প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পার্কিং নৈরাজ্যে দুঃসহ যানজট

ডেস্ক রিপোর্ট : রাজধানীর রাজপথে অবৈধ গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে দুঃসহ যানজট থেকে রেহাই মিলছে না। পরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় নগরবাসী ব্যস্ত সময়েও রাস্তা দখল করে গাড়ি পার্কিং করে রাখে। এতে নগরীর অসহনীয় যানজট আরও তীব্র হচ্ছে। অন্যদিকে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর নকশা নির্ধারিত পার্কিং সুবিধা পরে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করায় রাস্তাই হয়ে উঠেছে গাড়ি রাখার অন্যতম জায়গা। ফলে রাজধানীর রাজপথে পার্কিং নৈরাজ্য বন্ধ করা যাচ্ছে না।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রাজধানীতে অন্তত ১২ হাজার বহুতল ভবনে পার্কিং সুবিধা নেই। ফ্ল্যাট অনুপাতে পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা নেই আরও লক্ষাধিক বহুতল ভবনে। বহুতল ভবনগুলোতে কার্যকরি পার্কিং সুবিধা না থাকার কারণে গাড়ি পার্ক করতে হচ্ছে ব্যস্ত সড়কের পাশে। এতে সংকুচিত হয়ে পড়েছে রাজধানীর সড়ক, বাড়ছে যানজট। রাজধানীর মতিঝিল-দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকার অধিকাংশ বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে কোনো রকম পার্কিং সুবিধা ছাড়াই। হাতে গোনা কিছু নতুন ভবনে অপর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা রয়েছে। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি ফ্ল্যাটগুলোতে পার্কিং সুবিধা থাকলেও সেগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহূত হয়। বিশেষ করে সুপার মার্কেট, শপিংমলসহ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে এসব বাণিজ্যিক কেন্দ্রে আসা ব্যক্তিগত গাড়ি সামনের রাস্তার বেশিরভাগ দখল করে রাখে। রাজধানীর পার্কিং নৈরাজ্যের সঙ্গে একশ্রেণির ইজারাদার, পুলিশ ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীর স্বার্থের সম্পর্ক থাকায় এটা বন্ধ করা যাচ্ছে না। নগরীতে যে কয়েকটি পার্কিং স্পেস গড়ে উঠেছে সেগুলোও তাদের কারণে কার্যকর করা যাচ্ছে না। ব্যাংকপাড়া হিসেবে খ্যাত দিলকুশায় সাধারণ বীমা টাওয়ারে ২০০৬ সালে পার্কিং ব্যবস্থা চালু করা হলেও সেখানে গাড়ি উঠছে না। অথচ মতিঝিল-দিলকুশার ব্যস্ত সড়কের দুপাশে হাজার হাজার গাড়ি দিনভর পার্ক করে রাখা হয়। সেগুলো থেকে নিয়মিত ইজারা তোলা হয়। এর পাশাপাশি ৩৭তলা সিটি সেন্টারেও প্রায় সাড়ে ৫শ গাড়ি পার্ক করার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানেও গাড়ি উঠছে না। নগরীর ব্যস্ত এলাকার মূল সড়কে, শপিংমল ও সুপার মার্কেটের সামনে এলোপাতাড়ি গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে। ওইসব এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় অসহনীয় যানজট লেগে থাকে, এতে নগরবাসীর কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে ও মানুষকে পোহাতে হচ্ছে অসহনীয় ভোগান্তি। রাজধানীর পার্কিং স্পেস দখলমুক্ত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালে রাজউক, সিটি করপোরেশন, সওজ, ঢাকা ওয়াসা, রেলওয়েসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো একযোগে উচ্ছেদ অভিযানে নামে। এ সময় উচ্ছেদ অভিযানে সড়ক-সংলগ্ন অবৈধ স্থাপনা এবং বহুতল ভবনের কার পার্কিং স্পেস অবমুক্ত করা হয়। রাজধানীতে গড়ে ওঠা হাজার হাজার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার কারণে রাজপথ প্রশস্ত হয়। উচ্ছেদ আতঙ্কে বিভিন্ন মার্কেট ও শপিংমলে পার্কিং স্পেস ছেড়ে দেন ভবন মালিকরা। অনেক মালিক নিজ উদ্যোগে ভেঙে ফেলেন বাড়তি স্থাপনা। এ সময় নগরীতে প্রায় ২ হাজার পার্কিং স্পেস অবমুক্ত হয় বলে রাজউক সূত্র জানায়। অনেকে তাদের মার্কেটের নিচতলায় বা আন্ডারগ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক কাজে ভাড়া দেয়া স্থাপনা ভেঙে ফেলেন। কিন্তু যথাযথ তদারকির অভাবে অধিকাংশ ভবনের পার্কিং স্পেস আবার বাণিজ্যিক কাজে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ পার্কিং পলিসি না থাকায় রাজধানীতে পার্কিং নৈরাজ্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। তবে পার্কিং পলিসি তৈরির বিভিন্ন চেষ্টা দীর্ঘদিনেও ফলপ্রসূ হয়নি। অবিভক্ত ডিসিসি একটি খসড়া পার্কিং পলিসি তৈরি করলেও সেটার কোনো বাস্তবায়ন নেই। ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ডও (ডিটিসিবি, বর্তমানে ডিটিসিএ) একটি খসড়া পার্কিং পলিসি তৈরি করেছিল। ২০০৪ সালে তৈরি সরকারের ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট পলিসিতে পার্কিংয়ের কথা আছে মাত্র দুলাইন। রাজউক ’৮৪ সালে তাদের বিধিমালায় পার্কিং সুবিধার কথা উল্লেখ করে। সংশোধিত ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৬-এ ভবন নির্মাণে পার্কিং সুবিধা রাখার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করা হয়েছে। এদিকে ঢাকার ‘উন্নয়নের বাইবেল’ হিসেবে খ্যাত ২০ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) পার্কিং বিষয়টি মোটেও গুরুত্ব পায়নি। কোটি কোটি টাকা খরচ করে তৈরি এসটিপিতে শত শত পৃষ্ঠার সুপারিশের মধ্যে পার্কিং নিয়ে রয়েছে মাত্র আধা পৃষ্ঠা। অথচ কার্যকর উদ্যোগের অভাবে রাজধানীর পার্কিং নৈরাজ্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। মতিঝিল-দিলকুশা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ভবন থেকে শাপলা চত্বর হয়ে নটর ডেম কলেজ ও দৈনিকবাংলা মোড় পর্যন্ত সড়ক এবং পুরো দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকার প্রতিটি সড়কের দুদিকে অসংখ্য প্রাইভেটকারসহ ছোট ছোট গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি গাড়ি দুই-তিন ঘণ্টা পর্যন্ত রাস্তা দখল করে থাকছে। কোনো কোনো গাড়ি সকালে কর্মকর্তাকে নামিয়ে বিকালে অফিস ছুটি না হওয়া পর্যন্ত রাস্তায় অপেক্ষায় থাকে। অপ্রশস্ত জায়গা দিয়ে অন্যান্য গাড়ির এলোপাতাড়ি চলাচলের ফলে গোটা বাণিজ্যিক এলাকায় যানজট লেগে থাকছে। রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরাসহ প্রায় সর্বত্রই রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ি পার্কিং করে রোড স্পেসের বেশিরভাগ অংশ দখল করে রাখা হয়। অবৈধ পার্কিং কঠোরভাবে বন্ধ করতে না পারলে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, এসটিপি অনুসরণ করলে পার্কিং নিয়ে কোনো সমস্যা থাকবে না। রাস্তায় এত বেশি গাড়ি রাখারও কোনো দরকার হবে না। তবে মানুষের অভ্যাস খুব খারাপ। তারা নিয়ম মানতে চান না। বাড়ি বানাবেন কিন্তু গাড়ির জায়গা রাখবেন না, তা হয় না।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সাবেক অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম সালেহ উদ্দিন বলেছেন, এসটিপি অনুসরণ করলে রাজধানীর যোগাযোগ ও যানবাহন ব্যবস্থাপনার অনেক সংকট দূর করা যেত। কিন্তু সেটি বাস্তবায়নে আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। পার্কিং ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ