প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বদল হতে পারে নৌকার মাঝি, ধানের শীষের প্রার্থী ছয়জন

নিজস্ব প্রতিবেদক : শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানা এলাকা) আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের আসন হিসেবে পরিচিত। দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা দাবি করেন, নৌকা প্রতীক যে পাবেন তিনিই নির্বাচিত হবেন। তবে এখানে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দীর্ঘকালের। গত দুই দশকে নিজেদের মধ্যে হানাহানি ও সংঘাতের বহু ঘটনা ঘটেছে। নিহত হয়েছে একাধিক দলীয় কর্মী। বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকলেও তা সহিংসতায় রূপ নেয়নি কখনো। বর্তমানে সংসদের বাইরে থাকা দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মনে করেন, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে তাঁরা এ আসনটি দখল করে নিতে পারবেন। এরই মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা জোর প্রস্তুতি শুরু করেছেন।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সংসদ সদস্য শওকত আলী একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী নাও হতে পারেন। সে কারণে দলের প্রার্থী বদল হতে পারে। সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থী আলোচনাও আছেন।

অন্যদিকে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলের প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করতে আগ্রহী অন্তত ছয় নেতা মাঠে কাজ করছেন। কালের কণ্ঠ

নড়িয়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানাধীন ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে শরীয়তপুর-২ আসন।

জেলা নির্বাচন কার্যালয় ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নুরুল হক হাওলাদার এ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন। নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পরই নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তিনি। একই বছর উপনির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের ডা. আবুল কাশেম নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে নির্বাচিত হন কর্নেল (অব.) শওকত আলী। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি দলকে শক্তিশালী করার কাজে মনোনিবেশ করেন। দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধের কারণে দলের অনেক পরীক্ষিত ও দায়িত্বশীল নেতাকর্মী তখন তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যান। ’৮৬ ও ’৮৮ সালে যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির টি এম গিয়াস উদ্দিন আহমেদ এ আসন থেকে নির্বাচিত হন।

এরশাদের স্বৈরশাসনের পতনের পর ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শওকত আলী নির্বাচিত হন। ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ সংসদের বিতর্কিত নির্বাচনে জয়লাভ করেন বিএনপির ডা. কে এ জলিল, একই বছর ১২ জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শওকত আলী তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য হন। এর পরের সংসদ নির্বাচনগুলোতে তিনি টানা জয়লাভ করেন।

আওয়ামী লীগ : একাদশ সংসদ নির্বাচনে শরীয়তপুর-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে যাঁরা আলোচনায় আছেন তাঁরা হলেন দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সিমন, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নাভানা আক্তার ও সংসদ সদস্য শওকত আলীর ছেলে ডা. খালেদ শওকত আলী।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ চট্টগ্রামের দায়িত্বে আছেন। পাশাপাশি তিনি দলীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দলীয় নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তিনি এলাকায় নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থেকে তাদের সহায়তা করছেন। এলাকার শিক্ষার্থীদের রাজধানীতে পড়ার সুযোগ করে দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে এলাকার মানুষের পাশে থাকছেন। সমপ্রতি তিনি নিজ এলাকায় আওয়ামী লীগের নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং নবায়নের কাজ শুরু করেছেন।

আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়ে এনামুল হক শামীম বলেন, তিনি এর আগেও এই আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। সামনের নির্বাচনেও চাইবেন। তবে দল যাঁকে মনোনয়ন দিবে তাঁর পক্ষেই কাজ করবেন তিনি। শামীম মনে করেন, নিজের মনোনয়নের চেয়ে তাঁর কাছে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আগামী নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। সে জন্য তিনি রাত-দিন তৃণমূল থেকে কেন্দ্র আর কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজ করে যাচ্ছেন।

সুলতান মাহমুদ সিমন ২০০১ সালে এই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে প্রায় ৩১ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। তিনি আগামী নির্বাচনে শরীয়তপুর-২ আসন থেকে মনোনয়ন পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন।

নাভানা আক্তার সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য হওয়ার পর এলাকার উন্নয়নে কাজ করছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি শরীয়তপুর-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে জানা গেছে।

ডা. খালেদ শওকত আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁর বাবা বর্তমান সংসদ সদস্য শওকত আলী আগামী নির্বাচনে প্রার্থী নাও হতে পারেন। তাঁদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খালেদ শওকত আলীর জন্য দলীয় মনোনয়ন চাওয়া হবে।

খালেদ শওকত আলীর প্রত্যাশা, মুক্তিযুদ্ধে শওকত আলীর অবদান এবং নির্বাচনী এলাকায় চার দশক ধরে আওয়ামী লীগকে শক্তশালী অবস্থানে ধরে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করে তাঁকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, শওকত আলী ডেপুটি স্পিকার থাকাবস্থায় তাঁর হাত ধরে এলাকার রাজনীতিতে আসেন ডা. খালেদ। তাঁর সঙ্গেই তিনি দলীয় সভা-সমাবেশে যোগ দিতেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে যুক্ত। বেশ কিছুদিন ধরে ডা. খালেদ নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ করছেন।

বিএনপি : দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন শরীয়তপুর জেলা শাখার সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণ, দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য জামাল শরীফ হিরু, জাতীয় পার্টি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া সাবেক প্রতিমন্ত্রী টি এম গিয়াস উদ্দিন, সাবেক সংসদ সদস্য ডা. কে এ জলিল ও দলের আবেক নেতা কর্নেল (অব.) এস এম ফয়সাল আহমেদ।

শফিকুর রহমান কিরণ ১৯৯১ সালে শরীয়তপুর-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে জেলায় দলটির রাজনীতিতে আবির্ভূত হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচনে তিনি ওই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচনে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে একই আসনে বিএনপির টিকিটে প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা আব্দুর রাজ্জাকের কাছে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ২০০৮ সালে তিনি শরীয়তপুর-২ থেকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৮০ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু শওকত আলীর কাছে হেরে যান তিনি। কালের কণ্ঠ

রাজনীতির পাশাপাশি শফিকুর রহমান কিরণ তাঁর নির্বাচনী এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। আগামী নির্বাচনে তিনি শরীয়তপুর-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাঁর বিশ্বাস, এই আসনে দল তাঁকে মনোনয়ন দেবে।

জামাল শরীফ হিরু বিএনপির একজন ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা। ছাত্রদল হয়ে মূল রাজনীতিতে আসা এই নেতা নীতির প্রশ্নে আপসহীন বলে পরিচিত।

জামাল শরীফ হিরু ১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-০৬ সালে বিএনপির শাসনামলে এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, শরীয়তপুর-২ আসন থেকে এর আগে যাঁদের বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে তাঁরা কেউ বিজয়ী হতে পারেননি। তাই দলীয় বিজয় ছিনিয়ে আনতে আসন্ন নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হতে চান।

কর্নেল (অব.) এস এম ফয়সাল ২০০৯ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। পাশাপাশি ঢাকায় ব্যবসা শুরু করেন। ২০১৪ সালে তাঁকে শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি মনোনীত করা হয়। তাঁর বড় ভাই সৈয়দ আমির খসরু প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই বিএনপির সঙ্গে ছিলেন। এ অঞ্চলে বিএনপিকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে আমির খসরুর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এসব বিবেচনায় আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন বলে প্রত্যাশা করেন এস এম ফয়সাল।

টি এম গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বিএনপির এ অঞ্চলের বর্ষীয়ান নেতা। তিনি শরীয়তপুর-২ আসন থেকে তিনবার বিএনপির ও দুবার জাতীয় পার্টির টিকিটে নির্বাচন করেন। আর একবার করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। জাতীয় পার্টি থেকে দুবার নির্বাচিত হয়ে এরশাদ সরকারের প্রতিমন্ত্রী ও সংসদের হুইপের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনসহ অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে বিএনপি নেতা গিয়াস উদ্দিনের যোগাযোগ খুবই কম। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা শহিদুল ইসলাম শরীয়তপুর-২ আসনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত