ্খলা থাকত তাহলে তারাও আইন মানতে বাধ্য হতো। জেব্রা ক্রসিং অথবা ফুটওভার ব্রিজ ছাড়া পার হতো না। বাস চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ নেই, লাইসেন্সও ঠিক থাকে না। দুর্নীতির কারণে এসব আইন-কানুনও মানানো যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, পরিবহন খাতে ঋণ দিয়ে কী হবে যদি আইনই না মানে। ঋণও ফেরত দেবে না। আর উন্নত, ফিটনেস আছেন এমন গাড়ি দিলে কি পরিস্থিতি উন্নত হবে? কীভাবে? আগে তো উন্নত চালক লাগবে। শুধু উন্নত গাড়ি দিলেই কি হবে? সুশিক্ষিত ও আইন মান্যকারী চালক লাগবে। গুলশান-বনানীতে সীমিত আকারে কিছুটা হচ্ছে, এটা ভালো। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় চাইলে সম্ভব। তবে সবার আগে আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নিতে হবে।

মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বলেছেন, যারা গাড়ি চালান, বিশেষ করে যারা বাস চালান তাদের গাড়ি চালানোর প্রয়োজনীয় জ্ঞানের প্রচ- অভাব রয়েছে। কীভাবে গাড়ি চালাতে হবে বা নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করে চলতে হবে তা তাদের জানা নেই বললেই চলে। ট্রাফিক আইন কেউ মানে না। যাদের দায়িত্ব ট্রাফিক আইন মানানোর তারা ঘুষ খেতে ব্যস্ত থাকে। নিয়ম-কানুন কেউ মানে না। সবাই যদি নিয়ম-কানুন মানত তাহলে সড়কে এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে না। তিনি বলেন, ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো রাস্তায় চলাচল উপযোগী নয়, চলাচল করার কথাও নয়। কিন্তু তাদেরকে বিআরটিএ থেকে ক্লিয়ারেন্স দিচ্ছে। ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞানও যাদের নেই তাদের গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। যারা তাদের নিয়ন্ত্রণ করে তারা তাদের মানুষ হত্যা করার লাইসেন্স দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের এমন অবস্থান হলে এমন ঘটনা চলবেই।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’- আন্দোলনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, একজন চালককে আপনি ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে দিলেন, কিন্তু সে ভালো চালাতে পারে কি, পারে না তা খতিয়ে দেখলেন না। টাকা বা পরিচিত হওয়ার কারণে হয়তো আপনি ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে দিলেন। দায় তো এখানে নিতেই হবে। আইনরক্ষাকারী সদস্যরা আইনের সঠিক প্রয়োগ করবেন না। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। চালকেরা অত্যন্ত অধৈর্য, কখন আগে যাবেন প্রতিযোগিতায় নামেন। কোনো সিগন্যালও তারা মানতে চায় না। তাদের প্রশিক্ষিত করা, পড়ালেখায় জায়গাটা নিশ্চিত করা দরকার। একইসঙ্গে যাত্রীদেরও অধৈর্য আছে, সচেতনতার অভাব রয়েছে। আমাদের অনেক সময় রাস্তার কোনোদিকে না তাকিয়ে রাস্তা পার হওয়ার প্রবণতা আছে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমার একটা সুপারিশ ছিল সরকারের কাছে, সেটা হচ্ছে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দায়ী ব্যক্তি কে, কারা? আপনি প্রকৌশলী, রোড বানালেন, সেই দায়-দায়িত্ব কেন শুধু চালককে নিতে হবে? আপনি কন্ট্রাক্টার, টাকা নেবেন অথচ রাস্তা বানাবেন গাড়ি চলাচল অনুপোযোগী তার দায়ও তো আপনার উপরও পড়ে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত