প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘জীবনের মূল্য কত সেই দিন টের পাইছিলাম’

‘ভাইজান জীবনের মূল্য কত, সেই দিন টের পাইছিলাম। এখন পাঁচ বছর ধরে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে বুঝতেছি বাঁচা কত কঠিন।’ বলছিলেন রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে যাওয়া পোশাক শ্রমিক মোকছেদা। পাঁচ বছর ধরে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। স্বামী আর তিন সন্তান নিয়ে এখনও জীবনে ‘ভালো অবস্থার’ স্বপ্ন দেখেন। মোকছেদার মতো অনেকেই হয়তো ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন আজও, কিন্তু আহত শ্রমিকরা কে কোথায় আছেন পাঁচ বছর পর তারও হিসাব পাওয়া মুশকিল।

তবে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা অ্যাকশনএইডের তথ্য অনুযায়ী, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে আহত শ্রমিকদের ৪৮ শতাংশই এখনও কাজ করতে পারছেন না শারীরিকভাবে পূর্ণ সক্ষম হতে না পারার কারণে। কেউ কেউ এখনও মানসিকভাবেও স্বাভাবিক হতে পারেননি। ১২ শতাংশের শারীরিক অবস্থা এখনও অবনতির দিকে। ২২ শতাংশ শ্রমিক এখনও মানসিকভাবে সুস্থ হতে পারেননি। ২১ দশমিক ৬ শতাংশ শ্রমিক অবশ্য আবারও পোশাক কারখানায় কাজ নিয়েছেন।

ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই : সাভার থানা এলাকায় ছোট্ট এক চায়ের দোকান। সন্তান পাশে নিয়ে এক নারী চায়ের কাপ ধুচ্ছেন, ক্রেতাদের চা দিচ্ছেন। দোকানে সাজানো বিস্কুট, চিপসের মতো আরও কিছু শুকনো খাবার। এই দোকানটি এখানে শুরু হয়েছে প্রায় দু’বছর আগে। দোকানি মোকছেদা। কথা হলো তার সঙ্গে। জানালেন, পাঁচ বছর আগে রানা প্লাজা বিধ্বস্ত হওয়ার দিনে তিনি কাজ করছিলেন তিনতলায়। কারখানায় পোশাকে বোতাম লাগানোর কাজ করার মধ্যেই বিদ্যুৎ চলে যায়। চালু হয় জেনারেটর। তারপর কিছুক্ষণ পরই প্রচণ্ড কাঁপুনি দিয়ে চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার। চোখ মেলা যাচ্ছে না ধুলায়। একদিকে চিৎকার, অন্যদিকে বিকট শব্দ কংক্রিটের ইমরাত গুঁড়িয়ে যাওয়ার। তিনিসহ আরও কয়েকজন কোনো রকমে ছুটে সিঁড়ির কাছ পর্যন্ত আসতে পেরেছিলেন। দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত সিঁড়ির গোড়ায় নেমে নিচে লাফ দেন মোকছেদা। এরপর আর কিছুই মনে নেই। জ্ঞান ফেরার পর তিনি নিজেকে দেখেন হাসপাতালের বিছানায়। হাতে-পায়ে, মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা।

প্রায় দেড় মাস হাসপাতালে থাকার পর বাড়ি ফেরেন মোকছেদা। তার স্বামী শাহিন মিয়াও কাজ করতেন রানা প্লাজায়। তিনি সে দিন ছিলেন চারতলায়। তিনিও গুরুতর আহত হন। তাকেও হাসপাতালে থাকতে হয় প্রায় তিন মাস।

স্বামীসহ যখন মোকছেদা বাড়ি এলেন তখন দু’জন মানুষের কেউই পা সোজা করে দাঁড়াতে পারেন না। বাড়িতে বিছানায় কাটে আরও প্রায় এক বছর। স্বামী-স্ত্রীর জন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থা থেকে সব মিলিয়ে তিন লাখ টাকার মতো অনুদান জোটে। এই টাকা দিয়েই কর্মহীন বছর পার হয়ে যায়।

যখন তারা সোজা হয়ে আবার চলতে শুরু করলেন, তখনই শুরু হলো নতুন লড়াই। এই টাকা দিয়েই মোকছেদার নতুন লড়াই। অনুদানের টাকা-পয়সাও প্রায় শেষ। তিন সন্তানের মধ্যে দুই সন্তানের স্কুলে যাওয়া প্রায় বন্ধ। বড় মেয়ের বিয়ে দিতে বাধ্য হন তিনি। এভাবে ধারদেনা টানাপড়েনে কেটে যায় আরও প্রায় দুই বছর। তৃতীয় বছরে এসে স্থানীয় দুটি এনজিও থেকে বিশ হাজার করে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করেন চায়ের দোকান। প্রতিদিন ২৯০ টাকা করে দুই এনজিওর কিস্তি দিয়ে বাকি যা থাকে, তা দিয়েই তাদের চলতে হচ্ছে। দিনে তিন-চারশ’ টাকা যা লাভ থাকে, সেটাই তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। দোকানে পালা করে বসেন মোকছেদা আর শাহীন।

এখনও পা ফেলতে কষ্ট হয় মোকছেদার, মাঝেমধ্যেই পিঠের ব্যথায় কাতরান। দোকান করা ছাড়া শারীরিক শ্রমের আর কিছুই করার সাধ্য নেই তাদের। এখন এই দোকান ঘিরেই জীবনে ভালো অবস্থার স্বপ্ন দেখেন মোকছেদা ও শাহীন।

হৃদয় নিজে স্বপ্ন দেখেন, অন্যকেও দেখান : মাহমুদুল হাসান হৃদয় রানা প্লাজা ধসে পড়ার মাত্র তিন দিন আগে ২১ এপ্রিল ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন ইয়াসমিন আক্তার ইতিকে। কিন্তু তিন দিন পরই মুছে গেল জীবনের সব রঙ। রানা প্লাজার অষ্টম তলায় নিউ ওয়েভ স্টাইলে কাজ করতেন তিনি। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে পা হারিয়ে তিনিও পঙ্গু হয়ে যান। তিন-চার মাস পর তার স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যায়। এরপর থেকে অনেকটাই একাকী নিঃসঙ্গ জীবন কাটান প্রায় তিন বছর। তবে জীবন থেমে থাকে না। হৃদয়েরও থাকেনি। হৃদয় সমকালকে জানালেন, গত বছর আবার বিয়ে করেছেন। চার মাস আগে এক সন্তানও হয়েছে তাদের। অনুদানের যা টাকা পেয়েছিলেন তা শেষ হয়ে গেছে চিকিৎসা করাতেই। পরে গ্রামের বাড়ি সিংগাইরের জমি বিক্রি করে সাভার বাজারে অনেক কষ্টে ছোট একটা ওষুধের দোকান দেন। কিন্তু সেই দোকানটাও ঠিকমতো চলছে না।

হৃদয় শুধু একা ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন না। রানা প্লাজায় যারা আহত হয়েছিলেন, তাদের অনেককে একটু ভালোভাবে বাঁচার পথ করে দিতে বন্ধু সাদ্দামকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন রানা প্লাজা সারভাইভর্স অ্যাসোসিয়েশন। তার বন্ধু সাদ্দামও রানা প্লাজায় আহতদের একজন। তিনি হারিয়েছেন হাত। হৃদয় জানান, এই সংগঠনের মাধ্যমে তারা আহতদের পরিবারের খোঁজ নেন। বিপদে যতটুকু পারেন সাহায্য করেন। কোনো পরিবারে চাল কেনার টাকা না থাকলে চাল কিনে দেন। বাচ্চার জন্য দুধ কেনার টাকা না থাকলে দুধ কিনে দেন। তাদের সংগঠনের কোনো তহবিল নেই। বন্ধুরা যারা আছেন তারাই দশ-বিশ টাকা করে দিয়ে যাদের প্রয়োজন, তাদের জরুরি সহায়তা দেন। ‘আমি পা হারিয়েও যতটা পারি ঘুরে দাঁড়িয়েছি। এখন একটাই স্বপ্ন, সেদিন যারা ওই ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে ফিরে এখনও জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন, তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই।’

হৃদয় বুক চাপড়ে বললেন, ‘রানা প্লাজা সব কেড়ে নিয়ে শেষ করে দিয়েছে। এখন আর নিজের বলতে কিছুই নেই। চিকিৎসা দূরের কথা, এমন দিন যায় আমার ঘরে এক মুঠো ভাত থাকে না। দু’বার আত্মহত্যার জন্যও চেষ্টা করেছি। ছোট ভাই বাঁচিয়েছে। এখন পর্যন্ত সে-ই দেখাশোনা করছে। ভাইরে বাঁচতে খুব ইচ্ছে করে ভাই। দোকানটা চালাতে পারলেও হতো। একটা উপায় বলে দেন না ভাই, বাঁচার খুব ইচ্ছে, বাঁচতে চাই।’ সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত